৭ এপ্রিল ২০২০, ২৪ চৈত্র ১৪২৬, মঙ্গলবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
 
সর্বশেষ

এসডিজি অর্জনে শতভাগ নিরাপদ পানি নিশ্চিতের উদ্যোগ

প্রকাশিত : ২০ ফেব্রুয়ারী ২০২০
  • ৬ লাখ গভীর-অগভীর নলকূপ বসাবে সরকার

ওয়াজেদ হীরা ॥ শহর থেকে গ্রামে পৌঁছাতে হবে শতভাগ নিরাপদ সুপেয় পানি। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের জন্য ২০৩০ সালের মধ্যে দেশে শতভাগ নিরাপদ সুপেয় পানি নিশ্চিত করতে হবে। যেখানে এখনো শহর অঞ্চলে ফুটিয়ে পানযোগ্য করা হয় পানি। নিরাপদ সুপেয় পানি সরবরাহ করা চ্যালেঞ্জিং হলেও কাজ করছে সরকার। নেয়া হচ্ছে নানা উদ্যোগও। সরকারের এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে নির্দিষ্ট সময়ে সুপেয় পানি পাওয়ার আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

জানা গেছে, শহরের মানুষের চেয়ে নিরাপদ পানির ক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে আছে গ্রামীণ জনপদ। তাই শহরের অন্যান্য কার্যক্রমের সঙ্গে সারাদেশে গ্রামীণ জনপদে শতভাগ নিরাপদ পানি নিশ্চিতের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। নিরাপদ সুপেয় পানি নিশ্চিতে সারা দেশে বসবে প্রায় ৬ লাখ গভীর-অগভীর নলকূপ। এজন্য প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ‘জাতীয় নিরাপদ পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন নীতিমালা-১৯৯৮’ অনুযায়ী দেশের পুরো পল্লী এলাকায় প্রয়োজনীয় নিরাপদ পানি সরবরাহ বাড়বে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সূত্রে এমন তথ্য জানা গেছে।

বিশ্বব্যাংক, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং ইউনিসেফের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের ৯৮ ভাগ মানুষের আওতার মধ্যে পানির কোন-না-কোন উৎস থাকলেও এর সবটাই পানযোগ্য নয়। নিরাপদ বা সুপেয় পানি পাচ্ছে শতকরা ৮৭ ভাগ মানুষ। ফলে এখনও ১৩ ভাগ মানুষ সুপেয় পানি পাচ্ছে না। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে ২০৩০ সালের মধ্যে পানির ৪টি দিক নিশ্চিত করতে হবে। সেগুলো হলো প্রাপ্যতা, প্রবেশগম্যতা, গুণগত মান এবং পানি পাওয়ার আর্থিক সক্ষমতা। নিরাপদ পানির জন্য এখন সরকারী ও বেসরকারী মিলিয়ে প্রায় ২০০ প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। গ্রামাঞ্চলে নলকূপ পানির একটি বড় উৎস। কিন্তু তাতে আর্সেনিক সমস্যা আছে।

দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর মধ্যে নিরাপদ খাবার পানি ব্যবহারে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে ভুটান এবং তারপরেই মালদ্বীপ ও শ্রীলঙ্কার অবস্থান। বাংলাদেশ নিরাপদ খাবার পানির শতভাগ প্রাপ্যতা নিশ্চিত করার জন্য কাজ করে যাচ্ছে।

সবার জন্য সুপেয় নিরাপদ পানি সরবরাহ করতেই সম্প্রতি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে ‘সমগ্র দেশে নিরাপদ পানি সরবরাহ’ শীর্ষক প্রকল্পটি অনুমোদন দেয়া হয়। সুপেয় পানির আওতার বাইরে থাকা বাকি ১৩ শতাংশ মানুষকে নিরাপদ পানির সুবিধা দিতে নতুন এই প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ৮ হাজার ৮৫০ কোটি ৭৩ লাখ ৮৭ হাজার টাকা। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে শুরু হয়ে প্রকল্পের কাজ শেষ হবে ২০২৫ সালের ৩০ জুন। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে পুরো ব্যয় নির্বাহ হবে সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগের আওতায় জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতর প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে।

