ঢাকা, বাংলাদেশ   মঙ্গলবার ০৪ অক্টোবর ২০২২, ১৯ আশ্বিন ১৪২৯

গ্রেফতারি পরোয়ানা মাথায় নিয়ে রিজভী পার্টি অফিসে ৫ মাস

প্রকাশিত: ০৬:০২, ২৪ জুন ২০১৮

গ্রেফতারি পরোয়ানা মাথায় নিয়ে রিজভী পার্টি অফিসে ৫ মাস

শংকর কুমার দে ॥ বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী গ্রেফতারি পরোয়ানা মাথায় নিয়ে দীর্ঘ প্রায় ৫ মাস ধরে আছেন রাজধানীর নয়া পল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে। কোন রাজনৈতিক দলের অফিসে কোন রাজনীতিকের এত দীর্ঘদিন অবস্থানের ঘটনা এটা একটা রেকর্ড। তাও আবার ফৌজদারি মামলার পরোয়ানা মাথায় নিয়ে। শুধু তাই নয়, দলীয় অফিসে বসে প্রায় প্রতিদিনই সংবাদ সম্মেলন করে আওয়ামী লীগ ও আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ করে চলেছেন তিনি। গ্রেফতারি পরোয়ানা মাথায় থাকলেও পুলিশ কিন্ত খুঁজে পাচ্ছে না তাকে। কোন রাজনৈতিক দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে কোন রাজনীতিকের প্রায় ৫ মাসের দীর্ঘ অবস্থান করার রেকর্ড আর কারও নেই। রিজভী কি কোন গোপন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অপেক্ষায় আছেন এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খতিয়ে দেখছেন গোয়েন্দারা। বিএনপির যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর নয়া পল্টনের বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এটাই তার প্রথম অবস্থান নয়। এর আগেও অন্তত দুই বার দলীয় কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অবস্থান করেছিলেন তিনি। রাজধানীর নয়া পল্টনের বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়টির তিন তলায় রীতিমত তার বাড়িঘর বানিয়ে অবস্থান করছেন। রীতিমতো ভিআইপিদের রেস্ট হাউস। তার থাকার জন্য খাটিয়া, রান্নাবান্নার ব্যবস্থা, সংবাদ সম্মেলন করার জন্য লোকজন, নেতাকর্মীর সমাগম ঘটাচ্ছেন। কি নেই সেখানে? এবার তিনি নয়া পল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়টিকে নিজের নিরাপদ নিষ্কণ্টক বাসভবন বানিয়েই গোপন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কৌশল অবলম্বন করছেন। তার একটি উদাহরণ গত শুক্রবারে গ্রেফতারি পরোয়ানা মাথায় নিয়ে হঠাৎ দলের ঝটিকা মিছিলে অংশগ্রহণের ঘটনা যা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ভাবিয়ে তুলেছে। সাজাপ্রাপ্ত কারাবন্দী বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে গত ২২ জুন শুক্রবার রাজধানীর কল্যাণপুরে হঠাৎ ঝটিকা মিছিল করেছেন রুহুল কবির রিজভী। সকাল আটটায় মিছিল করেন তিনি। ঢাকা মহানগর পশ্চিম বিএনপির উদ্যোগে ঝটিকা মিছিলের আয়োজন করা হয়। বিএনপি, যুবদল, ছাত্রদলসহ অঙ্গ-সংগঠনের শতাধিক নেতাকর্মীর উপস্থিতিতে ঝটিকা মিছিল হয়। কল্যাণপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে মিছিলটি শ্যামলীর দিকে যায়। এক পর্যায়ে আগে থেকে অপেক্ষমাণ গাড়িতে চড়ে নয়া পল্টনের অফিসে চলে যান রিজভী। সকাল সাড়ে আটটায় তিনি পল্টনের অফিসে চলে যান। এরপর সংবাদ সম্মেলনও করেন তিনি। তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করার পর গত ৩০ জানুয়ারি থেকে প্রায় ৫ মাস ধরে নয়া পল্টনের দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অবস্থান করছেন রিজভী। ঈদের সময়েও দলীয় অফিসেই ছিলেন তিনি। পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অবস্থান তো করছেনই, এমনকি দলীয় চেয়ারপার্সনের মুক্তির দাবিতে কল্যাণপুরে ঝটিকা মিছিল করেছেন। শুধু তাই নয়, ঝটিকা মিছিল শেষে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এসে সংবাদ সম্মেলনও করেছেন। প্রশ্ন ওঠেছে, দীর্ঘ ৫ মাস ধরে গ্রেফতারি পরোয়ানা মাথায় নিয়ে বিএনপির নয়া পল্টনের কেন্দ্রীয় কার্র্যালয়ে অবস্থান, প্রায় প্রতিদিন সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত থেকে বক্তব্যদান-যা ইলেকট্রনিক্স ও প্রিন্ট মিডিয়ায় প্রকাশিত হচ্ছে, এর ওপর আবার সাজাপ্রাপ্ত কারাবন্দী দলীয় চেয়ারম্যানের মুক্তির দাবিতে ঝটিকা মিছিলে অংশগ্রহণ শেষে আবারও সংবাদ সম্মেলন করে বক্তব্য প্রদানের পরও কি পুলিশ খুঁজেই পাচ্ছে না রিজভীকে? এখানে বসেই বিএনপির অগ্নি সন্ত্রাসের মতো কোন গোপন পরিকল্পনা করা হচ্ছে কিনা সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে গোয়েন্দারা। বিএনপির যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী’র পল্টনের বিএনপি অফিসে অবস্থান করার ঘটনা নানা কারণে প্রশ্নবিদ্ধ। তার বিএনপি অফিসে অবস্থান নাটক নতুন