শনিবার ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯, ২১ মে ২০২২ ঢাকা, বাংলাদেশ
প্রচ্ছদ
অনলাইন
আজকের পত্রিকা

মানুষকে ভালবাসাই তার ধর্ম

তারুণ্যের বেলা থেকেই তিনি মানবদরদী। দীক্ষা পেয়েছেন পরিবার থেকেই। বাবা ছিলেন আয়ুর্বেদশাস্ত্রের কবিরাজ। পূর্বসূরির পথ ধরে তিনি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সমাজ কল্যানের পথে পা বাড়ান। যখন বয়স ২০, তখনই মানবতার সঙ্গে অসাম্প্রদায়িকতার চেতনার বীজ বপন হয়। তিনি মনে করেন ধর্ম যাই হোক তিনি বিশ্বাস করেন মানব ধর্মে। কে কোন ধর্মের তা বড় কথা নয়, মানুষকে ভালবাসাই বড় ধর্ম। ১৯৮৭ সালে ট্রেনে ভারতের চেন্নাই যাওয়ার সময় দেখেন কম্পার্টমেন্টে হাড্ডিসার এক নারী তার দুই সন্তানকে নিয়ে উদাস দৃষ্টিতে চেয়ে রয়েছেন। জানতে পারেন তারা ক্ষুধার্থ। নিজেদের জন্য আনা খাবার তিনি তাদের দিয়ে দেন। দেখতে পান দুই সন্তান ও তাদের মায়ের আনন্দাশ্রু। পাশের সহযাত্রী তাঁর এই কাজ দেখে মুগ্ধ হন। বলেন, এমন মানুষ তিনি প্রথম দেখলেন। এই তাঁর প্রথম স্বীকৃতি।

তাঁর নাম তরুণ কুমার চক্রবর্তী। বয়স ৫০ পেরিয়েছে। বাড়ি বগুড়া নগরীর দত্তবাড়ি পানির ট্যাঙ্কির কাছে। এলাকার মানুষের কাছে মানবদরদী। হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-ক্রিশ্চিয়ান নির্বিশেষে বিপদে তাঁর কাছে গেলে তিনি সহযোগিতার হাত বাড়াতে কার্পণ্য করেন না। সাধ্যের মধ্যে, কখনও সাধ্যের বাইরেও তিনি মানুষের জন্য করেন। বগুড়া সরকারী আযিযুল হক কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিকে উত্তীর্ণ হওয়ার পর ঢাকায় গিয়ে আয়ুর্বেদশাস্ত্রের ওপর ডিপ্লোমা কোর্স করেন। এলাকার জটিল রোগীদের চিকিৎসা দেন। গরিবদের কাছ থেকে কোন অর্থ নেন না। একবার এক দরিদ্র রোগী শরীরে দগদগে ঘা নিয়ে তাঁর কাছে চিকিৎসা নিতে এলে বিনা পয়সায় তাকে সারিয়ে তোলেন। বছরচারেক আগে ঝড়ে ২শ’ পরিবারের কাঁচা ঘর বিধ্বস্ত হলে তিনি তা গড়ে দেন। এলাকায় অর্থাভাবে কোন শিশু-কিশোরের লেখাপড়া বন্ধ হলে অনায়াসে তিনি তাঁর দায়িত্ব নেন। লেখাপড়া বন্ধ হয়ে মজুর-শ্রমিক হয়েছে, এমনটা জানলে তিনি তাঁদের ফিরিয়ে আনেন শিক্ষার পথে। গরিব শিশু-কিশোরদের বই-পুস্তক, খাতা-কলম, জ্যামিতি বক্স ও পেন্সিল বক্স কিনে দেন। বিশেষ করে এলাকার কোন মেয়েশিশু যেন লেখাপড়া থেকে বঞ্চিত না হয় তার দিকে কড়া নজর রাখেন। এ ধরণের খবর পেলে নিজে উদ্যোগী হয়ে এগিয়ে যান। বাল্যবিয়ের ঘোরবিরোধী। বালিকা বিয়ের পিঁড়িতে বসতে যাচ্ছে, এমন খবর পাওয়া মাত্র দ্রুত গিয়ে তা বন্ধের ব্যবস্থা করেন।

তিনি যে কতটা অসাম্প্রদায়িক তার প্রমাণ মেলে মুসলমানদের ঈদ-উল-ফিতর ও ঈদ-উল-আযহার দিনে। সেদিন তিনি নিজে উপস্থিত থেকে কুশল বিনিময় করেন। গরিবদের ঘরে ঈদের জন্য খাবার ও পোশাক দেন। শিববাটি শাহী মসজিদে প্রবেশের পথ ভারি বর্ষণে ডুবে মুসল্লিদের নামাজের অসুবিধা হয়। তিনি এই রাস্তাটুকু পাকা করে দিয়েছেন। কালিতলা মদিনা মসজিদের সামনে জানাজা নামাজের সময় হুজুরের কথা শোনার জন্য মাইক্রোফোনের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। করোনেশন স্কুল মাঠে জানাজার জন্য জায়গা পাকা করে দিয়েছেন। হাসনাজাহান গার্লস স্কুলে শহীদ মিনার ছিল না। তিনি শহীদ মিনার গড়ে দিয়েছেন। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের শারদীয় উৎসবে তাঁর এলাকায় প্রতিমা বিসর্জনে সমস্যায় পড়তে হয়। পৌরসভার সঙ্গে দেন-দরবার করে তিনি ঘাট নির্মাণের অনুমোদন করে এনেছেন। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের দত্তবাড়ি সেবাদাস শ্রীশ্রী লোকনাথ বাবার পিতলের প্রতিমা বানিয়ে দিয়েছেন। যার ওজন ৮৭ কেজি। তিনি দাবি করেন এ ধরনের প্রতিমা দেশে এই প্রথম।

তাঁর এসব জনকল্যাণ কাজে এলাকার লোকজন গত পৌরসভা নির্বাচনে ৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর পদে দাঁড় করিয়ে বিপুল ভোটে জিতিয়ে দিয়েছে। নির্বাচনের সময় তিনি যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, দশ মাসের মধ্যে তা পূরণ করেছেন। ওয়ার্ডবাসীর জন্য জরুরী চিকিৎসার সরঞ্জাম, অক্সিজেন সিলিন্ডারসহ এ্যাম্বুলেন্স উপহার দেন। কাটনারপাড়া ঈদগাহ মাঠ সংস্কারে হাত দিয়েছেন। এলাকার দুস্থ নারীদের কর্মজীবী করে তুলতে সেলাই মেশিন দিয়ে সহযোগিতা করেন। প্রতিবছর তার ওয়ার্ডের পিইসি, জেএসসি, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিকে জিপিএ-৫ প্রাপ্ত মেধাবী শিক্ষার্থীদের শিক্ষা উপকরণ দিয়ে পুরস্কৃত করে উচ্চতর শিক্ষায় উৎসাহ দেন। এলাকার মাদক-সন্ত্রাসী-ছিনতাইকারীদের তিনি কঠোর হাতে দমন করেছেন। গভীর রাত অবধি তিনি এলাকায় টহল দেন। গত বিএনপি-জামায়াতের কথিত আন্দোলনের সময় বগুড়ার বনানীতে এজতেমা থেকে ফেরা দুটি গাড়ি দুর্ঘটনায় পড়লে চার যাত্রী নিহত হয়। তিনি নিহতদের ঠাকুরগাঁওয়ে বাড়িতে পাঠানোর সব ব্যবস্থা করে ৭০ আরোহীর খাবারের ব্যবস্থা করেন। কোরবানির বর্জ্য দ্রুত পরিষ্কারে তিনি নিজে এলাকার তরুণদের নিয়ে মাঠে নামেন। বিকেলের মধ্যে বর্জ্য ও ড্রেন পরিষ্কার করে দেন। তিনি বললেন, কিছু দিনের মধ্যে তার ওয়ার্ডের প্রতিটি পয়েন্টে ক্লোজ সার্কিট (সিসি) ক্যামেরা বসাবেন। স্ত্রী, এক মেয়ে ও এক ছেলে নিয়ে তাঁর সংসার। বললেন ওয়ার্ড কাউন্সিলর হওয়ার পর পরিবারে তিনি সময় দিতে পারেন না। এ জন্য পরিবারের লোকজন মাঝেমধ্যেই বলে ‘আর নির্বাচনে দাঁড়ানোর দরকার নেই।’ আর ওয়ার্ডের লোকজন বলে ভাল কাজ করলে তাঁকে আবার বিজয়ী করবে।

-সমুদ্র হক, বগুড়া থেকে

শীর্ষ সংবাদ: