ঢাকা, বাংলাদেশ   বৃহস্পতিবার ১১ আগস্ট ২০২২, ২৬ শ্রাবণ ১৪২৯

পরীক্ষামূলক

নুনিয়ারছড়ায় ‘হিপনিয়া মাসিফরমিস’ প্রজাতির শেওলা চাষে যুক্ত অন্তত এক শ’ চাষী

সামুদ্রিক শৈবাল চাষে অভূতপূর্ব সাফল্য, দেশে প্রথম

প্রকাশিত: ০৫:০৫, ৮ অক্টোবর ২০১৭

সামুদ্রিক শৈবাল চাষে অভূতপূর্ব সাফল্য, দেশে প্রথম

এমদাদুল হক তুহিন ॥ বৈজ্ঞানিক তথ্য-উপাত্ত কাজে লাগিয়ে দেশে প্রথমবারের মতো সামুদ্রিক শৈবাল চাষ হচ্ছে। কক্সবাজারের উন্মুক্ত সমুদ্র সৈকতের নুনিয়ারছড়ায় ‘হিপনিয়া মাসিফরমিস’ প্রজাতির সামুদ্রিক শৈবাল চাষে যুক্ত হয়েছে অন্তত ১০০ কৃষক। শৈবালের গবেষণা কার্যক্রম এগিয়ে নিতে উপকরণের সঙ্গে সঙ্গে তাদের দেয়া হচ্ছে তথ্যসহায়তা। একক রশি ও দ্বৈত রশি পদ্ধতি অবলম্বনে ওসব কৃষকের সফলতায় উদ্বুদ্ধ অন্য কৃষকরাও। এগিয়ে এসে তারাও যুক্ত হচ্ছে আধুনিক পদ্ধতিতে শৈবাল চাষে। জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা হলেও বৈজ্ঞানিক বা আধুনিক পদ্ধতি অবলম্বন করে মাঠ পর্যায়ে শৈবালের উৎপাদন এবারই প্রথম। সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, শৈবাল উৎপাদনে মাঠ পর্যায়ে সে সফলতা পাওয়া গেছে তা অভূতপূর্ব। তবে এখন পর্যন্ত প্রাথমিকভাবে তথ্য-উপাত্তই সংগ্রহ করা হচ্ছে। পরিপূর্ণ সাফল্য পেলে কৃষক পর্যায়ে তা আরও সম্প্রসারিত করা হবে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএআরআই) মহাপরিচালক ড. আবুল কালাম আযাদ জনকণ্ঠকে বলেন, শৈবাল নিয়ে দেশে-বিদেশে গবেষণা দীর্ঘদিনের। তবে প্রথমবারের মতো আমরাই গবেষণার সঙ্গে সঙ্গে মাঠ পর্যায়ে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অবলম্বন করে শৈবাল উৎপাদন করতে সক্ষম হয়েছি। তিনি বলেন, শৈবাল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় দেশের উন্মুক্ত সৈকতে এর চাষ সম্প্রসারিত করা সরকারের লক্ষ্য। গবেষণার জন্য প্রথমে সেন্টমার্টিন থেকে ৭ ধরনের শৈবালের জাত সংরক্ষণ করা হয়। তারমধ্যে মাঠ পর্যায়ে হিপনিয়া প্রজাতির শৈবাল চাষ সম্ভব হয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা কৃষকদের নানা ধরনের উপকরণ সরবরাহ করছি। তারা আমাদের তথ্য সরবরাহ করবে এটিই শর্ত। আমাদের সহায়তায় শৈবাল চাষের সফলতা দেখে পার্শ্ববর্তী অনেক কৃষকও হিপনিয়া প্রজাতির শৈবাল চাষে এগিয়ে এসেছে। তারাও একক রশি ও দ্বৈত রশি পদ্ধতি অবলম্বন করছে। তথ্যমতে, কৃষক পর্যায়ে শৈবাল চাষে উৎসাহিত ও শৈবাল সম্পর্কে গবেষণা কার্যক্রম চালিয়ে নিতে সরকার ‘ক্যাপাসিটি বিল্ডিং ফর কনডাক্টিং এ্যাডাপটিভ ট্রায়ালস অন সিউইড ক্যাল্টিভেশন ইন কোস্টাল এরিয়াস’ শীর্ষক একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। প্রকল্পের সার্বিক সমন্বয় করছে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বিএআরসি)। আর শৈবাল চাষ সম্পর্কে মাঠ পর্যায়ে গবেষণার কাজ করছে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএআরআই) সরেজমিন গবেষণা বিভাগ। প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে কক্সবাজারের নুনিয়ারছড়ায়। আর প্রকল্পের আওতায় ১০০ কৃষককে শৈবাল চাষের সব উপকরণ সরবরাহ করা হয়েছে। মাঠ পর্যায়ে একাধিক গবেষণা শেষে প্রকল্পের আওতায় সামুদ্রিক শৈবাল চাষের জন্য কক্সবজারের নুনিয়ারছড়া বেছে নেয়া হয়। কারণ শৈবাল চাষের জন্য যে ধরনের