ঢাকা, বাংলাদেশ   শনিবার ২০ আগস্ট ২০২২, ৫ ভাদ্র ১৪২৯

পরীক্ষামূলক

বুয়েটের মতামত বাস্তবায়ন নিয়ে মালিক-শ্রমিক মুখোমুখি

চলার অবস্থায় নেই ৭৭ ভাগ অটোরিক্সা

প্রকাশিত: ০৫:৫১, ১৫ মার্চ ২০১৮

চলার অবস্থায় নেই ৭৭ ভাগ অটোরিক্সা

রাজন ভট্টাচার্য ॥ মেয়াদউত্তীর্ণ অটোরিক্সা বন্ধের সুপারিশ করে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (্বুয়েট) দেয়া রিপোর্ট বাস্তবায়ন ঠেকাতে ফের আন্দোলনের হুমকি দিয়েছেন সিএনজি চালিত অটোরিকশার মালিকরা। তাদের দাবি, ভাল অবস্থায় থাকা অটোরিকশার আয়ু ৩ বছর মেয়াদ বাড়াতে হবে। আর বুয়েট বলছে, পরীক্ষায় ৭৭ ভাগ অটোরিকশা চলার অযোগ্য। ১৫ বছর ধরে চলা অটোরিকশার আয়ুষ্কাল আর বাড়ানো উচিত নয়। বুয়েটের এই সুপারিশ বাস্তবায়ন করতে সম্মত সরকার। কিন্তু অটোরিকশা মালিকরা সরকারী নির্দেশও মানতে নারাজ। এই প্রেক্ষাপটে জনস্বার্থের কথা বিবেচনায় নিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অটোরিক্সা বন্ধের দাবি জানিয়েছেন পরিবহন বিশেষজ্ঞসহ যাত্রী কল্যাণে নিয়োজিত সামাজিক সংগঠনের নেতাসহ সাধারণ যাত্রীরা। মালিক সমিতির নেতারা বলছেন, সাড়ে ২৬ হাজার অটোরিকশার মধ্যে ৩৬টি পরীক্ষা করে মেয়াদ না বাড়ানোর মতামত দিয়েছে বুয়েট। সব অটোরিকশার অবস্থা খারাপ না। যেগুলো চলাচলের উপযোগী সেগুলোর মেয়াদ ৩ বছর বাড়াতে হবে। এই দাবি পূরণ না হলে আন্দোলনের বিকল্প নেই বলে হুঁশিয়ারি তাদের। বুয়েটের সুপারিশ বাস্তবায়ন ও নতুন অটোরিক্সা নামানোর দাবিতে আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীতে ঢাকা সিএনজি অটোরিক্সা শ্রমিক সমন্বয় পরিষদ জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে সমাবেশ ও ১০ দফা দাবি বাস্তবায়নে সড়ক পরিবহনমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি পেশ করবে। পরিষদের সদস্য সচিব হানিফ খোকন বলেন, আমরা আগে থেকেই বলে আসছি কোন অবস্থাতেই পুরনো গাড়ির মেয়াদ বাড়ানো ঠিক হবে না। বিশেষজ্ঞরাও বলেছেন, পুরনো গাড়ি চলাচলের অনুমতি দেয়া হলে যাত্রীসহ চালকদের জীবন ঝুঁকিতে পড়বে। আমাদের দাবি হলো পুরনো গাড়ি পরিবর্তে নতুন গাড়ি নামানোর অনুমতি দেয়া হোক। পাশাপাশি রাজধানীতে পরিবহন সংকট সমাধানে অটোরিক্সা বাড়ানোরও দাবি এই শ্রমিক নেতার। গত সপ্তাহে ১৫ বছরের পুরনো অটোরিকশার মেয়াদ না বাড়াতে সুপারিশ করে বুয়েট। এ প্রসঙ্গে বিআরটিএ চেয়ারম্যান মশিয়ার রহমান বলেছেন, মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ অনুযায়ী অটোরিকশা প্রতিস্থাপনের কাজ শুরু হচ্ছে; বরং সময় কমাতে এবং প্রক্রিয়া সহজ করতে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। জানা গেছে, ঝুঁকিপূর্ণ এসব অটোরিকশার মেয়াদ বাড়ানোর ব্যাপারে ধর্মঘটের পর মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত চায় বিআরটিএ। তখন বুয়েটের মতামতকে প্রাধান্য দিতে বলা হয়। এরপর অটোরিকশা মালিকরা বুয়েটে দৌড়ঝাঁপ শুরু করে। তবে কারিগরি দিক বিবেচনা করে বুয়েট মেয়াদ না বাড়ানোর পক্ষেই সুপারিশ করে। এরপর থেকেই ফের আন্দোলনের জন্য উস্কানি দিচ্ছে মালিক নেতারা। এর নেপথ্যে সাধারণ মালিকদের কাছ থেকে নেয়া চাঁদা ফেরত চাওয়ার কারণকে বিবেচনায় রাখছেন সংশ্লিষ্টরা। মূলত আন্দোলনের দোহাই দিয়ে টাকার বিষয়টি চাপা দিতেই পরিবহন নেতাদের নয়া হুমকি। মেয়াদ বাড়ানোর নামে প্রায় আড়াই কোটি টাকা চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে। যদিও এর মধ্য থেকে ২৪ লাখ ৭২ হাজার ৫০০ টাকা টেস্ট ফি হিসেবে বুয়েটকে দিয়েছে তারা। পরিবহন নেতারা এখন বলছেন, সাড়ে ২৬ হাজার অটোরিকশার মধ্যে ৩৬টি পরীক্ষা করে মেয়াদ না বাড়ানোর মতামত দিয়েছে বুয়েট। সব অটোরিকশার অবস্থা খারাপ নয়। যেগুলো চলাচলের উপযোগী সেগুলোর মেয়াদ ৩ বছর বাড়াতে হবে। বুয়েট তাদের প্রতিবেদনে জানায়, তাদের পরীক্ষায় ৭৭ ভাগ অটোরিকশা চলার মতো অবস্থা নেই। ১৫ বছর ধরে চলা অটোরিকশার আয়ুষ্কাল আর বাড়ানো উচিত নয়। বুয়েটের প্রতিবেদনে পুরনো অটোরিকশার বিষয়ে দুটি বিকল্প রাখা হয়েছে। প্রতিটি অটোরিকশা পরীক্ষা করে ভাল অবস্থায় থাকা ইঞ্জিন ও চেসিস অটোরিকশার মেয়াদ সর্বোচ্চ ৩ বছর বাড়ানো যেতে পারে। তবে ২৩ শতাংশের বেশি অটোরিকশা এ সুযোগ পাবে না বলে প্রতিবেদনে মন্তব্য করা হয়। পরীক্ষাকৃত ৭৭ শতাংশ অটোরিকশার চেসিস মানসম্মত অবস্থায় নেই। বুয়েটের যন্ত্র প্রকৌশল বিভাগের পাঁচ অধ্যাপকের সমন্বয়ে গঠিত কমিটি প্রতিবেদনের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, ইঞ্জিন পরিবর্তন সম্ভব নয়। কারণ ১৫ বছরের পুরনো অটোরিকশা ইঞ্জিন ১৫৫ সিসির। কিন্তু বর্তমানে যেসব অটোরিকশা বাজারে রয়েছে, সেগুলোর ইঞ্জিন ২০৫ সিসির। ইঞ্জিন উৎপাদক প্রতিষ্ঠানে চিঠি দিয়ে পুরনো মডেলের ইঞ্জিন উৎপাদনের বিষয়ে জানতে চাইলে জবাব পাওয়া যায়নি। বুয়েটের প্রতিবেদনেও বলা হয়, ৯৫ শতাংশ অটোরিকশাই মিটার মেনে চলে না। পুরনো অটোরিকশা মেয়াদ ৩ বছর বাড়ালে তাতে ২ লাখ ৬০ হাজার টাকা ব্যয় হবে। নতুন অটোরিকশা কিনতে ব্যয় হবে ৪ লাখ ১০ হাজার টাকা। পুরনো অটোরিকশার মেয়াদ বাড়িয়ে আড়াই লাখ টাকা সাশ্রয় সম্ভব কিন্তু তা অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হবে না। বিআরটিএ সূত্র জানায়, ২০০২ সালে ৮ হাজার ৪২৪টি নিবন্ধিত অটোরিকশার আয়ুষ্কাল শেষ হয় ২০১১ সালে। পরবর্তীতে চার দফায় ছয় বছর তিন মাস আয়ুষ্কাল বাড়ানো হয়। এগুলোর মেয়াদ শেষ হবে চলতি মাসে। ২০০৩ সালে নিবন্ধিত ১৮ হাজার ২২৪টি অটোরিকশা মেয়াদ হবে আগামী ৩১ ডিসেম্বর। এগুলোরও মেয়াদ আর বাড়বে না। নৌ-সড়ক ও রেলপথ রক্ষা জাতীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক আশীষ কুমার দে বলেন, আমাদের দাবি থাকবে জনস্বার্থকে প্রাধান্য নিয়ে কার্যকর উদ্যোগ নেবে বিআরটিএ কর্তৃপক্ষ। কয়েক দফা মেয়াদ বাড়ানোর পরও মালিক সমিতির পক্ষ থেকে ফের বলা হচ্ছে মেয়াদ বাড়ানোর কথা। এমন দাবি অযৌক্তিক। অটোরিক্সা মালিক সমিতির একাধিক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, আমাদের সামনে আন্দোলন ছাড়া বিকল্প নেই। সময় না দিয়ে অটোরিক্সা বন্ধ করে দিলে মালিকরা যেমন বিপদে পড়বে তেমনি যাত্রীরাও পরিবহন সংকটের মুখোমুখি হবে। তাই দ্রুত সময়ের মধ্যে আন্দোলনের কর্মসূচী ঘোষণা করার কথা জানান মালিক সমিতির নেতৃবৃন্দ।