ঢাকা, বাংলাদেশ   শনিবার ২০ আগস্ট ২০২২, ৫ ভাদ্র ১৪২৯

পরীক্ষামূলক

পূর্বাঞ্চলে থামেনি জলদস্যুদের তা-ব, সক্রিয় পাঁচ গ্রুপ

বঙ্গোপসাগরের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চল জেলেদের জন্য নিরাপদ

প্রকাশিত: ০৪:০২, ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৭

বঙ্গোপসাগরের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চল জেলেদের জন্য নিরাপদ

মেজবাহউদ্দিন মাননু, কলাপাড়া, পটুয়াখালী থেকে ॥ ইলিশসহ বিভিন্ন ধরনের মাছ আহরণের বিশাল ক্ষেত্র বঙ্গোপসাগরের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে জলদস্যু আতঙ্ক কমে এসেছে। বিশাল এই জলসীমা নিরাপদ মনে করছেন জেলেরা। সাগরবক্ষে অবস্থানরত জেলেরা এখন অনেকটা নির্বিঘেœ মাছ শিকার করছে। পরিবার-পরিজনের স্বজন, কর্মক্ষম মানুষকে হারানোর শঙ্কা ধীরে ধীরে কেটে যাচ্ছে। শুধু জেলে নয় ট্রলার, আড়ত মালিকসহ এ পেশা সংশ্লিষ্ট সবাই অনেকটা স্বস্তিবোধ করছেন। র‌্যাবসহ যৌথবাহিনীর অভিযানে ২০১৬ সালে ‘পাঁচ বাহিনীর’ ৮০ জলদস্যুকে আত্মসমর্পণে সমর্থ হয়েছে। এদের কাছ থেকে অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে ১৭০টি। গুলি উদ্ধার হয়েছে ৮ হাজার ৩৮ রাউন্ড। সর্বশেষ ৭ ফেব্রুয়ারি র‌্যাবের সঙ্গে সুন্দরবন এলাকায় বন্দুকযুদ্ধে মারা যায় কোপা শামসু ‘বাহিনীর’ প্রধান শামসু। উদ্ধার হয় চারটি বন্দুক, ৩৬ রাউন্ড গুলি ও দু’টি রামদা। ২৯ জানুয়ারি বরিশালে জাহাঙ্গীর বাহিনীর ২০ সদস্য সদলবলে আত্মসমর্পণ করে। উদ্ধার হয় ৩১টি আগ্নেয়াস্ত্র, এক হাজার ৫০৭ রাউন্ড গুলি। এর আগে ৬ জানুয়ারি কুয়াকাটায় আত্মসমর্পণ করে বাকি বিল্লাহ ওরফে নোয়া বাহিনীর প্রধান নোয়াসহ ১২ জলদস্যু। তাদের কাছ থেকে ২৫টি আগ্নেয়াস্ত্র এবং ১১০৫ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এমপির কাছে অস্ত্র জমা আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার আবেদন করেছে। এরা সবাই বর্তমানে জেল হাজতে রয়েছে। র‌্যাব-৮ সূত্র আরও জানায়, ২০১৬ সালের ৩১ মে কুখ্যাত জলদস্যু মাস্টার বাহিনীর ১০ জন, একই বছরের ১৪ জুলাই মজনু ও ইলিয়াস বাহিনীর ১১ জন। ৭ সেপ্টেম্বর আলম ও শান্ত বাহিনীর ১৪ জন। ১৯ অক্টোবর সাগর বাহিনীর ১৩ জন। ২৭ নবেম্বর খোকা বাবু বাহিনীর ১২ জলদস্যুকে আত্মসমর্পণ করে। মাঝি সমিতির সভাপতি মোঃ নুরু মিয়া জানান, র‌্যাবের নিয়ন্ত্রণের কারণে সুন্দরবনসহ সাগরের গোটা পশ্চিম-দক্ষিণাঞ্চল তাদের কাছে নিরাপদ মনে হচ্ছে। কেটে যাচ্ছে জলদস্যু আতঙ্ক। তবে আত্মসমর্পণ করা জলদস্যুরা স্বাভাবিক জীবনে ফেরার কথা বলে ফের জলদস্যুতার তা-বে যেতে না পারে এ জন্য কঠোর মনিটরিং প্রয়োজন রয়েছে বলে জেলেসহ এ পেশার সকল মানুষ। র‌্যাবের দেয়া তথ্যমতে, সফল অভিযানে এর আগেও ৬৭৪টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ১৯ হাজার ৫৮ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়। গ্রেফতার করা হয় ২৩৮ জন জলদস্যুকে। অভিযানে নিহত হয় ৯০ জন জলদস্যু। র‌্যাব মহাপরিচালক ও সুন্দরবনসহ উপকূলীয় এলাকায় বনদস্যু, জলদস্যুদের দমনের লক্ষ্যে র‌্যাব, পুলিশ, কোস্টগার্ড, বিজিবি ও বনবিভাগের