ঢাকা, বাংলাদেশ   শনিবার ২০ এপ্রিল ২০২৪, ৬ বৈশাখ ১৪৩১

সুনামগঞ্জ-৫

মনোনয়ন নিয়ে প্রকাশ্য বিরোধ বড় তিন দলে

এমরানুল হক চৌধুরী, সুনামগঞ্জ

প্রকাশিত: ২৩:৫০, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৩

মনোনয়ন নিয়ে প্রকাশ্য বিরোধ বড় তিন দলে

ছাতক-দোয়ারাবাজার উপজেলা নিয়ে গঠিত সুনামগঞ্জ-৫ আসন

দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সীমান্ত ঘেঁষা জনপদ ছাতক-দোয়ারাবাজার উপজেলা নিয়ে গঠিত সুনামগঞ্জ-৫ আসন। সংসদীয় আসনটি সিমেন্ট শিল্পের জন্য বিখ্যাত। এখানে রয়েছে দেশের সেরা একাধিক সিমেন্ট ফ্যাক্টরি। এছাড়া রয়েছে বেশ কিছু ভারি শিল্প প্রতিষ্ঠান। ৬৮২ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এ আসনের বেশিরভাগ ভোটারই শ্রমজীবী-কৃষিজীবী ও প্রবাসী।
স্বাধীনতার পর এই আসনে ১১টি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্যে পাঁচবার বিজয়ী হয় আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি দুবার, স্বতন্ত্র দুবার এবং বিএনপি ও জাসদ একবার করে বিজয়ী হয়।
১৯৯০ সালের পটপরিবর্তনের পর ১৯৯১ সালের নির্বাচনে জাতীয় পার্টির আবদুল মজিদ, ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী কলিম উদ্দিন মিলন, ১২ জুনের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মুহিবুর রহমান মানিক এবং ২০০১ সালে বিএনপির কলিম উদ্দিন মিলন এমপি হন। ২০০৮ সালের ভোটে মুহিবুর রহমান মানিক আসনটি পুনরুদ্ধার করেন। এরপর থেকে সকল নির্বাচনে মুহিবুর রহমান মানিক বিজয়ী হয়ে আসনটি আওয়ামী লীগের শক্ত ঘাঁটিতে পরিণত করেছেন। তবে আসন্ন নির্বাচন ঘিরে এলাকায় নানা কৌশলে সম্ভাব্য প্রার্থীরা গণসংযোগে নেমে পড়েছেন।

এই আসন বারবার নির্বাচিত এমপি ও জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি মুহিবুর রহমান মানিক ছাড়াও নব গঠিত জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শামীম আহমদ চৌধুরী আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশী। অন্যদিকে বিএনপির থেকে কৌশলে গণসংযোগ করছেন জেলা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক এমপি কলিম উদ্দিন আহমদ মিলন, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান চৌধুরী এবং জেলা বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার সৈয়দ মুনসিফ আলী।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে দলীয় মনোনয়ন নিয়ে প্রকাশ্য বিরোধ রয়েছে বড় তিন দল আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টিতে। একারণে আসনটির তৃণমূলের নেতাকর্মীরা বিভক্ত হয়ে পড়েছেন শহর থেকে গ্রামে। গোটা নির্বাচনী এলাকা আওয়ামী লীগের দুটি বলয়ে বিভক্ত। একটি হলো কালাম গ্রুপ অন্যটি মানিক গ্রুপ। আর এটি অপেন সিক্রেট ছাতক-দোয়ারাবাজার উপজেলার সব গ্রাম, মহল্লায়-মহল্লায়। এই আসনে আওয়ামী লীগে বিভক্তি দীর্ঘদিনের। দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে এই দুই নেতাকে ঘিরে দুটি বলয়ই সক্রিয়।

একটির নেতৃত্বে রয়েছেন বর্তমান এমপি মুহিবুর রহমান মানিক, অপর অংশের নেতৃত্বে আছেন পৌর মেয়র আবুল কালাম চৌধুরী। এমপি মুহিবুর রহমান মানিকের শক্ত প্রতিপক্ষ হিসেবে যে তিনজন মাঠে রয়েছেন, তাদের মধ্যে প্রচারে এগিয়ে শামীম আহমদ চৌধুরী। এমপি মানিকের প্রতিপক্ষ ছাতক পৌর মেয়র আবুল কালামের ছোট ভাই শামীম। তিনি নির্বাচনী মাঠ দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন।
এর আগে ছাতক উপজেলা নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হয়ে চেয়ারম্যান পদে শামীম হেরে যান বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা মিজানুর রহমান চৌধুরীর কাছে। তবে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন দৌড়ে এই দুই নেতা ছাড়াও আছেন যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের আয়ুব করম আলী ও দোয়ারাবাজার উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক  ফরিদ আহমদ তারেক।
ছাতক উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক সৈয়দ আহমদ বলেন, দলীয় মনোনয়ন নিয়ে প্রতিযোগিতা থাকলেও কোনো বিভক্তি নেই। নেতাকর্মীরা সবাই নৌকার সমর্থনে ঐক্যবদ্ধ।
এমপি মহিবুর রহমান মানিক বলেন, আমার সংসদীয় আসনে আড়াই হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন কাজ হয়েছে। যোগাযোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শিল্পোন্নয়ন, বিদ্যুতায়ন থেকে শুরু করে সব ক্ষেত্রেই উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছে।
তিনি বলেন, ‘আমি দলীয়ভাবে ছয়বার মনোনয়ন পেয়েছি। এবারও দল আমাকে মনোনয়ন দেবে-এটা আমার বিশ্বাস। আমার অসমাপ্ত উন্নয়ন কাজ শেষ করতেই এ আসনের ভোটাররা আমাকে বিজয়ী করবেন বলে আমি দৃঢ়ভাবে আশাবাদী।
অন্যদিকে কালাম গ্রুপ নেতা পৌর মেয়র কালাম চৌধুরীর সহোদর সাবেক ছাত্রনেতা শামীম আহমদ চৌধুরী বলেন, বর্তমান সংসদ সদস্যের প্রতি মানুষের কোনো আস্থা নেই। বিগত সময় দলের সহযোগিতায় এলাকায় যে উন্নয়ন হয়েছে, এতে এমপির কোনো অবদান নেই। এলাকাবাসীর দাবির পরিপ্রেক্ষিতে তিনি এ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী। এবার তৃণমূলের দাবির প্রেক্ষিতে দলের হাইকমান্ড আমাকেই মূল্যায়ন করবে। তিনি বলেন, বর্তমান এমপির বিরুদ্ধে বড় অভিযোগ নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন না করা। এ ছাড়া দলীয় নেতাকর্মীদের মামলা দিয়ে হয়রানি, কাক্সিক্ষত উন্নয়ন না করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। 
ছাতক পৌরসভাসহ দুই উপজেলার ২২টি ইউনিয়ন নিয়ে সুনামগঞ্জ-৫ আসনে বিভক্তি রয়েছে বিএনপিতেও। শাসক দলের নেতাদের চোখ রাঙানি ছাড়াও স্থানীয় প্রশাসনের নানাবিধ চাপের মধ্যে এই বিভক্তি বেশ চাঙা। এর মধ্যে কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ও সুনামগঞ্জ জেলা বিএনপি সভাপতি কলিম উদ্দিন আহমদ মিলন ও বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী সদস্য ও সাবেক ছাতক উপজেলা চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান চৌধুরী মিজানকে ঘিরে এ বিভক্তি বা কোন্দল বিদ্যমান। কেন্দ্রীয় কর্মসূচিও পালিত হয় আলাদাভাবে। স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচনেও এর প্রভাব পড়েছে।

আগামী নির্বাচনের আগে কোন্দল নিরসনের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান তৃণমূলের। তারা বলছেন, নতুন প্রার্থী দিলে ধানের শীষের বিজয় নিশ্চিত। চার লাখ ১৬ হাজার ভোটার অধ্যুষিত এই আসনে বিএনপির তিনজন নেতা মাঠে সক্রিয়। এর মধ্যে রয়েছেন সুনামগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক এমপি কলিম উদ্দিন আহমদ মিলন, বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা ছাতক উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান চৌধুরী এবং জেলা বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার সৈয়দ মুনসিফ আলী।
জেলা বিএনপির সভাপতি কলিম উদ্দিন আহমদ মিলন বলেন, এই আসনে উন্নয়নের নামে ভাগবাটোয়ারা হয়েছে। এই এলাকার প্রায় প্রতিটি রাস্তা চলাচলের অনুপযোগী। নতুন রাস্তা তৈরি করা তো দূরের কথা, বিএনপি আমলের তৈরি রাস্তাগুলোও মেরামত করা হয়নি। যা হয়েছে সেখানেও লুটপাট করেছে সরকারের লুটেরা বাহিনী। বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, কয়েকদিন আগে দলের কোন্দল নিষ্পত্তি হয়ে গেছে। এখন কোনো কোন্দল নেই। আসন্ন নির্বাচনে মনোনয়ন চাইব।
বিএনপি নেতা মিজানুর রহমান চৌধুরী জানান, দীর্ঘদিন ধরে তৃণমূল পর্যায়ে গণসংযোগ, প্রচারের মাধ্যমে দলকে সংগঠিত করে যাচ্ছি। দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করে তিনি জানান, মানুষ যেমন সরকারের পরিবর্তন চায়, তেমনি বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীরা দলীয় মনোনয়নে পরিবর্তন চায়। পরিবর্তনের লক্ষ্য নিয়েই মাঠে আছি। 
ইঞ্জিনিয়ার সৈয়দ মুনসিফ আলী বলেন, দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় কাজ করছি। স্থানীয় নেতাকর্মীরা আমার সঙ্গে আছে। মনোনয়নের ব্যাপারে আমি আশাবাদী।
দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার আশায় রয়েছেন সুনামগঞ্জ জেলা জাতীয় পার্টির সাবেক সভাপতি ও সাবেক এমপি আবদুল মজিদের ছেলে নাজমুল হুদা হিমেল, জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় নির্বাহী সদস্য জাহাঙ্গীর আলম, সিলেট মহানগর জাতীয় পার্টির যুগ্ম সম্পাদক ও সাবেক ছাতক উপজেলা সভাপতি আবুল হাসান ও যুক্তরাজ্য জাপা নেতা রুহুল আমিন। সাবেক এমপি আবদুল মজিদের ছেলে হিমেল দাবি করেন এই আসনটিতে তার প্রয়াত বাবা জাতীয় পার্টির ঘাঁটি হিসেবেই পাকাপোক্ত করে গেছেন। নির্বাচন সামনে রেখে জাতীয় পার্টির এই নেতা তার প্রয়াত বাবার অসমাপ্ত কাজ সমাপ্তের কর্মপরিকল্পনা নিয়ে গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন পুরোদমে। তিনি জানান, দীর্ঘদিন ধরে দলকে শক্তিশালী করতে কাজ করে যাচ্ছি।

×