সোমবার ১০ কার্তিক ১৪২৮, ২৫ অক্টোবর ২০২১ ঢাকা, বাংলাদেশ
প্রচ্ছদ
অনলাইন
আজকের পত্রিকা
সর্বশেষ

সংস্কৃতিকর্মীর সামাজিক দায়বদ্ধতা

  • রামেন্দু মজুমদার

বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ভিত্তি বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি। ভাষার অধিকারের সংগ্রামের মধ্য দিয়ে জাতীয়তাবাদের যে চেতনার বীজ বপিত হয়েছিল, তা পল্লবিত হয়েছে আমাদের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে- এ ইতিহাস সবার জানা। ফেব্রুয়ারি মাস এলে আমরা নিজেদের ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি বিশেষ মনোযোগী হই, ফিরে তাকাতে চাই আমাদের ঐতিহ্যের প্রতি।

এই ঐতিহ্যের সঙ্গে বিরাটভাবে যুক্ত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। সেদিন বাংলা একাডেমির বইমেলার মাঠে এক টিভি সাংবাদিক আমাকে প্রশ্ন করেছিলেন- নতুন প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস বুঝবে কী করে? আমি বলেছিলাম, ইতিহাসে মিথ্যার স্থান নেই। সাময়িকভাবে তা কিছুটা বিভ্রান্তির সৃষ্টি করতে পারলেও ইতিহাসের সত্য চিরকাল বেঁচে থাকে। আজকাল আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের নানা দিক নিয়ে অনেক বই প্রকাশিত হয়েছে। তার দু-চারটা পড়লেই পাঠক চিহ্নিত করতে পারবেন ইতিহাসের সত্যকে। আঁস্তাকুড়েয় নিক্ষেপ করবেন মিথ্যার বেসাতিতে ভরা কিছু প্রকাশনাকে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়- মিথ্যা ও বিভ্রান্তি সাময়িক কুহকজাল বিস্তার করে। এক সময় প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসে। এটাও প্রকৃতি ও ইতিহাসের অমোঘ নিয়ম। সেই সত্য যখন বেরিয়ে আসে তখন সৃষ্টি হয় এক অভূতপূর্ব জাগরণ, যে জাগরণ সময় ও সমাজকে করে প্রভাবিত। এই সেদিন ঘটা শাহবাগে ‘গণজাগরণ’-এর কথা-ই বলা যায়। নতুন প্রজন্মের একটা অংশকে ভুল ও মিথ্যা ইতিহাসের জালে আটকানোর চেষ্টা চলছিল। সেই কুহক সরে গিয়ে ইতিহাসের প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসে। মিথ্যার জাল ছিঁড়ে সত্যান্বেষী মানুষ সত্যের মঞ্চে এসে দাঁড়ায়। শাহবাগের গণজাগরণের অন্যতম কারণ ছিল মিথ্যার বিরুদ্ধে সত্যের জয়গান প্রতিষ্ঠা। বিভ্রান্তির বিরুদ্ধে সঠিক পথরেখা আবিষ্কার। এই বিভ্রান্তির জন্য নিঃসন্দেহে দায়ী আমাদের অসুস্থ রাজনীতি ও মতলববাজ রাজনীতিকরা। তবে স্বপ্নের কথা, গত সাত বছর ধরে গণমাধ্যম আমাদের সামনে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছে ইতিহাসের সত্যকে, যার পথ ধরে নতুন প্রজন্ম এগিয়ে যাবে স্বপ্নের বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়নে।

অনেক সময় একটা কথা কানে আসে, সংস্কৃতিকর্মীরা রাজনীতিতে জড়াবে কেন? রাজনীতি কি আমাদের জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন? প্রত্যেক মানুষের রাজনৈতিক সচেতনতা থাকা প্রয়োজন। আমাদের দেশে তার অভাব আছে বলেই দুষ্ট রাজনীতিকরা সাধারণ মানুষকে বিপথে পরিচালিত করতে পারে, ধর্মের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে সরলমনা ধর্মপ্রাণ মানুষকে বিভ্রান্ত করতে পারে।

