ঢাকা, বাংলাদেশ   রোববার ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১০ আশ্বিন ১৪২৯

জিজ্ঞাসাবাদে তথ্য

তাইজুদ্দিনকে পাকিস্তান পালাতে সহায়তা করে খালেদার ভাগ্নে

প্রকাশিত: ০৫:৪৪, ২৯ আগস্ট ২০১৮

তাইজুদ্দিনকে পাকিস্তান পালাতে সহায়তা করে খালেদার ভাগ্নে

শংকর কুমার দে ॥ বহুল আলোচিত একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলার গ্রেনেড সরবরাহকারী বিএনপি-জামায়াতের উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুর ভাই হুজি নেতা মাওলানা তাইজউদ্দিনকে পাকিস্তানে পাঠাতে সহায়তা করেন বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার ভাগ্নে ও তার সাবেক একান্ত সচিব-১ (পিএস) সাইফুল ইসলাম ডিউক। ডিউক তদন্তকারীদের কাছে দেয়া জবানবন্দীতে হামলার পরিকল্পনাকারী হিসাবে উল্লেখ করেছে হাওয়া ভবনের নিয়ন্ত্রক বেগম খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমানের নাম এবং সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টু, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা হারিছ চৌধুরী ও বেশ কয়েকজন ডিজিএফআই ও এনএস্আই এর সাবেক কর্মকর্তার নাম। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুর ভাই হরকত-উল-জিহাদ (হুজি) নেতা মাওলানা তাইজউদ্দিনকে বিদেশে পালিয়ে যেতে সাহায্য করার ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে ডিউককে। সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার (ডিজিএফআই) বেশ কয়েকজন সাবেক কর্মকর্তাকে ইতোমধ্যেই জিজ্ঞাসাবাদ করেছে সিআইডি। গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের দেয়া তথ্য সম্পর্কে জ্ঞিাসাবাদ করা হয় ডিউককে। ডিউক ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় আসামিদের বিদেশে পালিয়ে যেতে সাহায্য করেছে এবং বিদেশে পলাতক আসামিদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করার ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় তাকে। আদালতে বিচারের সময়ে যুক্তিতর্ক উপস্থাপনকালে এ সব বিষয়ে আদালতকে অবহিত করেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী এ্যাডভোকেট সৈয়দ রেজাউর রহমান। তদন্তকারীদের কাছে ডিজিএফআইয়ের সাবেক কর্মকর্তাদের দেয়া জবানবন্দীতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার পর এই ব্যাপারে অবহিত করার বিষয়টি সামনে চলে আসে। সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ছেলে তারেক রহমান, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী, সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুর কারণে তখন ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার মামলার তদন্ত সঠিক পথে এগুতে না দিয়ে প্রশাসনিক সহায়তায় ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করা হয়। গোয়েন্দা সংস্থার সাবেক কর্মকর্তাদের দেয়া জবানবন্দীতেই বেগম খালেদা জিয়ার ভাগ্নে ও তার পিএস সাইফুল ইসলাম ডিউকের নামটি প্রকাশ পায়। এরপর তাকে গ্রেফতার করা হলে তদন্তকারীদের জিজ্ঞাসাবাদে দেয়া জবানবন্দীতে একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া, তার পুত্র তারেক রহমান, হাওয়া ভবন ইত্যাদি বিষয় তদন্তের সামনে চলে আসে। তদন্তে প্রকাশ পায়, সাইফুল ইসলাম ডিউকের ভায়রা ভাই হচ্ছেন ডিজিএফআইয়ের