ঢাকা, বাংলাদেশ   মঙ্গলবার ০৪ অক্টোবর ২০২২, ১৯ আশ্বিন ১৪২৯

ইয়াঙ্গুনে রিপোর্ট প্রকাশ অনুষ্ঠানে কোফি আনানের সুপারিশ

রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দিন ॥ মিয়ানমারের প্রতি আনান কমিশন

প্রকাশিত: ০৫:৪৭, ২৫ আগস্ট ২০১৭

রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দিন ॥ মিয়ানমারের প্রতি আনান কমিশন

কূটনৈতিক রিপোর্টার ॥ রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব প্রদানের জন্য মিয়ানমার সরকারের প্রতি সুপারিশ করেছে জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কোফি আনানের নেতৃত্বে গঠিত আন্তর্জাতিক কমিশন। মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের অবাধ চলাচলের স্বাধীনতাও দিতে বলেছে এই কমিশন। এছাড়া রোহিঙ্গাদের বিশ্বের সর্ববৃহৎ দেশহীন সম্প্রদায় হিসেবে অবহিত করেছে। বৃহস্পতিবার মিয়ানমারের ইয়াঙ্গুনে এক সংবাদ সম্মেলনে জাতিসংঘের মহাসচিব কোফি আনান এই কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। সংবাদ সম্মেলনের আগে মিয়ানমারের প্রেসিডেন্টের কাছে কমিশনের প্রতিবেদন পেশ করা হয়। সূত্র জানায়, আনান কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের ওপর সব ধরনের বিধিনিষেধ প্রত্যাহার করে তাদের নাগরিকত্ব দেয়ার পথ সুগম করতে সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে রোহিঙ্গাদের অবাধ চলাচলের স্বাধীনতাও প্রদান করতে বলেছে। প্রতিবেদনে রোহিঙ্গাদের বিশ্বের সর্ববৃহৎ দেশহীন সম্প্রদায় বলে বর্ণনা করেছে। রোহিঙ্গাদের ওপর আরোপ করা নানা ধরনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা না হলে রোহিঙ্গা এবং সংখ্যাগুরু বৌদ্ধ জনগোষ্ঠী উভয়েই কট্টরপন্থার পথে ধাবিত হতে পারে বলেও সতর্ক করেছে কমিশন। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর নাগরিকত্ব নিশ্চিত করতে মিয়ানমার সরকারকে পরিচয় যাচাইয়ে একটি সমন্বিত ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়া প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দিয়েছে কমিশন। এছাড়া বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়াসহ দুই দেশের সম্পর্কোন্নয়নে একটি যৌথ কমিশন গঠনের সুপারিশ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক আইন মেনে যৌথভাবে পরিচয় যাচাই শেষে মিয়ানমারের লোকজনকে দেশে ফেরার পথ সুগম করবে এই যৌথ কমিশন। রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়া ও তাদের নাগরিকত্ব নিশ্চিতের পাশাপাশি সাংবাদিক ও ত্রাণকর্মীদের অবাধে রাখাইন এলাকায় যাওয়ার জন্যও সুপারিশ করেছে কমিশন। আনান কমিশন সুপারিশে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি যৌথ কমিশন গঠন করা জরুরী। যে কমিশন আন্তর্জাতিক আইন মেনে রোহিঙ্গাদের স্বদেশে ফেরার পাশাপাশি মানব, মাদক ও অবৈধ বাণিজ্য, অবৈধ অভিবাসন বন্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে। আন্তঃসীমান্ত সন্ত্রাস বন্ধে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় ও সহযোগিতা বাড়াবে। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর অবস্থা, রাখাইন এলাকার সহিংসতা, বাস্তুচ্যুতি এবং উন্নয়নে পিছিয়ে থাকার কারণ খুঁজে নিয়ে তা বিশ্লেষণের জন্য মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সিলর আউং সান সুচির সুপারিশে ২০১৬ সালের ৫ সেপ্টেম্বর এই কমিশন গঠিত হয়। নয় সদস্যের কমিটির প্রধান হন জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কোফি আনান। যেটা আনান কমিশন নামে পরিচিত। এই কমিশনের অন্তর্বর্তী একটি প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয়েছে। তবে কমিশনের পক্ষ থেকে ঘোষণা দেয়া হয়েছিল, তারা এ বিষয়ে একটি চূড়ান্ত প্রতিবেদন তৈরি করবে। প্রতিবেদনটি মিয়ানমার সরকার ও জাতিসংঘের কাছে পেশ করা হবে। সে অনুযায়ী এই চূড়ান্ত প্রতিবেদন তৈরি করে আনান কমিশন। মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট থিন কিয়াওয়ের কাছে বৃহস্পতিবার এই প্রতিবেদন আনুষ্ঠানিক পেশ করেন জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব আনান। এরপর তিনি সংবাদ সম্মেলনে এই প্রতিবেদনের বিস্তারিত তুলে ধরেন। বৃহস্পতিবার মিয়ানমারের মিজিমা পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কমিশনের প্রতিবেদনে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের ওপর বিশেষভাবে জোর দেয়া হয়েছে। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর নাগরিকত্ব প্রদানের জন্য মিয়ানমার সরকারকে উদ্যোগ নিতে বলা হয়েছে। রাখাইন রাজ্যের মানবাধিকার সঙ্কটের মুখে রয়েছে বলেও জানিয়েছে কমিশন। রোহিঙ্গা সঙ্কট সমাধানের লক্ষ্যে আনান কমিশনের সদস্যরা বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সফর করেন। মিয়ানমারে রাখাইন এলাকা পরির্দশনের সময় কমিশনের সদস্যরা নানাভাবে বাধার মুখেও পড়েছিলেন। মিয়ানমার সফর শেষে তারা বাংলাদেশও সফর করেন। মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের অবস্থা সরেজমিন দেখতে গত ২৮ জানুয়ারি বাংলাদেশে আসে কমিশনের তিন সদস্য। আনান কমিশনের প্রতিনিধিদলে ছিলেন উইন ম্রা, আই লুইন ও ঘাসান সালামে। প্রতিনিধি দল তিন দিনের বাংলাদেশ সফরের সময় কক্সবাজারের উখিয়ার বালুখালি নতুন রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনের বর্ণনা শোনেন। সে সময় সরকার, আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইএমও), জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন (ইউএনএইচসিআর) ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গেও বৈঠক করেন তারা। আনান কমিশনের সদস্যরা ঢাকা সফরকালে সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, একমাত্র ধর্মীয় কারণে নিপীড়নের ফলেই যে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে চলে এসেছেন, তা নয়। সঙ্গে অন্যান্য বিষয় জড়িত। মানবাধিকার, জাতিগত, মুক্ত চলাচল, নাগরিকত্বের বিষয়গুলোও জড়িত। তারা জানিয়েছিলেন, রাখাইন রাজ্যের প্রতিটি মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। কমিশনের সদস্যরা জানিয়েছিলেন, রোহিঙ্গা সঙ্কটের বিষয়ে আমরা প্রয়োজনে অন্য প্রতিবেশী দেশের সঙ্গেও আলোচনা করব। তারা সকল পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করেছে। রাখাইন রাজ্য থেকে বাংলাদেশে আসা শরণার্থীদের সঙ্গে কথা বলেছে। বাংলাদেশ সরকার, জাতিসংঘ ও অন্যান্য সংস্থা সাহায্য করেছে, এজন্য সন্তোষও প্রকাশ করছিল তারা। গত বছর ৯ অক্টোবর মিয়ানমারের তিনটি সীমান্ত পোস্টে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের হামলায় সেদেশের নয় সীমান্ত পুলিশের মৃত্যুর পর আশপাশের এলাকায় ব্যাপক ধরপাকড় শুরু হয়। রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গা অধ্যুষিত জেলাগুলোয় শুরু হয় সেনা অভিযান। সেনা অভিযানে রাখাইন প্রদেশে ১২শ’র বেশি ঘর জ্বালিয়ে দেয়া হয়। দমন অভিযানের মুখে পালাতে থাকা রোহিঙ্গাদের অনেকে নাফ নদী পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে ঢোকার চেষ্টা করে। অক্টোবর থেকে বাংলাদেশে নতুন করে প্রায় ৭০ হাজার রোহিঙ্গা প্রবেশ করে। তবে চলতি মাসে আরও ব্যাপকহারে রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে বলে জানা গেছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম খবর প্রকাশ করেছে চলতি মাসে প্রায় সাড়ে তিন হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে মিয়ানমারের প্রায় ৫ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্র্থী অবস্থান করছে। তবে কেউ কেউ মনে করেন এই সংখ্যা অনেক বেশি। কক্সবাজার সীমান্তে কুতুপালং ও নয়াপাড়া শরণার্থী ক্যাম্পে প্রায় ৩০ হাজার তালিকাভুক্ত শরণার্থী রয়েছে। এর আগে ১৯৯১ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত দুই লাখ ৩০ হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থীকে ফিরিয়ে নিয়েছিল মিয়ানমার। তারপর থেকে এ প্রক্রিয়া পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। জাতিগত ও রাজনৈতিক সংঘাতের কারণে প্রায় দুই দশক আগে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ শুরু করে।