ঢাকা, বাংলাদেশ   রোববার ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১০ আশ্বিন ১৪২৯

সার্ভিস চার্জের নামে হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে কোটি কোটি টাকা

ময়মনসিংহ মেডিক্যালে নিম্নমানের খাবার, চিকিৎসা সরঞ্জাম

প্রকাশিত: ০৬:০৯, ২৩ মে ২০১৮

ময়মনসিংহ মেডিক্যালে নিম্নমানের খাবার, চিকিৎসা সরঞ্জাম

স্টাফ রিপোর্টার ॥ নিম্নমানের খাদ্য ও চিকিৎসা সরঞ্জাম গ্রহণে রোগীদের বাধ্য করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে। পাশাপাশি সরকারী নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে সার্ভিস চার্জের নামে রোগীদের কাছ থেকে হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে কোটি কোটি টাকা। সরকারী হাসপাতালে নির্ধারিত সেবা মূল্যের বাইরে অতিরিক্ত টাকা আদায় করা নীতি বহির্ভূত এবং অপরাধ বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের কর্মকর্তারা। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, হাসপাতালের বর্তমান পরিচালক যোগদানের পর থেকে সব ধরনের সেবামূল্য এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষার ওপরে অতিরিক্ত সার্ভিস চার্জ আরোপ করা হয়। এতে সরকার নির্ধারিত সেবা মূল্যের ওপরে বিভিন্ন হারে তথাকথিত সার্ভিস চার্জ দিতে বাধ্য হচ্ছেন রোগীরা। এসব সার্ভিস চার্জ আদায় করতে সব বিভাগীয় প্রধানদের অফিস আদেশ দিয়েছেন পরিচালক। ২০১৬-এর ৪ আগস্ট পরিচালক স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে বলা হয়েছে, ‘যে সকল বিভাগে ১০ শতাংশ হারে সার্ভিস চার্জ আদায় করা হচ্ছে তা হাসপাতালের অফিস সহকারী কাম-কম্পিউটার অপারেটর মোঃ আব্দুস সামাদের নিকট রেজিস্টারের মাধ্যমে জমা প্রদান করতে অনুরোধ করা হলো’। একই বছরের ৮ আগস্ট পরিচালকের পক্ষে উপ-পরিচালক স্বাক্ষরিত আরেক অফিস আদেশে বলা হয়েছে ‘মমেক হাসপাতালের রেডিওলজি এন্ড ইমেজিং বিভাগের সরকারী পরীক্ষা-নিরীক্ষা সঙ্গে নি¤œবর্ণিত হারে সার্ভিস চার্জ আদায়ে নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো। সিটি স্কান-২০০ টাকা, এমআরআই-৫০০ টাকা, আল্ট্রাসনোগ্রাম হোল এবডোমেন ৫৫ টাকা এবং আল্ট্রাসনোগ্রাম সিঙ্গেল ৫০ টাকা’। একইভাবে হাসপাতালের ব্লাড ট্রান্সফিউশন বিভাগের সব সেবার ওপর ৮ শতাংশ হরে সার্ভিস চার্জ আদায় করা হচ্ছে। ২০১৫ সালের মে মাস থেকে এই চার্জ আদায় শুরু হয়। যে রেজিস্ট্রার খাতায় আদায়কৃত সার্ভিস চার্জ লিপিবদ্ধ করা হয়, সেখানে দেখা যায় মাসে নি¤েœ ১৩ হাজার টাকা থেকে ৩৬ হাজার টাকা পর্যন্ত কমিশন আদায় করা হয়েছে। প্রতি মাসের কমিশন প্রদানের খাতায় বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডাঃ শিখা রুদ্র, অফিস সহকারী মোঃ শাহাব উদ্দিন এবং পরিচালকের স্বাক্ষর রয়েছে। খাতার এক পৃষ্ঠায় অধ্যাপক ডাঃ শিখা রুদ্রর একটি নোট রয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে ‘এই খাতা শুধু কমিশন বিল হইতে পরিচালক মহোদয়ের বাবদ রেজিস্ট্রার হিসেবে ব্যবহƒত হইবে।’ স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্য অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, দেশের স্বাস্থ্য সেবা প্রতিষ্ঠান ও হাসপাতালসমূহের স্বাস্থ্য সেবার ফিস ১৯ মার্চ ২০০৯ তারিখে নির্ধারিত করা হয়। যা ২ মার্চ ২০১০ সালে সংশোধিত পরিপত্র আকারে প্রকাশ করা হয়। পরিপত্রে প্রাথমিক, মাধ্যমিক এবং টারসিয়ারি স্তরের সকল স্বাস্থ্য সেবা প্রতিষ্ঠানের বিদ্যামান সেবামূল্য নির্ধারিত করা আছে। ওই সেবা মূল্যের বইরে সেবামূল্য বাবদ অন্যকোন অর্থ আদায় করা যাবে না। এ প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডাঃ এনায়েত হোসেন জানান, সরকারী হাসপাতালে সরকার নির্ধারিত সেবামূল্যের বাইরে অতিরিক্ত চার্জ আদায়ের কোন নিয়ম নেই। অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিগত দুই বছর ধরে বিভিন্ন ভাবে মমেক হাসপাতালে আগত রোগীদের কাছ থেকে সার্ভিস চার্জ আদায়ের মাধ্যমে প্রায় ১৫ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়া হয়েছে। এরমধ্যে প্রতি সিটিস্ক্যানে রোগীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত আদায় করা হয় ২০০টাকা। গড়ে প্রতিদিন ৫০ জন রোগীর সিটিস্ক্যান করা হলে সার্ভিস চার্জ আদায় হয় ১০ হাজার টাকা। অর্থাৎ মাসে প্রায় ৩ লাখ টাক। যা গত দুবছর ধরে আদায় করা হচ্ছে। এমআরআই রোগীদের কাছ থেকে ৫০০ টাকা হারে সার্ভিস চার্জ আদায় করা হচ্ছে। দিনে গড়ে ২৫ জন রোগীর কাছ থেকে আদায় হচ্ছে সাড়ে ১২ হাজার টাকা। মাসে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। একইভাবে প্রতিদিন আল্ট্রাসনোগ্রাম করতে আসা ২শ’ রোগীর কাছ থেকে ৫৫ টাকা করে ১১ হাজার টাকা, মাসে তিন লাখ ৩০ হাজার টাকা। একইভাবে প্রতিটি এক্সÑরে করাতে রোগীদের অতিরিক্ত ২০ টাকা, সব ধরনের প্যাথলজিক্যাল টেস্টে ২০ টাকা, ইসিজি করাতে ২০ টাকা, ইকো করাতে ১০০ টাকা, আইসিইউ বেডে দৈনিক অতিরিক্ত ১০০ টাকা হারে সার্ভিস চার্জ দিতে হচ্ছে। এমনকি সার্ভিস চার্জের আওতামুক্ত নয় হাসপাতালে প্রবেশ, দর্শনার্থী, পেইং বেড এবং কেবিন পর্যন্ত। এভাবে হাসপাতালের রোগীদের কাছ থেকে প্রতি মাসে হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে প্রায় অর্ধ কোটি টাকার বেশি। অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, সার্ভিস চার্জ আদায়ের পাশাপাশি হাসপাতালের অন্যান্য কাজেও চলছে দুর্নীতি-অনিয়ম। ৩০ ফিট বাই ৬০ ফিট একটি কনফারেন্স রুম ডেকোরেশন বাবদ খরচ দেখানো হয়েছে ৪৫ লাখ টাকা, ভিডিও কনফারেন্স রুমের ডেকরেশন বাবদ ব্যয় দেখানো হয়েছে ২৫ লাখ টাকা, ১৬ টাকা মূল্য মানের সার্জিক্যাল গ্লোবস কেনা হয়েছে ৩৫ টাকা ৫০ পয়সা দরে। এমনকি একজন রোগীর জন্য দৈনিক ৬০ গ্রাম মাছ বরাদ্দ থাকলেও সেখানে দেয়া হচ্ছে ২০ থেকে ২৫ গ্রাম। ভর্তি রোগীদের অন্যান্য পথ্যোর মানও অত্যন্ত নিম্নমানের। সামগ্রিক বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিকসমূহ) অধ্যাপক ডাঃ কাজী জাহাঙ্গীর হোসেন জনকণ্ঠকে বলেন, সরকার নির্ধারিত ফিসের বাইরে অতিরিক্ত কোন ফিস বা সার্ভিস চার্জ আদায়ের কোন সুযোগ নেই। যদি কেউ এ ধরনের সার্ভিস চার্জ আদায় করে থাকে সেটা সরকারী নিয়ম বহির্ভূত। তাছাড়া উর্ধতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া কেউ অতিরিক্ত কোন চার্জ আদায় করতে পারে না। এক্ষেত্রে যে হাসপাতালের পরিচালক এমনটি করেছেন প্রথমে তার কাছে কারণ জানতে চাওয়া হবে। তার জবাবের প্রেক্ষিতে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এ প্রসঙ্গে জানতে একাধিকবার চেষ্টা করেও ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রি. জে. নাসির উদ্দিন আহমেদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।