এ প্রসঙ্গে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, সবার জন্য নিরাপদ ও সুপেয় পানি সরবরাহ, স্যানিটারি ল্যাট্রিন সুবিধাভোগী নগরবাসীর অনুপাত ১০০ ভাগে বাড়ানো এই প্রকল্প। এর আওতায় সারাদেশে নলকূপ ও পানির উৎস নির্মাণ করা হবে। বর্তমানে একটি পানির উৎস ব্যবহার করে ৮৮ জন। সেটি কমিয়ে ৫৫ জনে নামাতে হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে সারা দেশের গ্রামীণ এলাকায় নিরাপদ পানি সরবরাহ নিশ্চিত সম্ভব হবে। এতে সমগ্র দেশে নিরাপদ পানি সরবরাহ বৃদ্ধির মাধ্যমে জনগণের স্বাস্থ্য ও জীবনমান উন্নয়ন হবে বলেও মনে করেন পরিকল্পনামন্ত্রী।

পরিকল্পনামন্ত্রী আরও বলেছেন, ছোটবেলায় কলেরায় আমার বোনও মারা গিয়েছিল। তখন বিশুদ্ধ পানির প্রচ- অভাব ছিল। এখন পরিস্থিতি সেই রকম নেই। তারপরও আরও বেশি ভাল পানি সরবরাহে প্রকল্পটি অনুমোদন দেয়া হয়েছে। গ্রাম হবে শহর। শহরে যেমন কল ঘুরালেই পানি পাওয়া যায়, তেমনি এ প্রকল্পের মাধ্যমে গ্রামে পানি সরবরাহ করা হবে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পটি ২০১৯-২০ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচীতে (এডিপি) বরাদ্দবিহীন অননুমোদিত নতুন প্রকল্প তালিকায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

গত ২০১৮ সালের অক্টোবরে নিরাপদ পানি নিয়ে বিশ্বব্যাংকের এক গবেষণায় বলা হয়, পাইপলাইনের পানির ৮০ ভাগেই ই-কোলাই ব্যাকটেরিয়া রয়েছে। পুকুরের পানিতেও একই মাত্রায় এই ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। ৩৮ শতাংশ টিউবওয়লের পানিতেও এই ক্ষতকির অনুজীবের অস্তিত্ব মিলেছে। পাকস্থলী ও অন্ত্রের প্রদাহের জন্য ই-কোলাই ব্যাকটেরিয়াকে দায়ী করা হয়। এ জন্য যথাযথ স্যানিটেশন সুবিধা না থাকাও একটি বড় কারণ। ঢাকায় মাত্র ২০ ভাগ স্যুয়ারেজ পাইপলাইন রয়েছে, বাকিটা খোলা। আবার সারাদেশে পয়ঃবর্জ্যরে মাত্র ২ ভাগ ট্রিটমেন্ট করা হয়? বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে বাকি বর্জ্য মূলত পানিতেই মিশে যাচ্ছে। এছাড়া দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততার কারণেও পানি পানের অযোগ্য হচ্ছে। এদিকে, ঢাকাবাসীর জন্য পাইপ লাইনে ওয়াসা যে পানি সরবরাহ করে তারমধ্যে ৭৫ শতাংশ ভূগর্ভস্থ, বাকি পানি আসে ভূ-উপরিস্থ উৎস থেকে। ফলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তরও নিচে নেমে যাচ্ছে। যা অদূর ভবিষ্যতে ঢাকায় পানির বড় সঙ্কট তৈরি করবে বলে আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের। যদিও ২০২১ সালের মধ্যে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার ২৫ ভাগের নামিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে ওয়াসার। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) ‘ঢাকা ওয়াসা: সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয় ঢাকায় ৯৩ শতাংশ গ্রাহক বিভিন্ন পদ্ধতিতে সংস্থাটির পানি পানের উপযোগী করে। এর মধ্যে ৯১ শতাংশ গ্রাহকই পানি ফুটিয়ে বা সিদ্ধ করে পান করেন। পানি পানের উপযোগী করতে প্রতিবছর আনুমানিক ৩৩২ কোটি টাকার গ্যাসের অপচয় হয় বলেও প্রতিবেদনে বলা হয়। বাংলাদেশে ২৪ হাজার কিলোমিটার নদী আছে। এর বাইরে সুপেয় পানির উৎস হিসেবে পুকুর, নলকূপের মাধ্যমে ভূগর্ভ থেকে পানি সংগ্রহ করা হয়। কিছু কিছু জায়গায় স্বল্পমাত্রায় বৃষ্টির পানি ব্যবহার হয়।

প্রকাশিত : ২০ ফেব্রুয়ারী ২০২০

২০/০২/২০২০ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

শেষের পাতা



শীর্ষ সংবাদ: