নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ নেতা ফয়সাল
ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও ঢাকা-৮ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী শরীফ ওসমান হাদির ওপর হামলাকারী দুই ব্যক্তিকে দুইদিনেও গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। তবে মোটরসাইকেলের পেছনে বসে যে ব্যক্তি হাদিকে গুলি করেছে, তাকে শনাক্ত করা হয়েছে। তার ছবি গণমাধ্যমে প্রকাশ করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। তবে তার নাম পরিচয় জানাতে পারেনি ডিএমপি।
ডিএমপি যে ব্যক্তির ছবি প্রকাশ করেছে, তার নাম ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে দাউদ খান বলে জানা গেছে। ফয়সাল করিম নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের ঢাকা মহানগর উত্তরের সাবেক সহসভাপতি এবং আদাবর ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি। তার গ্রামের বাড়ি পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলায়। গত বছর অস্ত্রসহ রাজধানী থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে র্যাব। সেই মামলায় গত ফেব্রুয়ারি মাসে হাইকোর্ট থেকে জামিন পায় ফয়সাল করিম। চিহ্নিত এই সন্ত্রাসীকে ধরতে সাঁড়াশি অভিযান চালাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক টিম। সীমান্তে কড়া সতর্কতা জারি করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)।
ডিএমপির এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, শুক্রবার রাজধানীর বিজয়নগর বক্স কালভার্ট এলাকায় মোটরসাইকেল আরোহী দুর্বৃত্তদের হামলায় ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ওসমান হাদি গুরুতর আহত হন। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ হামলাকারীদের গ্রেপ্তারে রাজধানীতে জোর অভিযান পরিচালনা করছে। এতে আরও বলা হয়, ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে ছবির ব্যক্তিকে প্রাথমিকভাবে শনাক্ত করা গেছে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ তাকে হন্যে হয়ে খুঁজছে। এই ব্যক্তি সম্পর্কে কোনো তথ্য থাকলে বা তার সন্ধান পেলে দ্রুত মোবাইল নম্বর (ডিসি মতিঝিল: ০১৩২০০৪০০৮০, ওসি পল্টন: ০১৩২০০৪০১৩২) অথবা ৯৯৯ এর মাধ্যমে পুলিশকে জানানোর জন্য বিনীত অনুরোধ করা হলো। সন্ধানদাতার পরিচয় গোপন রাখা হবে এবং উপযুক্ত পুরস্কৃত করা হবে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ডিএমপির প্রকাশ করা ছবি ফয়সাল করিম দাউদ খান নামের এই ব্যক্তি কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিল। ২০১৯ সালের ১১ মে ঘোষিত কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে সে সদস্য হয়েছিল। ওসমান হাদির প্রতিষ্ঠিত ইনকিলাব কালচারাল সেন্টারসহ বিভিন্ন জায়গায় তার সঙ্গে ফয়সাল করিমের সাম্প্রতিক সময়ের কিছু ছবি রয়েছে। সেই ছবিগুলোতে থাকা ফয়সাল করিমের সঙ্গে গুলি করা ব্যক্তির চেহারার সাদৃশ্য থাকায় গুলি ছোড়ার ঘটনায় তাকে সন্দেহ করা হচ্ছে।
পেশাদারদের যোগাযোগমাধ্যম লিংকডইনে ফয়সাল করিমের নামে প্রোফাইল আছে। সেখানে সে নিজেকে অ্যাপল সফট আইটি, ওয়াইসিইউ টেকনোলজি ও এনলিস্ট ওয়ার্ক নামে তিনটি প্রতিষ্ঠানের মালিক হিসেবে উল্লেখ করেছে। লিংকডইন প্রোফাইলের তথ্য অনুযায়ী, ফয়সাল করিম ২০১৩ সালে ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কম্পিউটারবিজ্ঞানে স্নাতক সম্পন্ন করেছে। পরে আরেকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ করেছে বলে সেখানে উল্লেখ রয়েছে।
তবে ২০২৪ সালে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় আন্দোলনকারীদের দমনে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীদের সঙ্গে মাঠে ছিল বলে একটি সূত্র জানিয়েছে। সূত্রটি নিশ্চিত করেছে, ওসমান হাদির ওপর গুলির ঘটনায় সন্দেহভাজন ফয়সাল করিম ও কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সদস্য (রেজওয়ানুল হক চৌধুরী ও গোলাম রাব্বানী নেতৃত্বাধীন কমিটি) ফয়সাল করিম দাউদ খান একই ব্যক্তি।
