ঢাকা, বাংলাদেশ   রোববার ০২ অক্টোবর ২০২২, ১৭ আশ্বিন ১৪২৯

গার্ডার দুর্ঘটনা : 

চিরনিদ্রায় শায়িত নিহত দুই বোন ও দুই শিশু 

নিজস্ব সংবাদদাতা, জামালপুর

প্রকাশিত: ২১:৪৭, ১৭ আগস্ট ২০২২

চিরনিদ্রায় শায়িত নিহত দুই বোন ও দুই শিশু 

গার্ডার দুর্ঘটনা নিহত দুই বোন ও দুই শিশু দাফন সম্পন্ন

ঢাকার উত্তরায় বিআরটি প্রকল্পের গার্ডার চাপায় নিহত প্রাইভেট কারের যাত্রী সহোদর বোন ফাহিমা আক্তার (৪০), ঝর্ণা আক্তার (২৮) ও ঝর্না আক্তারের দুই শিশু সন্তানের মরদেহ সমাহিত করা হয়েছে। 

মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে তাদের মরদেহ জামালপুরের মেলান্দহ ও ইসলামপুর উপজেলায় তাদের নিজ নিজ বাড়িতে নেয়া হলে পরিবারের স্বজনা কান্নায় মুর্ছা যান। উপযুক্ত ক্ষতিপূরণসহ ঘটনাস্থলের ওই প্রকল্পের কর্মকর্তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন নিহতের স্বজনরা। 

স্থানীয় সূত্র জানায়, রাত ১২টার দিকে ফাহিমা আক্তারের মরদেহ জামালপুরের ইসলামপুরের ঢেঙ্গারগড় গ্রামে তাদের পারিবারিক কবরস্থানে সমাহিত করা হয়। 

অপরদিকে ঝর্না ও তার দুই শিশু সন্তানের মরদেহ ঝর্নার শ্বশুরবাড়ি জামালপুরের মেলান্দহের পয়লা গ্রামে পারিবারিক কবরস্থানে সমাহিত করা হয়। ফাহিমার মেয়ে রিয়া মনির বৌভাতের অনুষ্ঠান শেষে একটি প্রাইভেট কারে ঢাকার আশুলিয়ায় ভাড়াবাসায় ফেরার পথে সোমবার বিকেলে ঢাকার উত্তরায় বিআরটির একটি গার্ডার প্রাইভেট কারটিকে চাপা দিলে ঘটনাস্থলেই তারা নিহত হন। 

ওই প্রাইভেট কারের চালক ফাহিমার মেয়ে রিয়া মনির শ্বশুর আইউব হোসেন রুবেলও নিহত হন। আরো দুইযাত্রী ফাহিমার মেয়ে রিয়া মনি ও মেয়ের স্বামী রেজাউল করিম হৃদয় প্রাণে বেঁচে যান। মঙ্গলবার রাতে রিয়া মনির শ্বশুর আইউব হোসেন রুবেলের মরদেহও তার গ্রামের বাড়ি মেহেরপুরে সমাহিত করা হয়েছে।    

পরিবারের স্বজনরা জানান, মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্সে করে ফাহিমার মরদেহ তার বাবার বাড়ি জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলার ঢেঙ্গারগড় গ্রামে নেয়া হয়। একই সময়ে ঝর্ণা ও তার দুই শিশু সন্তান জান্নাত (৬) ও জাকারিয়ার (৩) মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় ঝর্নার শ্বশুরবাড়ি জামালপুরের মেলান্দহ উপজেলার পয়লা গ্রামে। 

এ সময় অ্যাম্বুলেন্স থেকে তাদের মরদেহ নামানো হলে স্বজনরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। মরদেহ দেখতে প্রতিবেশীরাও ভিড় করেন তাদের বাড়িতে। পরে রাত ১২ টা থেকে একটার মধ্যে তাদেরকে পারিবারিক কবরস্থানে সমাহিত করা হয়। 

নিহতদের স্বজনদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলার পাথর্শী ইউনিয়নের ঢেঙ্গারগড় গ্রামে মধ্যবিত্ত কৃষক রশিদুল হক বাট্টুর মেয়ে ফাহিমা ও ঝর্ণা। এই দুই মেয়েসহসহ পাঁচ সন্তান এবং স্ত্রী আকলিমাকে নিয়ে রশিদুল হক দীর্ঘদিন ধরে ঢাকার আশুলিয়ার খেজুর বাগান এলাকায় ভাড়াবাসায় থেকে জীবিকা নির্বাহ করেন। 

ফাহিমা তার একমাত্র কন্যা রিয়া মনিকে নিয়ে আশুলিয়ার খেজুর বাগান এলাকায় আলাদা বাসা ভাড়া নিয়ে পোশাক কারখানায় কাজ শুরু করেন। রিয়া মনিও একটি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন। শনিবার আশুলিয়া খেজুর বাগান এলাকার ভাড়া বাসায় রিয়ামনির বিয়ের অনুষ্ঠান ছিল। 

অপর মেয়ে ঝর্ণা আক্তারের শ্বশুরবাড়ি জামালপুরের মেলান্দহ উপজেলার মাহমুদপুর ইউনিয়নের পয়লা গ্রামে। ঝর্নার স্বামী জাহিদুল ইসলাম গত বৃহস্পতিবার তার স্ত্রী ঝর্না, দুই সন্তান জান্নাত (৬) ও জাকারিয়াকে (৩) নিয়ে রিয়া মনির বিয়ের দাওয়াতে যান। 

শনিবার বিয়ের অনুষ্ঠান শেষে পরদিন জাহিদুল স্ত্রী ও দুই সন্তানকে রেখে মেলান্দহের বাড়িতে চলে আসেন। ফাহিমা তার বোন ঝর্না ও তার দুই শিশু সন্তান নিয়ে শনিবার ঢাকার খিলখেত এলাকায় রিয়ামনির বৌভাত অনুষ্ঠানে যোগ দেন। 
সোমবার দুপুরে রিয়া মনি ও তার স্বামী রেজাউল করিম হৃদয়সহ পরিবারের সবাই ফের আশুলিয়ায় রিয়া মনিদের বাসায় ফিরছিলেন। নবদম্পতিসহ একটি প্রাইভেট কারে ফিরছিলেন ফাহিমা, ঝর্না ও তার দুই শিশু সন্তান। পরিবারের অন্যরা বাসে রওনা হন। 

পথে ঢাকার উত্তরা এলাকায় বিআরটির গার্ডার প্রাইভেট কারটিকে চাপা দিলে নবদম্পতি প্রাণে বেঁচে গেলেও প্রাইভেট কারের বাকি পাঁচজন যাত্রী ঘটনাস্থলেই নিহত হন। 

এদিকে স্ত্রী ঝর্ণা আক্তার ও দুই সন্তানের মৃত্যুতে জাহিদুল ইসলাম শোকে পাথর হয়ে গেছেন। তার মাথায় যেন বাজ পড়েছে। স্ত্রী সন্তানের মৃত্যুশোকে কান্নাকাটি করছেন। জাহিদুল ইসলাম বলেন, আমার কপালে কি এটাই লেখা ছিল। আমি রিয়া মনির বিয়ের দাওয়াত খেয়ে যদি স্ত্রী-সন্তানদের সাথে করে নিয়ে আসতাম তাইলে হয়তো এ ঘটনার শিকার হইতো তারা। 

উত্তরার ওই কোম্পানির গাফিলতির কারণেই আমি আমার স্ত্রী-সন্তান নিহত হয়েছে। আবার স্ত্রীর বোন ফাহিমাও নিহত হয়েছে। আমি এ ঘটনার বিচার চাই। আমি ক্ষতিপূরণ চাই। অপরদিকে নিহত ফাহিমা ও ঝর্নার বাবা রশিদুল হক বাট্টু বলেন, আমার আদরের দুই মেয়ে আর দুই নাতি-নাতনিকে হত্যা করা হয়েছে। আমার সব কিছু শেষ গেছে। 

বাংলাদেশ সরকারের কাছে আমি এ হত্যার বিচার চাই। প্রতিবেশী আব্দুল মান্নান বলেন, আমরা ভিডিওতে দুর্ঘটনার চিত্র দেখেছি। এতে গাড়ি চালকের কোন দোষ নাই। হাজার হাজার গাড়ি ওই রাস্তা দিয়ে চলাচল করছে। যাদের গাফিলতির কারণে এমন দুর্ঘটনা ঘটলো এবং একই পরিবারের এতজনের প্রাণ গেল তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিসহ নিহতদের পরিবারকে যেন ক্ষতিপূরণ দেন সরকার।