সোমবার ১০ কার্তিক ১৪২৮, ২৫ অক্টোবর ২০২১ ঢাকা, বাংলাদেশ
প্রচ্ছদ
অনলাইন
আজকের পত্রিকা

জীবিকার তাগিদে ঢাকায় ফেরা

জীবিকার তাগিদে ঢাকায় ফেরা
  • বিড়ম্বনার শেষ নেই

আজাদ সুলায়মান ॥ দু’শ’ কিলোমিটার সাইকেল চালিয়ে গাবতলী পৌঁছেন যশোরের যুবক রবিন। টানা বিশ ঘণ্টায় তিনি অক্লান্ত পরিশ্রম করে গাবতলী এসে বর্ণনা করেন মহাসড়কে তার মহাভোগান্তির ভ্রমণ কাহিনী। হলার, ভ্যানগাড়ি আর রিক্সায় নেত্রকোনা থেকে উত্তরায় আসেন ফজলুর রহমান। তিনিও প্রায় ১২ ঘণ্টা জার্নি করে ঢাকায় আসেন। ফরিদপুর থেকে ট্রাক, বাস, হলার ও অটোরিক্সায় ঢাকায় আসেন হারুণ মিয়া। কিশোরগঞ্জ থেকে টেম্পোতে গাজিপুর হয়ে এয়ারপোর্ট এসে কিছুটা হেঁটে, কিছুটা রিক্সায় গুলিস্তান পৌঁছেন মারুফ। তাদের চারজনের একই জবাব, জীবিকার তাগিদে ঢাকায় ফেরা। না ফিরতে পারলে চাকরি চলে যেত। কতটা ভোগান্তি পোহায়ে ঢাকা আসা হয়েছে সেটা অফিস কোনদিন জানতে চাইবে না। জানার পর আলাদা কোন ভাতাও দেবে না। শুধু সময়মতো আসাতে চাকরিটা টিকে যাবে-এটাই বড় সান্ত¦না। তাদের মতো এমন হাজার হাজার মানুষ ঢাকায় ফিরছে গত দুদিন ধরে। শনিবার কঠোর লকডাউনের দ্বিতীয় দিনেও দেখা গেছে ঢাকায় আসা মানুষের কি কঠিন বিড়ম্বনা। একেকজনের আসার কাহিনী ভিন্ন হলেও সবার পরিণতি একই। সবারই কথা এক, ঈদে ঘরে ফেরা যতটা ছিল আবেগ উচ্ছ¡াস ও আনন্দের, কর্মস্থলে ফেরাটা ততটাই নিরানন্দ, ভোগান্তি ও যন্ত্রণাদায়ক। মাইলের পর মাইল ব্যাগেজ কাঁধে নিয়ে হাঁটার মতো বিরক্তিকর কি আর হতে পারে। সরকারের উচিত ছিল অন্তত ঢাকায় ফেরার জন্য শনিবার পর্যন্ত সময় দেয়া ও যানবাহন চালূু রাখা। তাহলে অন্তত এতটা ভোগান্তি হতো না।

গাবতলীতে পৌঁছে যশোর থেকে সাইকেলে আসা যুবক রবিনের কাহিনী ছিল আলোচনার শীর্ষে। তার মতে-যতক্ষণ শ্বাস ততক্ষণই পরিশ্রম করতে হয় মানুষকে। সব ধরনের বাধাবিঘœ পেরিয়ে এগিয়ে যাবার নামই জীবন। এখানে সবারই পথ বন্ধুর। যে কারণে জীবিকার তাগিদে যশোর থেকে তিনি দুই শ’ কিলোমিটার বাইসাইকেল চালিয়ে ঢাকায় পৌঁছেছেন। পেশায় ইলেক্ট্রিক মিস্ত্রি রবিনের সঙ্গে কথা হয় ঢাকার গণমাধ্যমকর্মীদের। রবিন বলেন, আমার বাড়ি চাঁদপুর। যশোরের কেশবপুরে গিয়েছিলাম অসুস্থ শাশুড়িকে দেখতে। ঈদের আগে বাসে করে গিয়েছি। কিন্তু ফেরার আগেই লকডাউন শুরু হয়ে গেল। তাই বিপাকে পড়েছি। কিন্তু জীবিকার তাগিদে না ফিরে উপায় নেই। তাই সাইকেল নিয়েই রওনা হয়েছি।