সংস্কৃতিকর্মীদের অবশ্যই রাজনীতি সচেতন হতে হবে। রাজনৈতিক সচেতনতা না থাকলে সাংস্কৃতিক অগ্রগতি সম্ভব নয়। রাজনীতি বলতে আমি দলীয় রাজনীতি বোঝাচ্ছি না। একজন সংস্কৃতিকর্মী যে কোন রাজনৈতিক দলকে সমর্থন করতেই পারেন। কিন্তু সে দলের এজেন্ডা বাস্তবায়ন যদি তাঁর সংস্কৃতিকর্মের মধ্য দিয়ে করতে চান, তবে তাঁর সংস্কৃতিকর্ম ব্যাপক জনমানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। যদি তিনি দেশ এবং দেশের মানুষের কল্যাণ সম্পর্কে সচেতন হন, তবে তাঁর শিল্পকর্ম সামাগ্রিক কল্যাণ বয়ে আনবে। শাহবাগের গণজাগরণের কথাই আবার এসে যায়। তারুণ্যের এ জাগরণের সঙ্গে সংস্কৃতিকর্মীদের যে অংশগ্রহণ তা নির্দিষ্ট কোন দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ছিল না। আবার অরাজনৈতিক পরিস্থিতিও ছিল না। সংস্কৃতিকর্মীরা যে দায় পালন করেছেন তা অবশ্যই সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে। যেমন আমরা দেখেছি পাকিস্তান আমলে ’৬১-তে রবীন্দ্র নিষিদ্ধের অপচেষ্টাকালে, ’৬৯-এর গণআন্দোলনে, ’৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধে, ’৯০-এর স্বৈরাচার পতনের আন্দোলনে।

আজকের সংস্কৃতিকর্মীদের জন্য মুুক্তিযুদ্ধের চেতনা একটা বড় অনুষঙ্গ হিসেবে কাজ করে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেয়ে বড় ঘটনা আর নেই। তাই আমাদের শিল্প সৃষ্টিতে বার বার মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ আসবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ভিত্তি করেই আমাদের শিল্পের ভুবন সৃষ্টিশীলতায় পল্লবিত হবে। বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী শক্তি যখন রাষ্ট্রক্ষমতার অংশীদার ছিল এবং মুক্তিযুদ্ধের বানোয়াট ইতিহাস প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করা হয়েছে তখনও সংস্কৃতিকর্র্র্র্র্র্র্র্র্মীরাই তাঁদের নাটক, গান, কবিতা, আবৃত্তি, নৃত্য, চিত্রকর্মÑ সবকিছুর মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে জাগরুক রেখেছে।

আমি নাটকের ক্ষেত্রে কাজ করি। অন্য অনেক মাধ্যমের শিল্পীর চেয়ে নাট্যকর্মীরা মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অনেক বেশি সোচ্চার। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে নাট্যকর্মীরা বরাবরই ছিল সোচ্চার। কেবল নাটকের মধ্য দিয়ে নয়, আন্দোলনের মাধ্যমেও মানবতাবিরোধীদের বিচারের দাবিকে তুলে ধরেছে। অনেক পথনাটক রচিত হয়েছে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকে কেন্দ্র করে। শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলন যখন তুঙ্গে, নাট্যকর্মীরা আলাদা আলাদা কেন্দ্রে যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে নাটক করেছে, অবিরাম সেøাগানে মুখর থেকেছে। পথনাটক যেহেতু সমসাময়িক বিষয় নিয়ে রচিত হয়, তাই বেশিরভাব ক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবেই একাত্তরের ঘৃণ্য রাজাকারের চরিত্র বার বার এসব নাটকে উঠে এসেছে।

এই যে সামাজিক দায়বদ্ধতা এটা কেউ আমাদের ওপর চাপিয়ে দেয়নি। সংস্কৃতিকর্মী হিসেবে আমরা মনে করেছি সমাজের অসঙ্গতিগুলো আমাদের শিল্পমাধ্যমে তুলে ধরব, জনগণকে সচেতন করব এসবের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হতে। সমাজের প্রতি এটা শিল্পীদের দায়। এ দায় আমরা স্বেচ্ছায় নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়েছি। কারণ আমাদের শিল্পকর্ম সাধারণ মানুষের কল্যাণের জন্য। সাধারণ মানুষের মুক্তির কথা বলতে গিয়ে, কল্যাণসাধন করতে গিয়ে আপনাআপনিই কিছু দায়িত্ব এসে যায়। এ দায়িত্ব পালন শিল্প-সাধনার মতোই। অবশ্য তা শিল্পের মাধ্যমেই করতে হয়।