পরিবেশের প্রয়োজনÑ তার প্রায় সব বৈশিষ্ট্যই বিদ্যমান ওখানে। এলাকাটি অপেক্ষাকৃত সমতল তটরেখা। আর অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত পরিষ্কার স্বচ্ছ লবণাক্ত পানি (লবণাক্ততা ৩০-৩২ পিপিটি) থাকে। একই সঙ্গে রয়েছে কম ঢেউ ও স্রোত। শৈবাল চাষের সহনীয় তাপমাত্রা ২৫-৩২ ডিগ্রী সেলসিয়াসও বিদ্যমান রয়েছে এ এলাকায়। চাষের পদ্ধতি সম্পর্কে জানা গেছে, নুনিয়ারছড়ায় শৈবাল চাষে একক রশি ও দ্বৈত রশি পদ্ধতি অবলম্বন করা হচ্ছে। দুই দিকে দুটি বাঁশ দিয়ে মাঝখানে রশিতে প্রায় ১৫ সেমি পর পর শৈবালের অংশ বিশেষ আটকে সমুদ্র উপকূলে ফ্লোট দিয়ে সমুদ্রের পানিতে ভাসিয়ে রেখে জন্মানো হয়। জোয়ার ভাটার লোনা পানিতে প্রতিদিন ৪ সেমি ল¤¦া হয় এই শৈবাল। একক রশি পদ্ধতিতে ৩০ দিনে প্রতি বর্গমিটারে গড়ে ৩ দশমিক ১৭ কেজি এবং দ্বৈত রশি পদ্ধতিতে ২ দশমিক ৮৯ কেজি ফলন পাওয়া যাচ্ছে। গবেষণালব্ধ তথ্য থেকে জানা গেছে, অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত ৬ মাসে ৬ বার সিউইড সংগ্রহ করে একক রশি পদ্ধতিতে প্রতি হেক্টরে প্রায় ১৯ মেট্রিক টন ও দ্বৈত রশি পদ্ধতিতে প্রায় ১৭ দশমিক ৩৪ টন ফলন পাওয়া সম্ভব হয়েছে। ফলন নির্ভর করে সমুদ্রের পানির স্বচ্ছতা ও লবণাক্ততার ওপর। লবণাক্ততা এবং পানির স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ফলনও বারে। এই পরিবেশ পাওয়া যায় অক্টোবর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত। পরবর্তীতে বৃষ্টি আরম্ভ হলে লবণাক্ততা হ্রাস পায়, তখন ফলনও কমে যায়। কৃষক পর্যায়ে কথা বলে জানা গেছে, শৈবাল চাষের নতুন পদ্ধতি সম্পর্কে তারা এখন ধারণা অর্জন করছে। কোন কোন কৃষকের সফলতায় অনুপ্রাণিত হচ্ছে অন্য কৃষকেরাও। নুনিয়ারছড়ায় শৈবাল চাষের সঙ্গে সম্পৃক্ত মুজিবুর রহমান। জনকণ্ঠকে তিনি বলেন, গতবছর এ এলাকায় সফলভাবে শৈবাল চাষ হয়েছে। তা দেখে আমি অনুপ্রাণিত হই। সংশ্লিষ্টদের সহায়তায় এ বছর আমিও শৈবাল চাষ শুরু করি। একই ধরনের কথা জানান কৃষক সোহেল মিয়া। জানালেন, একক রশি ও দ্বৈত রশি পদ্ধতিতে তিনি শৈবাল চাষ করছেন। আর কৃষকরা শৈবাল চাষের এ সফলতায় উচ্ছ্বসিত। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএআরআই) সরেজমিন গবেষণা বিভাগের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আ স ম মাহবুবুর রহমান খান জনকণ্ঠকে বলেন, ২০১৬ সালের জানুয়ারি থেকে আমাদের এ প্রকল্পের কাজ চলছে। টেকনাফের চিংড়ির ঘেরে সামুদ্রিক শৈবাল চাষে আমরা ভাল সফলতা পেয়েছিলাম। তবে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ফলন সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে কক্সবাজারের উন্মুক্ত সমুদ্র সৈকতের নুনিয়ারছড়ায় সফলভাবে ‘হিপনিয়া মাসিফরমিস’ প্রজাতির সামুদ্রিক শৈবাল চাষ করতে সক্ষম হয়েছি। তিনি বলেন, বিভিন্ন পরীক্ষার মাধ্যমে দেখা গেল এ প্রজাতির শৈবাল চাষের জন্য নুনিয়ারছড়ার পরিবেশই সবচেয়ে উপযুক্ত। শৈবাল বিভিন্ন রোগের উপাদান হতে পারে। হতে পারে জৈব সারও। এছাড়া স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত শৈবাল রাখাইন ও পাহাড়ী উপজাতিদের খাবার। দেশে ও দেশের বাইরে সামগ্রিক চাহিদা বিবেচনায় চাষের সঙ্গে সঙ্গে শৈবাল নিয়ে আমরা গবেষণাও চালিয়ে যাচ্ছি।
ডিজিটাল বাংলাদেশ পুরস্কার ২০২২
ডিজিটাল বাংলাদেশ পুরস্কার ২০২২