ঢাকা, বাংলাদেশ   শুক্রবার ১৯ আগস্ট ২০২২, ৪ ভাদ্র ১৪২৯

পরীক্ষামূলক

সুপ্রীমকোর্ট লিগ্যাল এইড কমিটির চেয়ারম্যান বিচারপতি ইনায়েতুর রহিম দায়িত্ব গ্রহণের পর বেশ কিছু পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে ;###;আইনজীবীরা আশা করছেন, এ ৪৬২ জন চার দেয়াল থেকে আইনগতভাবেই বের হয়ে আসতে পারবে

তালিকা দীর্ঘ হচ্ছে

প্রকাশিত: ০৬:১১, ১২ ডিসেম্বর ২০১৬

তালিকা দীর্ঘ হচ্ছে

বিকাশ দত্ত ॥ দেশের কারাগারে বিনা বিচারে আটক বন্দীদের তালিকা ক্রমান্বয়েই দীর্ঘ হচ্ছে। চান মিয়া, মকবুল, সেন্টু, বিল্লাল, সুমি, শাহনাজ, রাজিয়া ও রানীই নয়, এদের মতো আরও অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে কারাগারে বিনা বিচারে আটক রয়েছেন। ৫ থেকে ১০ বছরের বেশি সময় ধরে দেশের বিভিন্ন কারাগারে বিনা বিচারে আটক এমন ৪৬২ জন বন্দীর তালিকা হাতে পেয়েছে সুপ্রীমকোর্টের লিগ্যাল এইড কমিটি। সুপ্রীমকোর্ট লিগ্যাল এইড কমিট বিনা বিচারে দীর্ঘদিন ধরে কারাগারে আটক বন্দীদের তালিকা চেয়ে দেশের সকল কারাগারে চিঠি পাঠায়। তারই পরিপ্রেক্ষিতে আইজি প্রিজন কার্যালয় ওই তালিকাটি পাঠিয়েছে। এখন তালিকা যাচাই-বাছাই করে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। সুপ্রীমকোর্ট লিগ্যাল এইডের বর্তমান চেয়ারম্যান বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই বেশকিছু পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে, যার মধ্যে এটি অন্যতম। ইতোমধ্যে কারাগারে আটক চারজন বন্দী হাইকোর্ট থেকে জামিনও পেয়েছেন। আরও চার মহিলা বন্দীকে ১৬ জানুয়ারি আদালতে হাজির করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আইনজীবীগণ আশা করছেন, এ ৪৬২ জনের মধ্যে অনেকে আইনগতভাবেই কারাগারের চার দেয়াল থেকে বেরিয়ে আসতে পারবেন। বিনা বিচারে আটক আছেন এমন অপরাধীদের বিষয়টি আদালতের নজরে আনার পর আদালত এ উদ্যোগ নিয়েছে। আদালত যা করছে তা সঠিক। ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে এটি একটি মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত থাকবে। সুপ্রীমকোর্টের লিগ্যাল এইড কমিটি গত ১৬ নবেম্বর বিনা বিচারে দীর্ঘদিন ধরে কারাগারে আটক বন্দীদের তালিকা চেয়ে দেশের সকল কারাগারে চিঠি পাঠায়। পাঁচ ও দশ বছরের অধিক সময় ধরে যারা আটক রয়েছেন তাদের বিষয়ে দুটি তালিকা প্রস্তুত করে কমিটির কাছে পাঠাতে বলা হয়েছিল। কারাগারগুলোতে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, রাষ্ট্র গরিব ও অসহায় মানুষদের সুপ্রীমকোর্টে বিনা পয়সায় মামলা পরিচালনার ভার বহন করছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন গণমাধ্যম সূত্রে দেশের কয়েকটি কারাগারে বিভিন্ন ধরনের ফৌজদারি অপরাধে বিনা বিচারে দীর্ঘ সময় ধরে আটক থাকার সংবাদ সুপ্রীমকোর্টের লিগ্যাল এইড কমিটির দৃষ্টিগোচর হয়েছে। নিম্ন আদালতে বিচারের জন্য প্রস্তুত হওয়া এসব মামলা সাক্ষ্যগ্রহণসহ নানাবিধ কারণে দীর্ঘ সময় ধরে অনিষ্পন্ন অবস্থায় পড়ে রয়েছে। ফলে কার্যত সাজা হওয়ার পূর্বেই আটক বন্দী দীর্ঘদিন ধরে কারাভোগ করছেন। এ চিঠি পাঠানোর পর ৭ ডিসেম্বর আইজি প্রিজন বিভিন্ন কারাগারে পাঁচ থেকে তদুর্ধ সময়ে বিচারাধীন আটক বন্দীদের তালিকা সুপ্রীমকোর্ট লিগ্যাল এইড কমিটিতে পাঠিয়েছে। এ বিষয়ে সুপ্রীমকোর্ট লিগ্যাল এইড কমিটির কর্মকর্তা রিপন পৌল স্কু জনকণ্ঠকে বলেছেন, আইজি প্রিজন কার্যালয় থেকে বিনা বিচারে আটক বন্দীদের তালিকাটি ৭ ডিসেম্বর আমাদের এখানে পাঠানো হয়েছে। ওই তালিকায় মোট ৪৬২ জন বন্দী রয়েছেন। এখন ওই তালিকা থেকে প্রত্যেক বন্দীর জীবনবৃত্তান্ত, কারাভিত্তিক পরিসংখ্যান, নারী-পুরুষের সংখ্যা এবং আসামিদের বিরুদ্ধে অন্য কী কী অভিযোগ আছে তা বের করার চেষ্টা করা হবে। এরপর আইনানুযায়ী পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। এই ৪৬২ জনের মধ্যে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার কেরানীগঞ্জ পাঁচজন, ময়মনসিংহ কেন্দ্রীয় কারাগার ২৫ জন, কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-১-এ চারজন, কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-২-এ ৫৭ জন, কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগার পাঁচজন, কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কারাগারে ২১ জন, ফরিদপুর জেলা কারাগার পাঁচজন, টাঙ্গাইল জেলা কারাগার তিনজন, জামালপুর জেলা কারাগাার একজন, কিশোরগঞ্জ জেলা কারাগারে ৮ জন, নারায়ণগঞ্জ জেলা কারাগারে ১৮ জন, নরসিংদী জেলা কারাগারে ১১ জন, মুন্সীগঞ্জ জেলা কারাগারে চারজন, নেত্রকোনা জেলা কারাগারে একজন, মানিকগঞ্জ জেলা কারাগার চারজন, শরীয়তপুর জেলা কারাগার দুজন, রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে ১৭ জন, পাবনা জেলা কারাগারে চারজন, বগুড়া জেলা কারাগারে পাঁচজন, সিরাজগঞ্জ জেলা করাগারে আটজন, নওগাঁ জেলা কারাগারে দুজন, জয়পুরহাট জেলা কারাগরে পাঁচজন, নাটোর জেলা কারাগারে চারজন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা কারাগারে একজন, রংপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে দুজন, গাইবান্ধা জেলা কারাগারে চারজন, কুড়িগ্রাম জেলা কারাগারে দুজন, নীলফামারী জেলা কারাগারে নয়জন, দিনাজপুর জেলা কারাগার ১১ জন, ঠাকুরগাঁও জেলা কারাগারে ছয়জন, চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে ৩৪ জন, চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে ২৩ জন, কক্সবাজার জেলা কারাগারে ৩১ জন, খাগড়াছড়ি জেলা কারাগার চারজন, বান্দরবান জেলা কারাগারে দুজন, কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারে ১৭ জন, চাঁদপুর জেলা কারাগার চারজন, নোয়াখালী জেলা কারাগারে দুজন, ফেনী জেলা কারাগারে চারজন, লক্ষ্মীপুর জেলা কারাগারে চারজন, সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারে ১৪ জন, হবিগঞ্জ জেলা কারাগারে দুজন, মৌলভীবাজার জেলা করাগারে ছয়জন, সুনামগঞ্জ জেলা কারাগারে চারজন, যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে সাতজন, খুলনা জেলা করাগারে ১০ জন, বাগেরহাট জেলা কারাগার দুজন, সাতক্ষীরা জেলা কারাগারে ১১ জন, নড়াইল জেলা কারাগারে একজন, মাগুরা জেলা কারাগারে একজন, ঝিনাইদহ জেলা কারাগারে চারজন, চুয়াড়াঙ্গা জেলা কারাগারে ১০ জন, বরিশাল কেন্দ্রীয় কারাগারে তিনজন, পটুয়াখালী জেলা কারাগার দুজন, বরগুনা জেলা কারাগারে দুজন, ভোলা জেলা কারাগারে তিনজন, ঝালকাঠি জেলা কারাগারে একজন, পিরোজপুর জেলা কারাগারে একজন বন্দী পাঁচ বা তদুর্ধ সময় ধরে কারাগারে বিনা বিচারে রয়েছেন। ইতোমধ্যে ৪ ডিসেম্বর বিনা বিচারে দেড় দশক ধরে কারাগারে থাকা চান মিয়া, মকবুল, সেন্টু ও বিল্লালের মামলার বিচার শেষ করতে সময় বেঁধে দিয়েছে হাইকোর্ট। এরমধ্যে মকবুল, সেন্টু ও বিল্লালকে আদালত জামিন দিয়েছে। তবে চান মিয়া নিম্ন আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দেয়ায় তাকে কারাগারেই থাকতে হবে। হাইকোর্টের নির্দেশে কারা কর্তৃপক্ষ ওই চার আসামিকে আদালতে হাজির করার পর বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি জেবিএম হাসানের বেঞ্চ এ আদেশ দেয়। আদালত বলেছে, মকবুল, সেন্টু ও বিল্লালের মামলার বিচার ৯০ দিনের মধ্যে শেষ করতে হবে। আর নিম্ন আদালতে চান মিয়ার মামলার নিষ্পত্তি করতে হবে ৬০ দিনের মধ্যে। এর আগে ৩০ নবেম্বর বিনা বিচারে কাশিমপুর কারাগারে সাত বছর ধরে কারাবন্দী চার নারীকে আগামী ১৬ জানুয়ারি আদালতে হাজির করার নির্দেশ দিয়েছে একই আদালত। এরা হলেনÑ সুমি আক্তার রেশমা, শাহনাজ বেগম, রাজিয়া সুলতানা ও রানী ওরফে নূপুর। তাদের কেন জামিন দেয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে একটি রুলও জারি করা হয়েছে। ১৫ নবেম্বর কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে জামিনে মুক্ত হন ১৭ বছর বিনা বিচারে কারাগারে থাকা ঢাকার সূত্রাপুরের ৫৯, গোয়ালঘাট লেন এলাকার মোঃ শিপন মিয়া। একই ভাবে তার বিষয়টি গত ৩০ অক্টোবর নজরে আনা হলে শিপনকে ৮ নবেম্বর হাজির করতে কারা কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেয় হাইকোর্ট। ওই দিন বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও জেবিএম হাসানের হাইকোর্ট বেঞ্চ দীর্ঘ ২২ বছর আগের ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলায় ১৭ বছর ধরে বিনা বিচারে কারাগারে থাকা মোঃ শিপনকে মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত জামিন প্রদান করে।