সমন্বয়ে গঠিত টাস্কফোর্সের সভাপতি বেনজীর আহমেদ কুয়াকাটায় তার বক্তব্যে বলেছেন, এখনও সাগরে জলদস্যুদের ছয়টি বাহিনী সক্রিয় রয়েছে। যার মধ্যে পূর্বাঞ্চলে দু’টি এবং পশ্চিমাঞ্চলে চারটি গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে। আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোঃ আসাদুজ্জামান খান কামাল এমপি বলেন, এখনও যারা আত্মসমর্পণ করেনি তারা যদি জলদস্যুতা করে তাইলে তাদের পরিণতি হবে ভয়াবহ। তবে কুয়াকাটা থেকে সাগরের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল এখনও জেলেদের কাছে নিরাপদ নয়। রয়েছে জলদস্যুর নিয়ন্ত্রণে। সর্বশেষ কুয়াকাটা থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার পুবে ঢালচর সংলগ্ন পূর্ব-দক্ষিণ বঙ্গোপসাগরে এফবি বাইচু (১) ও এফবি বাইচু (২) নামের দু’টি মাছ ধরার ট্রলারে জলদস্যুরা হানা দেয়। ট্রলার মালিক আলীপুরের বেল্লাল হোসেন জানান, ২০-২২ জনের একটি জলদস্যু সশস্ত্র হানা দেয় ট্রলার দু’টিতে। তারা জেলেদের জিম্মি করে মোবাইল সেট, মাছ, জাল, জ¦ালানি, সোলার প্যানেলসহ ব্যাটারি নিয়ে গেছে। ভেঙ্গে অকেজো করে দেয় ট্রলার দু’টির ইঞ্জিন। এ সময় ট্রলারে অবস্থানরত শাহাবুদ্দিন নামের এক রোহিঙ্গা জেলেকে জলদস্যুরা মুক্তিপণের দাবিতে অপহরণ করে নেয়। ২ ফেব্রুয়ারি, বৃহস্পতিবার শেষ বিকেলে জলদস্যুরা তার এমন সর্বনাশ করে। বেল্লাল তার ট্রলারের মাঝি দেলোয়ার হোসেনের বরাত দিয়ে জানান, জলদস্যুরা সবাই বাঁশখালী এলাকার। তাদের কাছে তিনটি বন্দুক এবং কয়েকটি রামদা ও ছ্যানা ছিল। কুয়াকাটা ও আলীপুর আড়ত মালিক সমিতির সভাপতি আনছার উদ্দিন মোল্লা জানান, সাগরের সোনার চর থেকে পূর্ব দিকে কুতুবদিয়া, মহেশখালী, ভোলা, কক্সবাজার, সন্দ্বীপ ও হাতিয়া এলাকা এখনও জেলেদের কাছে অনিরাপদ। র‌্যাবসহ যৌথবাহিনীর সফল অভিযানে কুয়াকাটা থেকে সুন্দরবনসহ তৎসংলগ্ন সাগর এখন জেলেসহ মৎস্যজীবীদের কাছে নিরাপদ। পাথরঘাটা মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির সভাপতি গোলাম মোস্তফা চৌধুরী জানান, তার সমিতিভুক্ত অন্তত ১ হাজার ১ শ’ ট্রলার মালিক রয়েছে। তিনি জানান, গত পাঁচ বছরে বরগুনা, পিরোজপুর ও বাগেরহাট জেলায় জলদস্যুদের তা-বে সহস্রাধিক জেলে হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। যার মধ্যে প্রাণ দিতে হয়েছে অন্তত এক শ’ জেলের। তবে র‌্যাব-৮ এর সাহসী যুগোপযোগী পদক্ষেপে এখন দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল সাগর জেলেদের জন্য বহুলাংশে নিরাপদ রয়েছে। তিনি এও জানান, যেসব জলদস্যু আত্মসমর্পণ করেছে তাদের নজরদারিতে রাখা প্রয়োজন। র‌্যাব-৮ এর উপ-অধিনায়ক মেজর আদনান কবির জানান, সাগরের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকা জলদস্যুদের নিয়ন্ত্রণমুক্ত করা হয়েছে। যারা এখনও রয়েছে তারাও র‌্যাবের নজরদারিতে রয়েছে। তিনি এও জানান, র‌্যাবের যে অভিযানে নোয়া বাহিনীর ১২ জলদস্যু আত্মসমর্পণ করেছে তাদের কাছ থেকে অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে ২৫টি। মূলত, মৌসুমি সদস্য এদের সঙ্গে সাগরে মাঝে-মধ্যে ডাকাতি করতে যায়।