খোলা আকাশের নিচে পথে রাত কাটাতে হলেও রাজধানীতে ফিরে সরকারের বিধিনিষেধ নিয়ে অভিযোগ নেই রবিনের। তিনি বলেন, অনেকেই ট্রাকে বা নানা অবৈধ উপায়ে ঢাকায় ফেরার চেষ্টা করছেন। আমি সেটা করিনি। সোজা পথে চলেছি। বৈধ উপায়ে ঢাকায় ফেরার যে সুযোগ ছিল সেটাই ব্যবহার করেছি। তাই যশোর থেকে সাইকেল চালিয়েই ফিরলাম। কষ্ট হয়েছে। রাস্তায় রাত কাটাতে হয়েছে। কিন্তু কোন ‘গিল্টি ফিলিংস’ নেই। কারণ পরিস্থিতি সব সময় অনুকূলে থাকে না। কিন্তু কোন না কোন পথ খোলা থাকবে। বেআইনী পথ হয়ত সহজে গন্তব্যে পৌঁছে দেবে। কিন্তু বৈধ উপায়টি বেছে নিলে আপনার জীবনে শান্তি থাকবে। তাড়াহুড়া করিনি। দূরের গন্তব্য, তাই ছুটেছি ধীরেসুস্থে। শুক্রবার রাতে দৌলতদিয়া ঘাটে পৌঁছেছি। চায়ের দোকানের বেঞ্চে ঘুমিয়েছি। ফ্রেশ হয়ে আবার রওনা করেছি আজ। রবিন বলেন, লকডাউন চলছে। দেশে করোনার যে পরিস্থিতি এটা মানতে হবে। কিন্তু কাজ না করলে পেটে খাবার জুটবে না। মাস গেলে বাসা ভাড়া, সংসার খরচ কিছুই থেমে থাকে না। তাই রাস্তায় বের হয়েছি। স্বাস্থ্যবিধি মেনে যতটা সম্ভব নিজেকে ও অন্যকে সুরক্ষিত রেখে এখন কাজ করতে হবে।

আব্দুল বাতেন কাজ করেন রাজধানীর একটি বেসরকারী ওষুধ কোম্পানিতে। ঈদের ছুটি শেষে ঢাকা ফিরেছেন সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া থেকে। ভাড়ায়চালিত মোটরসাইকেলে ঢাকায় ফিরতে তার খরচ হয়েছে দুই হাজার টাকা। আমিনবাজার ব্রিজ পর্যন্ত মোটরসাইকেলে আসতে পারলেও পুলিশী বাধায় ব্রিজেই নামতে হয় তার। তিনি বলেন, একদিকে টাকা তো গেছেই অস্বাভাবিক হারে অন্যদিকে পরিশ্রমও হয়েছে, সময়ও গেছে। তারপরও প্রয়োজনের তাগিদেই ফেরা। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে জীবিকা রক্ষা।

বাতেনের মতোই হাজার হাজার মানুষকে শনিবারও ঢাকায় ফিরতে দেখা গেছে। লকডাউনে সব ধরনের পরিবহন বন্ধ থাকায় বিকল্প ব্যবস্থায় ঢাকায় ফিরতে হয়েছে। তাদের ফেরার গল্প যেন সব বিচিত্র কাহিনীর সমাহার।

শনিবার সকালে গাবতলী ও আমিনবাজারে গিয়ে দেখা যায়, স্বজনদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি শেষে ঢাকায় ফিরছে মানুষ। চাকরি বাঁচাতে হেটে, মোটরসাইকেল কিংবা সাইকেলে ঢাকায় ফিরছেন তারা। বাস বন্ধ থাকায় বেশিরভাগ মানুষই ফিরছেন ব্যক্তিগত গাড়িতে চড়ে। তবে প্রবেশমুখে ছিল পুলিশের কড়াকড়ি। চেকপোস্টে ট্রাফিক পুলিশের সদস্যরা গাড়ি, মোটরসাইকেল চেক করছেন। জরুরী পরিষেবা ব্যতীত অন্য কোন গাড়িকে শহরে প্রবেশ করতে দেয়া হচ্ছে না। আগত লোকদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, এত কষ্ট করে যারা আসছেন তাদের মধ্যে ব্যাংক ও ওষুধ কোম্পানির লোকজন বেশি। ঈদের ছুটিতে পরিবার নিয়ে বাড়িতে গিয়ে এখন আবার ফিরেছেন তারা। জরুরী সেবার আওতায় ব্যাংক ও ওষুধ কোম্পানির লোকজন চলাচলের সুযোগ থাকলেও পরিবারসহ ঢাকায় আসা বন্ধ করা নিয়ে বেকায়দায় পুলিশ। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ছাড় দেয়া হলেও, যারা বেশি গাদাগাদি করে কিংবা মাস্ক ছাড়া আছেন তাদের দেয়া হচ্ছে মামলা। আমিনবাজার ব্রিজের মুখে চেকপোস্টের পুলিশ সদস্যরা বলছেন, আমরা ট্রাফিক বিভাগের। বড়জোর গাড়ির বিরুদ্ধে মামলা ও জব্দ করতে পারি। কিন্তু হেঁটে আসা মানুষদের আটকানোর কোন এখতিয়ার আমাদের নেই। এখানে থানা পুলিশ কিংবা মোবাইলকোর্ট থাকলে তাদের আটকানো, জরিমানা কিংবা অন্য কোন ব্যবস্থা নিতে পারত। একজন পুলিশ সদস্য বলেন, বিগত দিনের তুলনায় আজকে কম মানুষ আসছেন। যারা আসছেন, তাদের মধ্যে ব্যাংক ও ওষুধ কোম্পানির লোকজন বেশি। এ ছাড়া চিকিৎসার জন্যও অনেক মানুষ আসছেন। ওষুধ কিংবা ব্যাংক কোম্পানির লোকজন, জরুরী সেবার আওতায় পড়েন। কিন্তু তারা তো বাড়ি থেকে আসছেন পরিবার নিয়ে, এটা জরুরী সেবার মধ্যে পড়ে না। তারপরও অনেক গাড়িকেই মামলা দেয়া হয়েছে।