সাবেক পরিচালক লে: কর্নেল (চাকরিচ্যুত) সাইফুল ইসলাম জোয়ার্দার। দুই ভায়রা ভাইও ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় জড়িত। ডিউক গ্রেফতার হলেও তার ভায়রা ভাই ডিজিএফআইয়ের সাবেক পরিচালক এখনও পলাতক। সাইফুল ইসলাম ডিউকের ভায়রা ভাই সাইফুল ইসলাম জোয়ার্দার ছিলেন ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার সময়ে সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার (ডিজিএফআই) পরিচালক হিসাবে গ্রেনেড হামলার বিষয়ে সবকিছুই জানতে এবং প্রশাসনিক সহায়তায় প্রকৃত ঘটনা ধামাচাপা দিয়ে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার চেষ্টায় জড়িত। শুধু তাই নয়, সাইফুল ইসলাম জোয়ার্দার জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর ভাগ্নে ‘৭৫ এর ১৫ আগস্টে নিহত শেখ ফজলুল হক মনির ছেলে আওয়ামী লীগ দলীয় এমপি ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপসের ওপর বোমা হামলার সন্দেহভাজন আসামি। ডিউকের ভায়রা ভাই জোয়ার্দার ডিজিএফআইয়ের পরিচালক থাকাকালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুর ভাই হরকত-উল জিহাদ (হুজি) নেতা মাওলানা তাইজউদ্দিনকে পাকিস্তানে পালিয়ে যেতে সাহায্য করেছে। হুজি নেতা মাওলানা তাইজউদ্দিন কাশ্মীরের নাগরিক মজিদ ভাটের কাছ থেকে গ্রেনেড সংগ্রহ করে ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার জন্য গ্রেনেড সরবরাহ করেছে বলে তদন্তে প্রকাশ পেয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ভাগ্নে ও তার ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে সাইফুল ইসলাম ডিউকের তখন সরকার ও প্রশাসনের ওপর ব্যাপক প্রভাব ছিল এবং তার ভায়রা ভাই সাইফুল ইসলাম জোয়ারর্দার ডিজিএফআইয়ের পরিচালক হিসেবে তারও ছিল ব্যাপক প্রভাব। দুই ভায়রা ভাইয়ের প্রভাবের কাছে তৎকালীন সময়ে মন্ত্রী-এমপিরাও পাত্তা পেতেন না। তাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহায়তায়ই বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময়ে জঙ্গী সংগঠন হুজির জঙ্গীরা ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা চালায় এবং গ্রেনেড হামলা চালানোর পর গ্রেনেডের সরবরাহকারী মাওলানা তাইজউদ্দিনকে পাকিস্তানে পাঠিয়ে দেয়া হয়। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার গ্রেনেডের উৎস, গ্রেনেড সরবরাহ, গ্রেনেড হামলা, আসামিদের বিদেশে পালিয়ে যেতে সাহায্যকারীদের বিষয়েও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় ডিউককে। ডিউককে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার গ্রেনেড সরবরাহকারী হিসেবে মাওলানা তাইজউদ্দিনের বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে দেয়া জবানবন্দীতে ডিউক বলেছেন, মাওলনা তাইজউদ্দিনকে বিদেশে পালিয়ে যেতে সাহায্য করে সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআইয়ের মেজর মিজানুর রহমানও। ডিজিএফআইয়ের মেজর মিজানুর রহমানের বস ছিলেন ডিজিএফআইয়ের পরিচালক সাইফুল ইসলাম জোয়ার্দার। মেজর মিজানের দেয়া জবানবন্দীতে মাওলানা তাইজউদ্দিনকে বিদেশে পালিয়ে যেতে সাহায্য করার কথা উল্লেখ আছে। আদালতে বিচারের সময়ে যুক্তিতর্ক উপস্থাপনকালে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী সৈয়দ রেজাউর রহমান বলেন, এএসপি মুন্সি আতিক, এএসপি আব্দুর রশিদ, বিশেষ পুলিশ সুপার রুহুল আমিন মূল আসামিদের আড়াল করার জন্য ‘জজ মিয়া’ নাটক সৃষ্টি করে এ মামলার তদন্ত ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করেছেন। বিএনপি নেতা লুৎফুজ্জামান বাবর, তৎকালীন এডিশনাল আইজিপি খোদাবক্স চৌধুরী ও মুন্সি আতিক, আব্দুর রশিদ, রুহুল আমিন যোগসাজসে এ কাজ করেছেন। এ মামলায় গ্রেনেড সরবরাহকারী তাইজউদ্দিনকে বাদল নামের পাসপোর্ট দিয়ে ডিজিএফআইয়ের মেজর জেনারেল (অব.) এটিএম আমিন এবং লে. কর্নেল (অব.) সাইফুল ইসলাম জোয়ার্দার, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর পিএস-১ সাইফুল ইসলাম ডিউকের সহায়তায় তাইজউদ্দিনকে পাকিস্তানে পাঠিয়ে দেয়া হয়। এভাবে প্রশাসনিক সহায়তায় মামলাটি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করা হয়। আদালতে দেয়া জঙ্গী আসামিদের জবানবন্দীতে উল্লেখ আছে, বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের উপমন্ত্রী পিন্টুর ধানম-ির বাসায় বৈঠক হয়। ওই বৈঠকে অন্যান্যের মধ্যে পিন্টুর ভাই মাওলানা তাইজউদ্দিন, হুজি ঢাকা মহানগর সভাপতি মাওলানা আবু তাহেরও উপস্থিত ছিলেন। ওই বৈঠকে মাওলানা তাইজউদ্দিন আক্রমণের জন্য তার কাছে গ্রেনেড হস্তান্তর করে এবং পিন্টু ২০ হাজার টাকা দেন মুফতি আহসান উল্লাহ কাজলের হাতে। হামলার আগের দিন ২০ আগস্ট কাজল ও আবু জান্দাল বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে গিয়ে এলাকা পর্যবেক্ষণ (রেকি) করে আসেন। ২১ আগস্ট সকালে ওই বাসায় হামলায় অংশ নেয়ার জন্য নির্বাচিতরা একত্র হন। সিদ্ধান্ত হয়, মোট ১২ জন হামলায় অংশ নেবে। এতে কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন কাজল ও আবু জান্দাল। এরপর বাড্ডার ওই বাসায় তারা সবাই একসঙ্গে জোহরের নামাজ পড়ে দুপুরের খাবার খান। সেখানে তারা সর্বশেষ বৈঠক করেন। মাওলানা সাইদ জিহাদবিষয়ক বয়ান করেন। তারপর মুফতি হান্নান হামলার জন্য নির্বাচিত ১২ জনের হাতে ১৫টি গ্রেনেড তুলে দেন। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আসরের নামাজের সময়ে সবাই যার যার মতো গিয়ে গোলাপ শাহ মাজারের কাছে মসজিদে মিলিত হয়। সেখান থেকে তারা সমাবেশে মঞ্চ হিসেবে ব্যবহৃত ট্রাকটির চারপাশে অবস্থান নেয়। শেখ হাসিনার বক্তব্য শেষ হওয়ার পর পর আবু জান্দাল প্রথম গ্রেনেড ছুড়ে মারে। তারপর অন্যরা একে একে গ্রেনেড হামলা চালিয়ে যার যার মতো এলাকা ছেড়ে চলে যায়। গ্রেফতার হওয়া অন্তত সাত জঙ্গী আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক যে জবানবন্দী দিয়েছে, তাতে একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলার আগের দিন ২০ আগস্টে জঙ্গী অভি ফোনে আরেক জঙ্গী বিপুলকে বলেছে, ‘শেখ হাসিনাকে হালকা নাশতা করাতে হবে।’ এরপরের দিনই একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলার ঘটনা ঘটে। সৌভাগ্যক্রমে তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেতা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বেঁচে গেলেও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের স্ত্রী মহিলা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী আইভি রহমানসহ ২৪ জন নিহত ও অন্তত তিন শতাধিক আহতের ঘটনার মধ্য দিয়ে ইতিহাসের ভয়াবহ এক কলঙ্কময় অধ্যায়ের জন্ম দেয়া হয় যার বিচার চলছে।