ওসমান হাদিকে গুলির ঘটনায় নাম আসার পর ফয়সাল করিমের সঙ্গে আওয়ামী লীগ আমলে বাংলাদেশের দুইবারের রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ এবং ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের কিছু নেতার ছবি ফেসবুকে প্রকাশিত হয়েছে। এ ছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে হাদির সঙ্গে ঢাকা-৮ আসনে গণসংযোগ এবং বাংলামোটরে হাদির প্রতিষ্ঠিত ইনকিলাব কালচারাল সেন্টারের আড্ডায় ফয়সালের অংশ নেওয়ার ছবিও ভাইরাল হয়েছে। অনেকে ধারণা করছেন, ফয়সাল করিম ওসমান হাদিকে অনেকদিন ধরে অনুসরণ করছিল।
২০১৬ সালে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (বেসিস) সহযোগিতা ও সরকারের তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগের পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে ‘ব্যাটল অব ৭১’ নামে একটি কম্পিউটার গেম তৈরি করেছিল ফয়সাল করিমের মালিকানাধীন ওয়াইসিইউ টেকনোলজি লিমিটেড।
সে বছরের নভেম্বরে ওই গেমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বেসিসের তৎকালীন সভাপতি এবং পরে ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বারও উপস্থিত ছিলেন। ২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ‘আসনভিত্তিক নির্বাচন পরিচালনা ও সমন্বয়ক কমিটি’ করেছিল কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ। ঢাকা-১২ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ছিলেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান। এই আসনের সমন্বয়ক কমিটির সদস্য ছিল ফয়সাল করিম।
অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার, পরে জামিন নিয়ে প্রশ্ন॥ গত বছরের ২৮ অক্টোবর রাজধানীর আদাবরের বাইতুল আমান হাউজিং সোসাইটি এলাকায় ব্রিটিশ কলাম্বিয়া স্কুলের চতুর্থ তলায় অফিসে অস্ত্রের মুখে ১৭ লাখ টাকা লুটের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় আদাবর থানায় একটি মামলা হয়েছিল। ওই মামলার প্রধান আসামি ছিল ফয়সাল করিম। মামলা হওয়ার কিছুদিন পর ৭ নভেম্বর আদাবর এলাকা থেকে ফয়সাল করিমকে গ্রেপ্তার করেছিল র্যাব। তখন তার কাছ থেকে দুটি বিদেশি পিস্তল, দুটি ম্যাগাজিন, পাঁচটি গুলি, তিনটি মুঠোফোন ও পাঁচ হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়েছিল।
ওই মামলায় গত ১৬ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্ট থেকে জামিন পায় ফয়সাল করিম। জামিনের সময়সীমা বাড়াতে গত ১২ আগস্ট আবারও আবেদন করলে হাইকোর্ট নতুন করে তার এক বছরের জামিন মঞ্জুর করেন। জামিনে থাকা অবস্থায় এবার তার বিরুদ্ধে ওসমান হাদিকে গুলি করার অভিযোগ এলো। এ রকম লুটের ঘটনায় দুটি অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তি এত অল্প সময়ের (৩ মাস ৮ দিন) মধ্যে কীভাবে জামিন পেলেন, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়। এ নিয়ে এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন জায়গায় আলোচনা-সমালোচনা চলছে।
বাসাসহ ৫ স্থান শনাক্ত
ফয়সাল করিমের বাসাসহ অন্তত পাঁচটি জায়গা শনাক্ত করা হয়েছে। তবে সেখানে তাকে পাওয়া যায়নি।
মতিঝিল বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, সন্দেহভাজন ফয়সাল দেশ ছেড়ে পালিয়েছে- এমন তথ্য নেই। সে পালাতে পারেনি। বিভিন্ন স্থানে অভিযান ও খোঁজখবর নেওয়া হয়েছে। এই কর্মকর্তা আরও জানান, ফয়সাল একাধিক মোবাইল ফোন ও নম্বর ব্যবহার এবং বারবার নম্বর পরিবর্তন করেছে। এসব তথ্যের ভিত্তিতে বিভিন্ন স্থানে অনুসন্ধান চালানো হলেও তার নিশ্চিত কোনো অবস্থান পাওয়া যায়নি। তদন্তে বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে সমন্বয়ের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সবাই সমন্বিতভাবে কাজ করছে। র্যাব, ডিবিসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ ও সমন্বয় রয়েছে।
ধরিয়ে দিতে ৫০ লাখ টাকা পুরস্কার
হামলাকারীকে ধরিয়ে দিতে পারলে তার জন্য সরকার ৫০ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী।
শনিবার সচিবালয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোর কমিটির সভা শেষে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ওসমান হাদি হত্যার সঙ্গে জড়িত আসামিদের ধরিয়ে দিতে পারলে তার জন্য সরকার ৫০ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেছে। ওসমান হাদির ওপর আক্রমণের ঘটনা আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত করার অপপ্রয়াস বলে আমরা মনে করি। জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত করার যে কোনো ধরনের অপচেষ্টা অন্তর্বর্তী সরকার কঠোর হস্তে দমন করবে। এ হামলায় জড়িত কাউকে কোনো প্রকার ছাড় দেওয়া হবে না বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
জড়িতদের শীঘ্রই আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন ডিএমপি কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী। শনিবার রাজারবাগে এক অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা খুঁজতেছি, প্রাইম সাসপেক্টকে খুঁজতেছি। এখনো ২৪ ঘণ্টা পার হয়নি। হোপফুলি আমরা হিট করতে পারব। আমরা জনগণের সহযোগিতা চাইছি। হাদির ওপর হামলার ঘটনায় সংসদ নির্বাচনের সম্ভাব্য প্রার্থীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএমপি কমিশনার বলেন, তাদের নিরাপত্তার বিষয়ে ব্যবস্থা নিচ্ছি।
সীমান্তে কড়া সতর্কতা
এ ঘটনায় জড়িত সন্ত্রাসীরা যেন সীমান্ত কিংবা সীমান্তবর্তী এলাকা ব্যবহার করে পার্শ্ববর্তী দেশে পালিয়ে যেতে না পারে সে লক্ষ্যে সীমান্তে সতর্ক রয়েছে বিজিবি। মৌলভীবাজারের কুলাউড়া, কমলগঞ্জ ও শ্রীমঙ্গল উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় সর্বোচ্চ সতর্কতা জারির কথা জানিয়ে শ্রীমঙ্গল ব্যাটালিয়ন (৪৬ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল এ এস এম জাকারিয়া জানান, হাদির ওপর হামলার ঘটনার পর থেকে ৪৬ বিজিবি অধীনস্থ বিওপি সমূহ থেকে নিয়মিত টহলের পাশাপাশি অতিরিক্ত বিশেষ টহল পরিচালনা করছে। একই সঙ্গে সম্ভাব্য পলায়ন ও অবৈধ পারাপারের স্থানগুলো চিহ্নিত করে সেখানে প্রয়োজনীয় সংখ্যক বিশেষ চেকপোস্ট স্থাপন করা হয়েছে। এসব চেকপোস্টে যানবাহন ও সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের তল্লাশি অভিযান জোরদার করা হয়েছে।
অন্যদিকে বিজিবির ২৫ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল জাব্বার আহমেদ জানান, বিজিবি সদর দপ্তরের নির্দেশনায় ২৫ ব্যাটালিয়নের দায়িত্বপূর্ণ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া, বিজয়নগর এবং হবিগঞ্জের ধর্মঘর সীমান্তে টহল কার্যক্রম স্বাভাবিকের চেয়ে দ্বিগুণ করা হয়েছে। কোনো অবস্থাতেই অবৈধভাবে কেউ সীমান্ত অতিক্রম করতে পারবে না। ২৫ বিজিবির আওতাধীন প্রত্যেকটি বিওপির সদস্যরা সীমান্তে সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন।
এদিকে, এ ঘটনায় মামলার প্রস্তুতি চলছে বলে জানিয়েছেন ডিএমপি কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী। তিনি শনিবার গণমাধ্যমকে বলেন, গুলিবিদ্ধ হাদির পরিবারের পক্ষ থেকে মামলার প্রস্তুতি চলছে। মামলায় মোটরসাইকেল চালক ও তার পেছনে বসে যিনি গুলি করেছেন তাদের আসামি করা হবে।
জানতে চাইলে ডিএমপির মতিঝিল বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার হারুন অর রশিদ বলেন, ভুক্তভোগীর পরিবার বাদী হয়ে মামলা করবে। তবে তারা হাসপাতালে রয়েছেন, যার কারণে কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে।
প্যানেল হু








