ঢাকা, বাংলাদেশ   সোমবার ০৩ অক্টোবর ২০২২, ১৮ আশ্বিন ১৪২৯

বাংলাদেশে বিলুপ্তপ্রায় সিমিয়ান প্রাইমেট লজ্জাবতী বানর

প্রকাশিত: ০৯:৪৩, ২৯ এপ্রিল ২০১৯

 বাংলাদেশে বিলুপ্তপ্রায় সিমিয়ান প্রাইমেট লজ্জাবতী বানর

সমুদ্র হক ॥ বানর। কেউ বলে বান্দর, বাঁদর। সারাক্ষণ বাঁদরামিতে মশগুল। বনে গাছের শাখা প্রশাখায় অযথা লাফালাফি করে। ডালেও ঝুলে থাকে। মানুষ দেখলে মুখ ভ্যাংচায়। মানুষের আচরণ অনুকরণ করে। সুযোগ পেলে কাঁধে বসে। কারও আচরণ বানরের মতো হলে বলা হয় ‘বাঁদরামি।’ বানরকে সবাই চেনে। যদি শোনা যায় কিংবা দেখা যায় লজ্জাবতী বানর, তাহলে তো একটু অবাক হতেই হয়। লজ্জাবতী বানর বাঁদরামি করে না। খুবই শান্ত। চলাফেরা অত্যন্ত ধীর গতির। লেজ ছোট। পারতপক্ষে মানুষের সামনে আসে না। চোখে পড়লেই দুই হাতে মুখ ঢাকে। এরা নিশাচর। দিনে কম বেরয়। রাতই এদের পছন্দ। চোখ বিড়ালের মতো জ্বলজ্বলে। সে দুষ্টু বানর যা খায় এরাও তাই। বাংলাদেশে লজ্জাবতী বানর বিলুপ্তপ্রায়। ইদানীং কালেভদ্রে চোখে পড়ে। বগুড়া সরকারী আজিজুল হক কলেজের শিক্ষার্থীদের পরিবেশবাদী সংগঠন টিম ফর এনার্জি এ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট রিসার্চের (তীর) কয়েক সদস্য বন বিভাগের সহযোগিতায় সম্প্রতি দুটি লজ্জাবতী বানর উদ্ধার করেছে। পরে অবমুক্ত করা হয় হবিগঞ্জের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মনিরুল এইচ খান জানিয়েছেন, দেশে লজ্জাবতী প্রজাতির যে বানর আছে তা ‘বেঙ্গল স্লো লরিস’ নামে পরিচিত। নাম শুনেই বুঝে নেয়া যায় এরা খুবই ধীর গতির। ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন এ্যান্ড নেচার (আইইউসিএন) লজ্জাবতী বানরকে সঙ্কটাপন্ন উল্লেখ করেছে। পরিবেশবিদরা লজ্জাবতী বানরকে রক্ষায় বিশ্বের সব দেশের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। যদি কোথাও ‘মেল বেঙ্গল স্লো লরিস’ পাওয়া যায় তাহলে আশপাশেই খুঁজে দেখতে হবে ফিমেলও আছে। স্ত্রী লজ্জাবতী পাওয়া গেলেও একই ভাবে পুরুষ খুঁজতে হবে। যাতে এরা জুটিবদ্ধ থেকে প্রজননে বংশ বিস্তার ঘটাতে পারে। বগুড়ার তীর সভাপতি আরাফাত রহমান জানান, এপ্রিলের মধ্যভাগে তাদের এক সদস্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি ছবির পোস্টে জানতে পারেন জামালগঞ্জে একটি প্রাণী পাওয়া গেছে, তাকে চেনা যাচ্ছে না। ছবিটি দেখে আরাফাত রহমান, রিফাত হাসান ও মিজানুর রহমান জামালপুর জেলার দেওয়ানগঞ্জ বাজারে গিয়ে খোঁজ করেন। দেখেন এলাকার লোকজন ওই প্রাণীকে খাঁচায় বন্দী করে রেখেছে। কৌতূহলী লোকজন ভিড় করছে। তারা বিষয়টি বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের পরিচালক মিহির কুমার দে কে জানিয়ে ফোনে প্রাণীটির ছবি পাঠিয়ে নিশ্চিত হয় এটি বিরল প্রজাতির লজ্জাবতী বানর। পরে তার অনুমতি, সহযোগিতা ও দিক নির্দেশনায় উপজেলা বন কর্মকর্তার উপস্থিতিতে লজ্জাবতী বানর নিয়ে রওনা দেন সাতছড়ির দিকে। পথে জানতে পারেন শেরপুরের হালুয়াঘাটায় এলাকার লোকজন আরেকটি লজ্জাবতী বানর খাঁচায় বন্দী করেছে। ময়মনসিংহ বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এ কে এম রুহুল আমিন ও সহকারী বন কনজারভেটর ড. প্রাণতোষ রায়ের সহযোাগিতায় সেই লজ্জাবতী বানরটিও উদ্ধার করা হয়। দেখা যায় বানর দুটির প্রথমটি পুরুষ পরেরটি স্ত্রী। জুটি ছিন্ন হয়ে এরা একে অপরকে খুঁজছিল। বানর দুটিকে যখন একই খাঁচায় নেয়া হলো তখন ওদের অভিব্যক্তিই বলে দিচ্ছিল খুঁজে পাওয়ার কী আনন্দ আকাশে-বাতাসে। এরপর তীরের সদস্যরা পৌঁছান হবিগঞ্জের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে। ১৮ এপ্রিল সকালে জাতীয় উদ্যান কর্মকর্তা ফরেস্টার মাহমুদ আলীর কাছে লজ্জবতী বানর দুটি হস্তান্তরের পর দুটিকে বনে অবমুক্ত করা হয়। মুক্ত আঙ্গিনায় ওরা পৌঁছেই ধীর গতির চলাতেই কি যে আনন্দ শুরু করে তা দেখেও হৃদয় জুড়ে যায়, প্রশান্তি আসে। আইইউসিএন জানায় মূলত সিমিয়ান প্রাইমেটদের তিনটি দলের মধ্যে দুটির সদস্য সাধারণভাবে বানর নামে পরিচিত। এই প্রজাতি নতুন পৃথিবীর বানর। পুরান পৃথিবীর বানর দেখা যায় দক্ষিণ এশিয়া ও উত্তর আফ্রিকায়। বানর খুবই চতুর। চাতুর্য্যভেরা বুদ্ধি। বেশিরভাগ প্রজাতির বাস গাছে। নিরামিষ ভোজী। বাসস্থান ও খাদ্যে বৈচিত্র্য আছে। বিশ্বে বর্তমানে ১৯ প্রজাতির বানরের মধ্যে এক প্রজাতি ছাড়া বাকিগুলো ছড়িয়ে আছে এশিয়া ও আফ্রিকার দেশগুলোতে। বাংলাদেশে দশ প্রজাতির প্রাইমেটের মধ্যে বর্তমানে আছে পাঁচ প্রজাতি। এগুলো রেসাস, খাটোলেজি, প্যারাইল্লা বা লম্বা লেজি, মুখপোড়া ও চশমা বানর। পরের দুই প্রজাতিকে অনেকে হনুমান বলে ভুল করেন। রেসাস ও খাটো লেজি বানরই মূলত লজ্জাবতী বানর। অন্য প্রজাতির বানর পোষ মানে। এদের শিকল বন্দী করে খেলা দেখায় কেউ কেউ। তবে লজ্জাবতী বানরকে পোষ মানানো যায় না। এরা মানুষের কাছে আসতেই চায় না। মনে হবে মানুষের ওপর কোন কালের পুঞ্জীভূত রাগ কিংবা আজও মনে রেখেছে ওরা। সেই রাগের বহির্প্রকাশ ঘটাচ্ছে এভাবে। এই বানরের ইংরেজি নাম বেঙ্গল স্লো লরিস। সব প্রজাতির বানরের উৎপত্তি অন্তত চার মিলিয়ন বছর আগের। লজ্জাবতী শেষের দিকের প্রজাতি। এদের মাথা গোলাকৃতি। চোখ বড়। ড্যাবড্যাব করে তাকায়। এদের হাত-পা প্রায় একই সমান। চলাচল খুবই ধীর। এরা অনেকটা বিড়ালের মতো। ওজন দেড় থেকে দুই কেজি। আরেক পরিচিতি বনের চিরসবুজ। যদিও এদের আয়ুষ্কাল ২০ বছর। গায়ের রং ধূসর ও অফ হোয়াইট। ফলফলাদি এদের প্রিয় খাবার। জুটিবদ্ধ থাকতেই ভালবাসে। লেজ ছোট বলে বলাবলি হয় প্রাচীন ইতিহাসের ধারাবহিকতায় বানরের লম্বা লেজ ছোট হতে হতে এক পর্যায়ে খাটো হয়ে গেছে। অনেকটা চার্লস ডারউইনের থিওরির মতো।