ঢাকা, বাংলাদেশ   রোববার ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১০ আশ্বিন ১৪২৯

জেলার সোহেলের জামিন নামঞ্জুর ॥ দুদিনের রিমান্ডে

প্রকাশিত: ০৬:৩৫, ৩০ অক্টোবর ২০১৮

জেলার সোহেলের জামিন নামঞ্জুর ॥ দুদিনের রিমান্ডে

চট্টগ্রাম অফিস/নিজস্ব সংবাদদাতা, কিশোরগঞ্জ ও ভৈরব থেকে ॥ মাদক ও বিপুল পরিমাণ অবৈধ অর্থসহ গ্রেফতারকৃত এবং চট্টগ্রামের জেলার সোহেল রানা বিশ্বাসকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য দু’দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছে আদালত। সোমবার দুপুরে জিআরপি তাকে কিশোরগঞ্জের চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে সোপর্দ করে সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন জানালে বিচারক ইকবাল মাহমুদ উভয় পক্ষের শুনানি শেষে দু’দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। শুনানি চলাকালে সোহেল রানার পক্ষে এ্যাডভোকেট কুলেশ চন্দ্র নাথ কাজল আসামির জামিন প্রার্থনা করেন। সরকার পক্ষে সিএসআই মোঃ জিয়াউল রাব্বি জামিনের বিরোধিতা করে রিমান্ড মঞ্জুরের আবেদন জানান। এর আগে সোহেল রানাকে গ্রেফতার সংক্রান্তে দায়েরকৃত মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কিশোরগঞ্জ কারাগার থেকে আসামিকে আদালতে হাজির করেন। উল্লেখ্য, গত শুক্রবার দুপুওে ভৈরব রেলস্টেশনে রেল পুলিশ বিজয় এক্সপ্রেস ট্রেনে অভিযান চালিয়ে সোহেল রানাকে আটক করে। তার কাছ থেকে উদ্ধার হয় নগদ ৪৪ লাখ ৪৫ হাজার টাকা, আড়াই কোটি টাকার এফডিআর রিসিট, ১ কোটি ৩০ লাখ টাকার বিভিন্ন ব্যাংকের ৩টি চেক ও ১২ বোতল ফেনসিডিল। এ ঘটনায় শনিবার সোহেল রানার বিরুদ্ধে ভৈরব জিআরপি থানার এসআই আশরাফ উদ্দিন ভূঁইয়া বাদী হয়ে মাদক ও মানিলন্ডারিং আইনে দুটি মামলা দায়ের করেন। মাদক নিয়ে গ্রেফতারের ঘটনায় তাকে ২ দিনের রিমা- প্রদান করা হয়েছে। অপরদিকে, মানিলন্ডারিং সংক্রান্ত মামলাটি তদন্তের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনে পাঠানো হয়েছে। এদিকে, সোহেল রানা গ্রেফতারের পর চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে চলে আসা অনিয়ম, দুর্নীতির চিত্র পাল্টে যাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। সোহেল রানা একটি সিন্ডিকেট গড়ে বন্দী এবং তাদের আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে নিয়মিত ঘুষ আদায় করতেন। বিষয়টি এখন চাউর হওয়ার পর জেল অভ্যন্তরে ভিন্ন চিত্র দৃশ্যমান। সোহেল রানার বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে অনিয়ম, দুর্নীতি ছাড়াও ডিআইজি থেকে ডেপুটি জেলার এবং কারারক্ষী পর্যন্ত শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা এবং হুমকি-ধমকি প্রদানের নানা ঘটনা বেরিয়ে এসেছে। আরও কিছু চিত্র উঠে আসছে। এর মধ্যে রয়েছে গত ২৮ মার্চ যশোর কারাগারে কারারক্ষী নিয়োগে গঠিত কমিটিতে তাকে সদস্য সচিব করা হয়েছিল। বোর্ডের সভাপতি ছিলেন কুমিল্লা জেলের বর্তমান সিনিয়র জেলার জাহানারা বেগম। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ঘুষ নিয়ে তার পছন্দের কারারক্ষী পদপ্রার্থীদের সিলেক্ট না করায় সোহেল রানা জাহানারা বেগমকে শারীরিক ছাড়া নানাভাবে অপদস্থ করেন। বিষয়টি কারা অধিদফতরকে অবহিত করা হলেও এর কোন বিহিত ব্যবস্থা হয়নি। অপরদিকে, চট্টগ্রামে ডেপুটি জেলার থাকাকালে বর্তমান ফেনী জেল সুপার রফিকুল কাদেরকে এই সোহেল রানা গলাটিপে মারধর করেছিলেন। এ বিষয়টিও কারা অধিদফতরকে জানানো হয়েছিল। এতেও কোন সুফল মেলেনি। আরও আগে তিনি ডিআইজি (প্রিজন), কয়েক জেলার, ডেপুটি জেলার এবং অসংখ্য কারারক্ষীকে নানাভাবে অপদস্থ করে রেকর্ড গড়েছেন। চাকরিগত জীবনে তার এসিআর (এ্যানুয়েল কনফিডেন্সিয়াল রিপোর্ট) যাচাই করে দেখা হলে বেরিয়ে আসবে থলের বিড়াল। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে, এক আইজি (প্রিজন), এক এডিশনাল আইজি, আট ডিআইজি, ৬৮ জেল সুপার, ডেপুটি জেল সুপার ও কারারক্ষীসহ প্রায় ১২ হাজার কর্মকর্তা কর্মচারী রয়েছে কারা অধিদফতরের নিয়ন্ত্রণে। এদের সকলের কাছে এই সোহেল রানা বিশ্বাস নানাভাবে আলোচিত এবং অনেকের কাছে আতঙ্কেরও বটে। হেন কোন অপকর্ম নেই তিনি গ্রেফতারের পূর্বে বিভিন্ন স্থানে চাকরিরত অবস্থায় করেননি। চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের একটি সূত্র জানিয়েছে, সোহেল রানার অপকর্মের বিরুদ্ধে যে তদন্ত কমিটি হয়েছে তার প্রাথমিক তদন্ত শুরু হয়েছে। কমিটির সদস্যরা চট্টগ্রাম কারাগার সফরের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এখনও দিন তারিখ জানানো হয়নি। এ কারাগারে যেসব বন্দীদের নিয়ে তিনি অবৈধ পথে অর্থ রোজগারের সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছিলেন তাদের অনেককে গ্রেফতারের আগেই অন্যত্র স্থানান্তর করা হয়েছে। যারা এখনও এ জেলে রয়েছে তাদের মধ্যে বড় ধরনের শঙ্কার জন্ম নিয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র আরও জানিয়েছে, দেশের কারাগারসমূহে কর্মরত জেলারদের মধ্যে তিনিই প্রথম, যিনি মাদক ও অবৈধ অর্থ নিয়ে গ্রেফতার হয়ে জেলে গেলেন। এছাড়া আসামিকে অন্যায়ভাবে পেটানোর দায়ে একজন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জেলে যাওয়ার ঘটনা রয়েছে। এছাড়া আরেক জন ডেপুটি জেলারও অনিয়মের কারণে জেল খাটার রেকর্ড রয়েছে। তবে এই সোহেল রানা অনিয়ম, জালিয়াতি, জেল অভ্যন্তরে ঘুষ, মাদক, দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসীদের নিয়ে সিন্ডিকেট গড়ে বিত্ত গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ রেকর্ড করেছেন। বিস্ময়কর বিষয়টি হচ্ছে, এত অনিয়ম দুর্নীতির পরও তিনি কিভাবে একজন জেলারের পদে চাকরি করে আসছিলেন। তার খুঁটির জোর কোথায় তা স্বাভাবিকভাবে সংশ্লিষ্ট সকল মহলে বড় ধরনের প্রশ্নের উদ্রেক করেছে।