ঢাকা, বাংলাদেশ   বৃহস্পতিবার ১৮ এপ্রিল ২০২৪, ৪ বৈশাখ ১৪৩১

সৌদিতে মারা যাওয়া টঙ্গীর রনির শেষ কথা

বউ আমি পাহাড়ে উঠতাছি

নিজস্ব সংবাদদাতা, টঙ্গী

প্রকাশিত: ১৯:৩৯, ২৯ মার্চ ২০২৩

বউ আমি পাহাড়ে উঠতাছি

নিহত রনি

সৌদির মক্কায় মর্মান্তিক বাস দুর্ঘটনায় নিহত ২৪ ওমরা হজ্জ যাত্রীর মধ্যে ১০ বাংলাদেশীর একজন টঙ্গী দেওড়া মুদাফার বাসিন্দা ইমাম হোসেন রনি (৩৫)। সৌদির একটি হোটেলে গত ৬ বছর ধরে চাকুরি করতেন রনি। গত দেড় মাস আগে দেশে এসে বিয়ে করে গত শুক্রবার সৌদির কর্মস্থলে ফিরে যান। ওখান থেকে বন্ধু বান্ধব ও সহকর্মীদের সাথে সোমবার ওমরা হজ্জ পালন করতে মক্কায় যাবার পথে বাস উল্টে ২৪ যাত্রীর সঙ্গে নিহত হন রনি।

সৌদি সূত্র জানায়, সৌদির আকাবা শারে দুর্ঘটনাটি ঘটে সোমবার বিকালে। রুবা আল হিজাজ পরিবহন কোম্পানির বাসটি মক্কার উদ্দেশে রওনা দিয়ে দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। বাসে ৪৭ যাত্রীর মধ্যে বাংলাদেশী যাত্রী ছিলেন ৩৫ জন। গুরুতর আহত ১৮ বাংলাদেশীকে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারালে একটি সেতুর রেলিংয়ের সঙ্গে ধাক্কা লেগে উল্টে আগুন ধরে যায়। দরজা জানালা লক করা এসি বাসে যাত্রীরা বাস থেকে নামতে না পারায় হতাহতের এই ঘটনা ঘটে । স্থানীয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কনস্যুলেট প্রতিনিধিকে জানিয়েছেন, মৃতদেহ গুলো পুড়ে বিকৃত হয়ে গেছে।

টঙ্গী পশ্চিম থানার ওসি শাহ আলম নিহত ইমাম হোসেন রনির বাড়িতে গিয়ে তার স্বজনদের সাথে কথা বলেন। ওসি শাহ আলম জনকণ্ঠকে জানান, মরদেহ আসার পর সরকারি নির্দেশনা অনুসারে সব কাজ সম্পন্ন করা হবে।

এদিকে বুধবার সকালে নিহত ইমাম হোসেন রনির টঙ্গীর বড় দেওড়ার বাসায় গিয়ে দেখা যায়, ওই বাসার সবাই পার্শ্ববর্তী গ্রাম মুদাফা খলিল মার্কেট সংলগ্ন বড় বোন স্বপ্নার বাসায় চলে গেছেন। নিহত রনির বাবা ভাই বোন বউ সবাই অবস্থান করছেন বোনের বাড়িটিতে। পুরো বাড়ি জুড়ে শোকের মাতম। কথা হয় রনির বাবা আবদুল লতিফের সঙ্গে। 

তিনি জনকণ্ঠকে জানালেন, মঙ্গলবার তাঁর ছেলের মারা যাওয়ার খবর পান রনির বন্ধু বান্ধবদের মাধ্যমে। চাকরির সুবাদে কর্মস্থলের কারখানায় ছেলে টঙ্গী কাদেরিয়া স্কুলে পড়াশোনা করেছে। তিনি শুনেছেন, তাঁর ছেলে বাস দুর্ঘটনায় মারা গেছে, তিনি তার ছেলের লাশ দেশে এনে দাফন কাফন করতে চান। ছেলের মৃত্যু শোকে তিনি বার বার কান্নায় ভেঙে পড়ছেন। বড় বোন স্বপ্না বললেন, সরকারের সহযোগিতায় আমার ভাইয়ের লাশ ফেরত চাই। ছোট ভাইয়ের মর্মান্তিক মৃত্যুর কথা মনে করে বড় বোন হাজেরা খাতুন বারবার মুর্ছা যাচ্ছিলেন। 