এদিনও দেখা গেছে, রাজধানীতে জরুরী সেবা ও রিক্সা ছাড়া কোন গাড়ি চলাচল করছে না। একইসঙ্গে নির্দিষ্ট স্থান ছাড়া পুলিশের চেকপোস্টও লক্ষ্য করা যায়নি। ঢাকার বাইরে থেকে রাজধানীতে প্রবেশদ্বারে পুলিশ প্রশাসন কঠোর অবস্থানে রয়েছে। জরুরী প্রয়োজন ছাড়া কোন গাড়িই ছাড়ছে না পুলিশ। তবে অনেকেই পথে বিভিন্ন যানবাহন বদলে ভেঙ্গে ভেঙ্গে রাজধানীতে আসছেন। আমিনবাজার এলাকায় নেমে অনেককেই হেঁটে রাজধানীতে প্রবেশ করতে সরেজমিনে দেখা গেছে। এছাড়া মোটরসাইকেল, বাইসাইকেল ও রিক্সায়ও রাজধানীতে প্রবেশ করছে মানুষ। তবে রাজধানীর বিভিন্ন মোড়ে পুলিশের বেশকিছু তল্লাশি চৌকি থাকলেও বেশিরভাগ চৌকিতেই তেমন কড়াকড়ি ছিল না। কোন কোন এলাকায় লোকজনকে নির্বিঘ্নে ঘোরাফেরা করতে দেখা গেছে। কোথাও আবার অলি-গলির রেস্টুরেন্টে খাবার পরিবেশন করতেও দেখা গেছে। যাত্রাবাড়ী, ওয়ারি, মতিঝিল, লালবাগ, শাহবাগ, মালিবাগ, মগবাজার, ফার্মগেট, মোহাম্মদপুর, ধানমণ্ডি, শ্যামলী ও মিরপুর এলাকা ঘুরে দেখা যায়, রাজপথ ছিল রিক্সার দখলে। প্রাইভেটকারের চলাচল গতকালের তুলনায় ছিল বেশি। ফার্মগেট মোড়ে প্রায় আধাঘণ্টা দাঁড়িয়েও দেখা যায়নি পুলিশের চেকপোস্ট। সংসদ ভবন, তেজগাঁও ও কাওরান বাজার থেকে আসা গাড়িগুলোকে অবাধে চলতে দেখা গেছে। এখানে বিভিন্ন বিভিন্ন দিক থেকে আসা গাড়িগুলো পুলিশের চেকপোস্টের মুখোমুখি হতে হয়। সেখানে দায়িত্বরত পুলিশ কর্মকর্তারা গাড়ি থামিয়ে বাইরে বের হওয়ার কারণ জানতে চান। সদুত্তর না পেলে গাড়ির মালিককে গুনতে হয় জরিমানা। মতিঝিলের চেকপোস্টে পুলিশ যাত্রাবাড়ী থেকে আসা একটি প্রাইভেটকার থামায়। ভেতরের যাত্রী জানান, অসুস্থ মেয়েকে দেখতে ঢাকায় এসেছেন। কাগজপত্র চেক করে পুলিশ গাড়িটিকে ছেড়ে দেয়। দুপুরে শাহবাগ পুলিশের চেকপোস্টে দেখা যায় মোটরসাইকেল, প্রাইভেটকার ও পিক-আপ ভ্যান থামিয়ে চালক ও যাত্রীদের জিজ্ঞাসাবাদ করতে। উপযুক্ত কারণ দেখাতে না পারলে জরিমানা গুনতে হচ্ছে। শাহবাগে দায়িত্বরত এক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, গত পরশু শুক্রবারের চাইতে গাড়ি চলাচল যেমন বেড়েছে তেমনই বেড়েছে ব্যক্তিগত গাড়ি। যারা বাইরে বের হচ্ছেন তারা বিভিন্ন অজুহাত দেখাচ্ছেন। জেল-জরিমানা করেও মানুষের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। ডিএমপির মিডিয়া এ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার ইফতেখায়রুল ইসলাম বলেন, করোনার সংক্রমণ রোধে দুই সপ্তাহের কঠোর বিধিনিষেধ নিশ্চিতে রাজধানীজুড়েই সক্রিয় রয়েছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। রাজধানীতে সরকারী বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে অকারণে ও নানা অজুহাতে ঘর থেকে বের হওয়া এবং লকডাউনেও প্রতিষ্ঠান খোলা রাখায় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।

উল্লেখ্য, গত শুক্রবার সকাল ৬টা থেকে শুরু হওয়া বিধিনিষেধ চলবে আগামী ৫ আগস্ট দিবাগত রাত ১২টা পর্যন্ত। এ সময় গার্মেন্টস ও কলকারখানা বন্ধ রয়েছে। বিধিনিষেধ চলাকালে খুলবে না।

শীর্ষ সংবাদ: