ঢাকা, বাংলাদেশ   সোমবার ০৩ অক্টোবর ২০২২, ১৮ আশ্বিন ১৪২৯

মনিরুল ইসলাম মনি

পেছনে না তাকানো মরিয়মের গল্প...

প্রকাশিত: ০৯:৫০, ২৬ জুলাই ২০১৯

 পেছনে না তাকানো মরিয়মের গল্প...

ক্রমশই দেশে নারীরা এগিয়ে যাচ্ছেন তাদের সপ্রতিভ প্রদীপ জ্বেলে। বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়নও সন্তোষজনক। দেশের প্রতিটি ক্ষেত্রেই রয়েছে নারীর অসামান্য অবদান। কর্মক্ষেত্রেও রয়েছে ঈর্ষণীয় সাফল্য। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের ২০১৬ সালে ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপ-উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. শিরীন আখতার। ইতিহাস সৃষ্টিকারী এই নারী উপাচার্য (রুটিন দায়িত্বপ্রাপ্ত) দায়িত্ব পাওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়েরই ছাত্রী ও শিক্ষক মরিয়ম ইসলাম লিজা সহকারী প্রক্টর হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। আর এর মাধ্যমে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে প্রথম কোন নারী সহকারী প্রক্টরের দায়িত্ব পেলেন। এ অর্জন নারী জাতির জন্য অনেক সম্মানের। অবশ্য তিনি পাশাপাশি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রীতিলতা হলের আবাসিক শিক্ষক হিসেবে নিষ্ঠা ও দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। বর্তমানে পদোন্নতি পেয়ে সহকারী অধ্যাপক পদে কর্মরত আছেন। অদম্য সাহসী এই নারীর কর্মজীবন শুরু হয় বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদে ফেলো হিসেবে। সেই সঙ্গে তিনি বিশ্বের স্বনামখ্যাত বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান বার্জার পেইন্টস্ বাংলাদেশ লিমিটেডে কনসালটেন্ট হিসেবে দক্ষতার পরিচয় দেন। এরপরই তিনি ২০১৭ সালে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে প্রভাষক পদে যোগদান করেন। তিনি প্রভাষক ক্যাটাগরিতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের হলুদ দল থেকে মনোনীত প্রার্থী হিসেবে একাডেমিক কাউন্সিলের সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন। নারী হিসেবে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি ইতিহাসের জন্ম দিলেন দৃঢ়প্রত্যয়ী এই নারী। এ ব্যাপারে তিনি বলেন, অবশ্যই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে প্রক্টোরিয়াল বডিতে আমাকেই প্রথম নারী হিসেবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ করে দেয়া হয়েছে। তবে আমি আমার কর্মকা-ের মাধ্যমে প্রমাণ করতে চাই, নারীরাও পারে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যেভাবে সারা পৃথিবীতে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, সেই অনুপ্রেরণায় অনুপ্রাণিত হয়ে আমিও কাজ করতে চাই। যাতে এই সকল চ্যালেঞ্জিং পদে নারীরা নির্দ্বিধায় আরও এগিয়ে আসতে পারে। মরিয়ম ইসলাম লিজা, ১৯৮৪ সালে কুমিল্লার এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্ম। শৈশবেই স্কুলের পাঠদানের আগেই যুক্ত হয়েছিলেন সাংস্কৃতিক অঙ্গণের সঙ্গে। পাঁচ বছর বয়সে ভর্তি হয়েছিলেন শিশু একাডেমিতে। সেই সঙ্গে নাচের তালিম নিতে শুরু করেন কুমিল্লার ঐতিহ্যবাহী নৃত্য প্রতিষ্ঠান সুবল সঙ্গীতাঙ্গনের তপন দাস গুপ্তার কাছে। তারপর তার প্রাথমিক শিক্ষার শুরু হয় আওয়ার লেডি ফাতেমা গার্লস স্কুলে। পড়াশোনার পাশাপাশি ছোটবেলা থেকেই শিল্পকলা একাডেমিসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের বিভিন্ন আয়োজনে অংশগ্রহণ করতেন। খেলাধুলা ও বিতর্কে ছিলেন সমানে সমান। তিনি ২০০০ সালে কৃতিত্বের সঙ্গে পাঁচটি বিষয়ে লেটার মার্কসহ মাধ্যমিক পরীক্ষা পাস করেন ফয়েজুন্নেসা সরকারী মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে। এরপর তিনি ভর্তি হন কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারী কলেজের বিজ্ঞান বিভাগে। উচ্চশিক্ষার জন্য ভর্তি হন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে। বিশ্ববিদ্যালয়েও তিনি পড়াশোনার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। তিনি রসায়ন বিভাগ থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত রসায়ন ও কেমিকৌশল বিভাগ হতে ন্যানো টেকনোলজিতে শেষ করেন উচ্চতর ডিগ্রী এম ফিল। তত দিনে তিনি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তার বিশ্ববিদ্যালয়েরই সহপাঠী সৈয়দ শামসুল তাবরীজের সঙ্গে। যিনি বর্তমানে উপজেলা নির্বাহী অফিসার হিসেবে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলা কর্মরত। এখানেই থেমে নেই তার পথচলা। বহমুখী প্রতিভার অধিকারী মরিয়ম ২০০১ সালে বিভাগীয় ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় এ্যাথলেটিক্সে অংশগ্রহণ করেন। ক্রীড়াঙ্গনেও দেখান কাব্যিক নৈপুণ্য! তার বাবা মোঃ শহিদুল ইসলাম চাকরিজীবী হলেও তিনি ছিলেন একজন জাতীয় ক্রীড়াবিদ। তবে খেলাধুলার হাতেখড়িটা পেয়েছেন বাবার কাছ থেকেই। তার মা নুরজাহান বেগম গৃহিণী। মেয়ে বলে পিছিয়ে থাকতে নেই; এই শিক্ষাটি বাবা-মা সবসময়ই দিয়েছেন তাকে। তিন বোন এবং এক ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় তিনি। তারপর থেকে আর পেছনে তাকাতে হয়নি অদম্য এই মরিয়মকে। যেখানেই অংশ নিয়েছেন সেখানেই এসেছে সাফল্য নামের সোনার হরিণটি। বর্তমানে ছেলেদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মেয়েরাও ভর্তি হচ্ছে। উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে নিজেদের পায়ে দাঁড়াচ্ছে। যা একটি জাতির ভিত গড়তে যথেষ্ট। অন্যান্য সময়ের তুলনায় বর্তমানে নারীর ক্ষমতায়নের পাশাপাশি স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রীদের সংখ্যা বাড়ছেই। তবে আশার কথা হলো, একসময় কিশোরীর শিক্ষা নিয়ে নিজের পরিবার বাধা দিলেও এখন উৎসাহের সঙ্গে নারীশিক্ষা গ্রহণে উদ্বুগ্ধ হচ্ছে। মরিয়ম ইসলাম বলেন, দায়িত্ব পাওয়ার চেয়ে দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করাটাই বড় চ্যালেঞ্জ। আমি আশ্বস্ত করতে চাই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন আমার উপর আস্থা রেখে যে দায়িত্ব অর্পণ করেছেন, তা পালনের জন্য আমি আমার সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে আপ্রাণ চেষ্টা করব, যেন বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনশৃঙ্খলা সুদৃঢ় রেখে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার শতভাগ সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় থাকে। শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন সামাজিক ও পেশাজীবী সংগঠনের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছেন নারীরা নীরবে। এরই প্রেক্ষিতে তিনি যুক্ত আছেন বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশন এর কেন্দ্রীয় কমিটিতে। যুক্ত আছেন বঙ্গবন্ধু পরিষদের চট্টগ্রাম জেলা শাখা ও বঙ্গবন্ধু পরিষদের চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সঙ্গেও। এছাড়া এদেশের পিছিয়ে পড়া ছিন্নমূল পথশিশুদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা প্রদান ও তাদের সুস্থ সাংস্কৃতিক চর্চায় উৎসাহের লক্ষ্যে ‘শিশু প্রতিভা বিকাশ কেন্দ্র’র জন্য কাজ করে যাচ্ছেন নিরলসভাবে। শিশুদের অধিকার ও শিক্ষা নিশ্চিতে কর্মক্ষেত্রে কাজের পাশাপাশি অবসরেও দিয়ে যাচ্ছেন তার মূল্যবান সময়টুকু। যে সময়টুকু তার বাড়িতে বসে আরাম-আয়েশ করার কথা ছিল। তিনি বলেন, শিক্ষকতা আমার পছন্দের পেশা। তাই আমি শুধু উচ্চ শিক্ষা নিয়েই কাজ করছি না। আমি অবসরে সমাজের পিছিয়ে পড়া ও অবহেলিত শিশুদের শিক্ষা নিশ্চিত করতেও কাজ করে যাচ্ছি। যদি আমি একজন পথশিশুকেও শিক্ষিত করে তুলতে পারি, তবে সেদিনই শিক্ষকতা পূর্ণতা লাভ করবে। সেদিনই আমি নিজেকে শিক্ষক হিসেবে মূল্যায়ন করতে পারব। বাংলাদেশের উন্নয়ন যাত্রায় নারীরা অসামান্য অবদান রাখছেন। সামাজিক পরিবর্তনের মাধ্যমে বাংলাদেশের নারীশিক্ষার প্রসার ও অর্থনৈতিক প্রক্রিয়া রূপান্তরে নারীর ক্ষমতায়ন বিশেষ ভূমিকা পালন করছে। দেশকে নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর ভিশনকে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বাংলাদেশের সকল নারী নিঃসঙ্কোচে নির্ভয়ে এগিয়ে আসবেন ঠিক মরিয়ম ইসলাম লিজার মতো।