মনে রাখা দরকার, একজন সংস্কৃতিকর্মী এই সমাজেই বাস করেন। আর দশটা সাধারণ নাগরিকের চেয়ে সংস্কৃতিকর্মী স্বাভাবিকভাবেই হন সচেতন। তাদের চোখ-কান থাকে অধিকতর খোলা ও সজাগ। চারপাশের ঘটনাবলী তাকে প্রভাবিত করে। সমাজের এগিয়ে থাকা মানুষের অন্যতম সে, যে কারণে যে কোন ঘটনাকে কেন্দ্র করে তার অবস্থান স্পষ্ট করতে চায়। সিদ্ধান্ত নিতে চায় কোন পক্ষ সমর্থন করবে, কেমনভাবে করবে ও কেন করবে? তার অন্তর্গত অনুভব এক সময় বেরিয়ে পড়ে। এই অনুভবজারিত সিদ্ধান্তকেই আমরা বলব দায়বদ্ধতা।

রাষ্ট্র-সমাজ থেকে সংস্কৃতিকর্মী যেহেতু প্রতিদিনই কিছু না কিছু গ্রহণ করছে; সেহেতু সে মনে করে রাষ্ট্র ও সমাজকে কিছু দিতে হবে। গ্রহণটাকে সে ভাবছে ঋণ হিসেবে। রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতি সে ঋণ শোধবার দায় অনুভব করে প্রতিক্ষণে। যে কারণে আমি মনে করি একজন প্রকৃত ও সৎ সংস্কৃতিকর্মী সামাজিক দায়বদ্ধ না হয়ে পারে না। সেই দায় পরিশোধের মাধ্যম অবশ্যই শিল্প। নান্দনিক ও শৈল্পিকভাবে তার দায় শোধের মাধ্যমে কর্তব্যকর্ম করে এগিয়ে যেতে হয়। এমনটা হলেই দেশ-জাতি, সমাজ-রাষ্ট্র এবং শিল্পের জন্য মঙ্গল।

শীর্ষ সংবাদ:
ওরা ধ্বংসই চায় ॥ দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করতে সহিংসতা         ক্যাচ মিসে ম্যাচ হার বাংলাদেশের         বিএনপির দৃষ্টিসীমা এখন কুয়াশাচ্ছন্ন ॥ কাদের         অপরাধী যে দলেরই হোক তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা         উদ্ধার করা হবে বুড়িগঙ্গার আদি চ্যানেল         তিন হাজার কনস্টেবল পদের জন্য ৩ লাখ ৩৮ হাজার আবেদন         খোলাবাজারে ডলার ৯০ টাকা         সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ইলিশের উৎপাদন বেড়েছে         এনজিও ফাউন্ডেশন দারিদ্র্য নিরসনে কাজ করবে ॥ অর্থমন্ত্রীর আশা         ‘সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্টকারীদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি’         করোনা : গত ২৪ ঘন্টায় মৃত্যু ৯         ‘সাম্প্রদায়িক হামলার দায় এড়াতে পারে না ফেসবুক কর্তৃপক্ষ’         নারীরা উদ্যোক্তা হিসেবেও অনেক ভূমিকা রাখছেন ॥ শিল্পমন্ত্রী         রাজধানীতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে : ডিএমপি         ডেঙ্গু : আরও ১ জনের মৃত্যু, হাসপাতালে ১৭৯         ইউপি নির্বাচন : ঢাকা ও ময়মনসিংহ বিভাগের নৌকার টিকিট পেলেন যারা         ২৬ অক্টোবর আসছে নতুন রাজনৈতিক দল ‘বাংলাদেশ গণ অধিকার পরিষদ’         কৃষিপ্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে সারা বছরই আম পাওয়া সম্ভব ॥ কৃষিমন্ত্রী         শেখ হাসিনার সরকার হলো সবচেয়ে বেশি নারীবান্ধব ॥ পররাষ্ট্রমন্ত্রী         কুষ্টিয়ায় ট্রাক চাপায় দুই শিশু নিহত