ঢাকা, বাংলাদেশ   শনিবার ২০ আগস্ট ২০২২, ৫ ভাদ্র ১৪২৯

পরীক্ষামূলক

সাঁড়াশি অভিযানে ছোট হয়ে এসেছে জঙ্গী সংগঠন হুজি

প্রকাশিত: ০৭:৪০, ২২ আগস্ট ২০১৭

সাঁড়াশি অভিযানে ছোট হয়ে এসেছে জঙ্গী সংগঠন হুজি

গাফফার খান চৌধুরী ॥ সাঁড়াশি অভিযানের মুখে ছোট হয়ে এসেছে নিষিদ্ধ জঙ্গী সংগঠন হুজি (হরকত-উল-জিহাদ)। মাঝে মধ্যেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে দু’একজন অনুসারী গ্রেফতার হচ্ছে। তবে হুজির আর বড় ধরনের কোন নাশকতা চালানোর ক্ষমতা নেই। অথচ শুধু শেখ হাসিনা নয়, আওয়ামী লীগের শীর্ষ সব নেতাই ছিলেন সংগঠনটির হত্যার টার্গেটে। একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলায় শেখ হাসিনাসহ সঙ্গে থাকা শীর্ষ নেতারা মারা গেলে টার্গেটকৃত অন্য নেতাদের পর্যায়ক্রমে হত্যার টার্গেট ছিল হুজির। হত্যার টার্গেটে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা থাকলেও, জামায়াতের কোন নেতাই হুজির হত্যার টার্গেটে ছিল না। তবে জামায়াত বিদ্বেষী কয়েক বিএনপি নেতাও হুজির হত্যার টার্গেটে ছিল। আফগান যুদ্ধ থেকে শুরু করে হুজিকে বিএনপি-জামায়াত নানাভাবে মদদ ও সহযোগিতা দিয়ে আসছিল। একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার তদন্তকারী সংস্থা পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডি সূত্রে এমন তথ্য মিলেছে। সিআইডি সূত্রে জানা গেছে, দেশে জঙ্গীবাদের গোড়াপত্তন হয় আফগান যুদ্ধের সূত্রধরে। আফগান যুদ্ধের সময় মুফতি হান্নান পাকিস্তানে দাওরায়ে হাদিস পড়ছিলেন। তিনি আফগানিস্তানের খোস্ত শহরে একটি জঙ্গী প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে ভারি অস্ত্র চালনার প্রশিক্ষণ নেয়ার পর যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। ১৯৮৯ সালে আফগান যুদ্ধ করে যশোরের বাসিন্দা আব্দুর রহমান ফারুকী দেশে ফেরেন। তিনি হরকত-উল -জিহাদ ইসলামী নামের একটি দল গঠন করেন। পরে সেটি হরকত-উল-জিহাদ অব বাংলাদেশ সংক্ষেপে হুজিবি হয়। পরে হুজিবিই হুজি হয়। আব্দুর রহমান ফারুকী হুজিবির আমির নিযুক্ত হন। আমির থাকা অবস্থায়ই তিনি ১৯৮৯ সালে আবার আফগানিস্তানে চলে যান। ১৯৯০ সালে আফগানিস্তানের নজীবুল্লাহ সরকারের সঙ্গে আফগান মুজাহিদদের এক ভয়াবহ যুদ্ধে তার মৃত্যু হয়। সূত্র আরও জানায়, আফগান যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও মুফতি হান্নান আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের বিভিন্ন জঙ্গী প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে গ্রেনেডসহ শক্তিশালী বিস্ফোরক তৈরি ও পরিচালনা, ভারি আগ্নেয়াস্ত্র চালনা, তৈরি ও মজুদসহ সমরাস্ত্র চালনায় প্রশিক্ষিত হন। সেখানে তার সঙ্গে আন্তর্জাতিক জঙ্গী সংগঠন আল-কায়েদা, লস্কর-ই-তৈয়বা, পাকিস্তানভিত্তিক আত্মঘাতী জঙ্গী সংগঠন জইশ-ই-মোস্তফা, জইশ-ই-মোহাম্মদসহ বহু জঙ্গী সংগঠনের নেতার সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ১৯৯৩ সালে তিনি দেশে ফেরেন। যোগ দেন হুজিবিতে। তারপর একের পর এক হামলা চালিয়ে আলোচনায় আসে হুজি। যশোর উদীচী সমাবেশে বোমা হামলা, গোপালগঞ্জে শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশে ৭৬ কেজি ওজনের বোমা পূঁতে রাখা এবং সর্বশেষ ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা করে আলোচনায় আসে হুজি। মুফতি হান্নানকে জিজ্ঞাসাবাদকারী একাধিক সিআইডি কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জনকণ্ঠকে জানান, মুফতি হান্নান দেশে ফেরার পর প্রথমে আহলে হাদিস আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত শীর্ষ ছয় জঙ্গীর সঙ্গে রাজশাহীতে দেখা-সাক্ষাত করতেন। তারা সম্মিলিতভাবে দেশে ইসলামী শাসন ব্যবস্থা কায়েমের লক্ষ্য নিয়ে পরিকল্পনা করতে থাকেন। সে মোতাবেক মতপার্থক্যের কারণে শীর্ষ ছয় জঙ্গী উত্তরবঙ্গে জেএমজেবি (জাগ্রত মুসলিম অব বাংলাদেশ) নামে তৎপরতা শুরু করে। উত্তরবঙ্গের দায়িত্ব পালন করছিলেন সিদ্দিকুল ইসলাম বাংলা ভাই। আর জামালপুর, টাঙ্গাইলসহ আশপাশের জেলাগুলোতে শায়খ আব্দুর রহমান কাজ করছিলেন। সূত্রগুলো বলছে, আফগান যুদ্ধে অংশ নেয়া ছাত্র শিবিরের প্রায় এগারো শ’ সদস্যের মধ্যে অধিকাংশই মুফতি হান্নানের সঙ্গে হুজিতে ছিলেন। ছাত্র শিবিরের আফগান ফেরত যোদ্ধারা মুফতি হান্নানের সঙ্গে থাকায় বিএনপি-জামায়াত-শিবিরের সঙ্গে মুফতি হান্নানের একটি বিশেষ সখ্য গড়ে ওঠে। জামায়াত-শিবিরের কাছ থেকে নানাভাবে সহায়তাও পেতেন মুফতি হান্নান। ছাত্র শিবিরের আফগান ফেরত যোদ্ধারা মুফতি হান্নানকে নানাভাবে শেখ হাসিনাকে হত্যা করা ছাড়া, দেশে ইসলামী শাসন ব্যবস্থা কায়েম করা সম্ভব নয় বলে বোঝাতে থাকেন। আর মুফতি হান্নানও নানা দিক বিচার-বিশ্লেষণ করে শেখ হাসিনা বেঁচে থাকলে দেশে ইসলামী শাসন ব্যবস্থা কায়েম করা সম্ভব নয় বলে বিশ্বাস করতেন। দেশে ইসলামী ব্যবস্থা কায়েমের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় শত্রু শেখ হাসিনা বলে মুফতি হান্নানের দৃঢ় বিশ্বাস। এজন্য মুফতি হান্নান শেখ হাসিনাকে হত্যা করতে মরিয়া হয়ে ওঠে। এমন ধারণার এক পর্যায়ে শুধু শেখ হাসিনা নয়, আওয়ামী লীগ শীর্ষ নেতারাও ইসলামের শত্রু বলে মনে করতেন মুফতি হান্নান। এজন্য তিনি পুরো আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের হত্যার টার্গেট করেন। সেই টার্গেট মোতাবেক হামলার দিন হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন একুশে আগস্ট; যাতে শেখ হাসিনাসহ দলের অধিকাংশ শীর্ষ নেতা নিহত হন। যারা বেঁচে যাবেন বা ঘটনাস্থলে থাকবেন না, তাদের পরবর্তীতে সুযোগ-সুবিধামতো পর্যায়ক্রমে হত্যা করার টার্গেট ছিল হুজির। সূত্রগুলো বলছে, জামায়াত-শিবিরের সঙ্গে সখ্য থাকার কারণে জামায়াতের কোন নেতাই হুজির হত্যার টার্গেটে ছিলেন না। এর প্রধান কারণ ছিল ছাত্র শিবিরের আফগান ফেরত অনেক যোদ্ধা মুফতি হান্নানের সঙ্গে হুজিতে ছিলেন। তাদের মাধ্যমে বিএনপি-জামায়াত-শিবিরের সঙ্গে হুজির সম্পর্ক ভাল ছিল। নানাভাবে তাদের কাছ থেকে সহায়তা পেতেন। তবে জামায়াত-শিবিরের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক থাকার কারণে এবং জামায়াত-শিবিরের পরামর্শ মোতাবেক হুজি বেশ কয়েক বিএনপি নেতাকে হত্যার টার্গেট করেছিল। টার্গেটকৃত নেতার সবাই জামায়াত বিরোধী। এ ব্যাপারে একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সিআইডির সাবেক জ্যেষ্ঠ সহকারী পুলিশ সুপার মুক্তিযোদ্ধা ফজলুল কবীর জনকণ্ঠকে বলেন, শুধু শেখ হাসিনা নয়, আওয়ামী লীগের সব শীর্ষ নেতাই হুজির হত্যার টার্গেটে ছিলেন। এজন্য হামলার টার্গেট হিসেবে একুশে আগস্টকে বেছে নিয়েছিল হুজি। যাতে ওই হামলায় শেখ হাসিনাসহ সঙ্গে থাকা আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের মৃত্যু হয়। যেসব নেতা বেঁচে যেতেন বা যারা সমাবেশের বাইরে থাকতেন, পরবর্তীতে তাদের পর্যায়ক্রমে হত্যার টার্গেট ছিল হুজির। এক কথায় পুরোপুরি আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করার টার্গেট ছিল জঙ্গী সংগঠনটির। সিআইডির এই সাবেক কর্মকর্তা বলছেন, তবে জামায়াত বা বিএনপির নেতারা হুজির হত্যার টার্গেটে ছিল বলে আমার জানা নেই। পারস্পরিক যোগাযোগ বা সহযোগিতাসহ নানা কারণেই জামায়াত বা বিএনপির কোন নেতাই হুজির হত্যার টার্গেটে ছিল না। তবে বিষয়টি একেবারেই স্পষ্ট নয়। পুলিশের কাউন্টার টেররিজম এ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের প্রধান ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার মনিরুল ইসলাম, র‌্যাবের লিগ্যাল এ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান ও পুলিশ সদর দফতরের ইন্টেলিজেন্স এ্যান্ড স্পেশাল এ্যাফেয়ার্স শাখার সহকারী পুলিশ মহাপরিদর্শক মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান জনকণ্ঠকে জানান, সাঁড়াশি অভিযানের মুখে হুজি এখন বিলুপ্তির পথে। তাদের আর বড় ধরনের কোন নাশকতা চালানোর ক্ষমতা নেই। তাদের সে রকম কোন জনবল নেই। তবে মাঝেমধ্যেই চলমান সাঁড়াশি অভিযানে দু’একজন গ্রেফতার হয়। গ্রেফতাররা হুজির আদর্শিক সদস্য। তারা বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত নয়। হুজিতে এখন আর প্রশিক্ষিত সদস্য নেই বললেই চলে।