এবারই প্রথম নয়। এর আগে ২০১৩ সালে টানা ৫২ দিন-রাত পার্টি অফিসে অবস্থান করেছেন। টানা ৫২ দিন পার্টি অফিসে অবস্থান করার পরও আরেকবার পার্টি অফিসে অবস্থান করে বিতর্কের জন্ম দেন তিনি। সে সময় রিজভী নাটকে নতুন মাত্রা যোগ করেছিলেন বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া। হঠাৎ করে রাতের বেলায় পল্টন অফিসে বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া। তখন ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি সুলতান সালাউদ্দিন আহাম্মেদ টুকু প্রায় অর্ধশত মামলার আসামি হয়ে কর্তব্যরত পুলিশের গাড়ির বহরে তার গাড়ি তুলে দিয়েছিলেন। পুলিশ কর্মকর্তারা আহত হওয়ার ঘটনায় টুকুকে আটক করার পর তাকে জোরপূর্বক ছাড়িয়ে নেয়ার জন্য বেগম খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত বাহিনী সিএসএফ-এর সদস্যরা পুলিশের ওপর চড়াও হয়েছিল। রিজভীর পার্টি অফিসে অবস্থান করার ঘটনা নিয়ে অতীতে ঘটে যাওয়া নানা ধরনের আইনশৃঙ্খলার অবনতির অপ্রীতিকর ঘটনার কারণেই আবারও তার পার্টি অফিসে অবস্থানের ঘটনাটি প্রশ্নবিদ্ধ। বারবার নাটকের জন্ম দিচ্ছেন রুহুল কবির রিজভী। এজন্যই নানা ধরনের আশঙ্কা উদ্বেগের প্রশ্ন। যখনই তিনি নয়া পল্টনের বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অবস্থান করেন তিনি তখনই একটা না একটা অনাকাক্সিক্ষত বা অপ্রীতিকর ঘটনার সৃষ্টি হচ্ছে। গ্রেফতারি পরোয়ানা মাথায় নিয়ে কোন রাজনৈতিক নেতা কোন পার্টি অফিসে অবস্থান করার এতদিনের রেকর্ড কোথাও পাওয়া যায়নি। পার্টি অফিসে অবস্থান করার ব্যাপারে তার দলের পক্ষ থেকে অভিযোগ হচ্ছে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করতে পারে। হয়রানি, নির্যাতনের ভয়ে পার্টি অফিসে অবস্থান করছেন তিনি। পার্টি অফিসে অবস্থান করার পর বারবার নানা ধরনের বক্তব্য দিয়ে আসছিলেন তিনি। পার্টি অফিস থেকে তাকে গ্রেফতার করা হলে পুলিশ বাহিনী সম্পর্কে মানুষজনের মধ্যে নেতিবাচক ভাবমূর্তিও সৃষ্টি হতে পারে এমন ধারণা থেকেই কি তার পার্টি অফিসে অবস্থানের কারণ? দেশ-বিদেশে পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের সম্পর্কে নানা ধরনের মন্তব্য করার সুযোগ পাবে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো সরব হবে, হৈচৈ শুরু করবে। নিজ রাজনৈতিক দল বা সংগঠনের কাছে ত্যাগী নেতা হিসেবে পরিচিতি পাওয়া যাবে। দলীয় চেয়ারপার্সন তার প্রতি সদয় হবেন। বিএনপি যদি কোন দিন ক্ষমতায় আসে তাহলে ভাল পদ পাবেন তিনি। ক্ষমতায় গেলে পদ-পদবী ও সুযোগ সুবিধার স্বাদ গ্রহণ করা যাবে। সবচেয়ে নগদ লাভ হচ্ছে সংবাদ মাধ্যমে ফলাও করে প্রচার পাওয়ার সুযোগ ঘটছে তার। রিজভী নাটকে যেসব নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে তার মধ্যে সংবাদ মাধ্যমে প্রচার পাওয়া ছাড়াও পুলিশ কর্মকর্তারা মনে করছেন, গোপন কোন পরিকল্পনার ইঙ্গিত বহন করতে পারে, যা রহস্যাবৃত। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বিএনপির যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী এখনও পল্টনের বিএনপি অফিসেই অবস্থান করছেন। তাকে গ্রেফতারের ব্যাপারে পুলিশের কোন পরিকল্পনা নেই। তিনি এর আগেও ২০১৩ সালে এই পার্টি অফিসে টানা ৫২ দিন অবস্থান করেছিলেন। তখন বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া রাতের বেলায় পার্টি অফিসে এসে বিএনপি অফিসের ভেতরে অবস্থানরত বিএনপি নেতা রিজভী অসুস্থ বলে তাকে দেখতে গিয়েছিলেন। এখনতো বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া দুর্নীতির মামলায় সাজাপ্রাপ্ত কারাবন্দী। এখন তার গ্রেফতারি পরোয়ানা মাথায় নিয়ে দলীয় চেয়ারপার্সনের মুক্তির দাবিতে ঝটিকা মিছিলে অংশগ্রহণ, পার্টির কেন্দ্রীয় অফিসে অবস্থান, প্রায় প্রতিদিন সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে বক্তব্য প্রদান, ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ায় তার সচিত্র প্রতিবেদনসহ বক্তব্য প্রচারের ঘটনাগুলোর পরও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর রহস্যজনক ভূমিকায় নানা প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে? সরকারের সবুজ সংকেত পাওয়া গেলে কিভাবে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী গ্রেফতারি পরোয়ানা মাথায় নিয়ে বিএনপির দলীয় কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অবস্থান করে একের পর এক রাজনৈতিক কর্মসূচীর নামে নাটকের জন্ম দিচ্ছেন সেই বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে ওই ডিএমপি কর্মকর্তার দাবি।