নিহতের ছোটভাই হোসাইন আহমেদ জসিম জানান, চাঁদপুর জেলার ফরিদগঞ্জে তাদের গ্রামের বাড়ি। টঙ্গীর বড় দেওড়া এলাকায় বাড়ি করে পরিবারপরিজন নিয়ে বসবাস করে আসছিলেন। তিন ভাই, এক বোনের মধ্যে রনি দ্বিতীয়। লেখাপড়া শেষে রনি দেওড়া এলাকায় টেইলার্স ও মুদি দোকানের ব্যবসা করতেন। ব্যবসায় লোকসান হওয়ায় ভাগ্যবদলে পাড়ি জমান সৌদি আরব। আট বছর ধরে  সৌদি আরবে একটি কোম্পানিতে চাকরি করতেন রনি।

দুই মাস আগে ছুটি নিয়ে দেশে আসেন। ছুটি কাটিয়ে গত শনিবার (২৫ মার্চ) সৌদি আরবের উদ্দেশে দেশত্যাগ করেন রনি। আগামী ১ এপ্রিল তার কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার কথা ছিল। চাকরিতে যোগ দেওয়ার আগে হাতে সময় থাকায় ওমরাহ পালনের সিদ্ধান্ত নেন রনি।

গত ৭ ফেব্রুয়ারিতে বিয়ে করে দেড় মাসের মাথায় রনি আবার পাড়ি জমান কর্মস্থল সৌদিতে। বিয়ের উদ্দেশ্যে রনি দেশে এসেছিলেন। রনির স্ত্রীর নাম শিমু আক্তার। শিমুর বয়স ২২ এর কাছাকাছি। সৌদিতে মর্মান্তিক বাস দুর্ঘটনায় স্বামীর মৃত্যুর খবর শুনে স্ত্রী সেই যে কান্না শুরু হয়েছেন, তা এখনো থামছে না। আত্মীয় স্বজন পাড়াপড়শিদের জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে বার বার কান্নায় ভেঙে পড়ছেন শিমু। 

শিমুর কান্নায় কাঁদছে শিমুর বাসায় আসা মানুষজনেরাও। সদ্য বিবাহিত প্রিয়তমা স্বামীর এমন মৃত্যু সংবাদে পুরো আকাশ যেন শিমুর মাথায় ভেঙে পড়েছে। স্বামী রনির সঙ্গে দেড় মাসের আদর ভালবাসার সংসারের কোন স্মৃতিই ভুলতে পারছেন না স্ত্রী শিমু। মনপ্রাণ দিয়ে ভালবাসার মানুষটা এমন করে চলে যাবেন তা ভাবতে পারছেন না একটুও। ৪৮ দিন স্বামীর সঙ্গে মধুমাখা সংসারের স্মৃতির কথা তুলে ধরে স্ত্রী শিমু জনকণ্ঠকে বলতে লাগলেন, আমার স্বামী আমার কাছে বেহেশত সম ছিলেন, মানুষটি কোন কষ্ট দেয়নি আমাকে, ৪৮ দিন আমি ওকে সারাটা সময় আগলে রেখেছি, রনিকে ছাড়া একবেলা ভাত খাইনি আমি, আমার জন্য ও কখনো বাইরে খেতোনা, রনি আমাকে আদর করে বলতো জানো বউ, বিদেশ থেকে রোজগার করে তোমাকে আমি রাণী বানাবো। 

গত ২৫ মার্চ সৌদি চলে যাবার সময় বিমানে উঠেও রনি ফোন দিয়ে বলেছে, লক্ষীসোনা আমার, বউ আমার, আমি বিদেশে পুনরায় যেতে চাইনি তোমাকে ছেড়ে, তোমার আমার ভালো ভবিষ্যৎ গড়তে, সুন্দর করতে আমার আবার বিদেশ যাওয়া, রনি আরো বলেছে, আমি যেন ওকে বার বার ফোন দেই, ভালবাসায় বিরক্ত করি বার বার, ফোন দিলে ও কখনো বিরক্ত হবে না, সেই আমার রনিটা আজ বেঁচে নেই, আমি কি নিয়ে বাঁচবো? রনি ফেরেশতার মতো একজন মানুষ ছিল। রনিকে পেয়ে দুনিয়াতেই আমি বেহেশত পেয়েছিলাম। 

স্ত্রী শিমু আরো বলতে লাগলেন, আমার রনিটার সাথে শেষ কথা হয়, যখন ওমরা হজ্জ করতে বাসে করে মক্কার দিকে যাচ্ছিল। চলন্ত বাস পাহাড়ের উপরে যখন উঠছিল তখন আমার রনিটা আমাকে ফোন করে বলছিল, "বউ আমার জন্য দোয়া কইরো, আমি পাহাড়ে উঠতাছি"
 

এমএস

×