২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২০, ১৫ ফাল্গুন ১৪২৬, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
 
সর্বশেষ

নদী দখলমুক্ত হবেই

প্রকাশিত : ১৪ ফেব্রুয়ারী ২০২০
নদী দখলমুক্ত হবেই
  • ডেল্টা প্ল্যান বাস্তবায়নে জিরো টলারেন্স
  • সারাদেশে একযোগে অভিযান শুরু করার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে রাজধানীর আশপাশের বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, তুরাগ ও চট্টগ্রামের কর্ণফুলীসহ অন্যান্য নদী দখল ও দূষণমুক্ত এবং নাব্য ফিরিয়ে আনতে মাস্টারপ্ল্যান
  • নদীভিত্তিক উন্নয়নেরও মহাপরিকল্পনা

শাহীন রহমান ॥ ডেল্টা প্ল্যান বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে সারাদেশে নদী, খাল ও জলাশয় রক্ষায় জিরো টলারেন্স নীতি নেয়া হয়েছে। আটঘাট বেঁধে শুরু হচ্ছে উচ্ছেদ অভিযান। রাজধানীর নদী ও খাল উদ্ধারে ইতোমধ্যে একযোগে অভিযানও চালানো হচ্ছে। ঢাকার বাইরে নদী, খাল রক্ষায়ও একযোগে অভিযান শুরু করার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। রাজধানীর আশপাশের বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, তুরাগ ও চট্টগ্রামের কর্ণফুলীসহ অন্যান্য নদী দখল- দূষণমুক্ত ও নাব্য ফিরিয়ে আনতে আগেই তৈরি করা হয়েছে একটি মাস্টারপ্ল্যান। মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে নদী খাল জলাশয় উদ্ধারে নদীভিত্তিক উন্নয়নেরও মহাপরিকল্পনা নেয়া হয়েছে।

পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব কবির বিন আনোয়ার বলেছেন, সারাদেশে দখল হয়ে যাওয়া নদীখালের পরিমাণ নির্ণয় করেই এই অভিযান পরিচালনা করা হবে। দেশের ৬৪ জেলার ছোট নদী, খাল ও জলাশয় পুনর্দখল প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। সারাদেশে একযোগে নদী-খাল-বিলের দখলকৃত জায়গা উদ্ধারে একযোগে অভিযান শুরু হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নদী-খাল দখলমুক্ত করতে বারবার নির্দেশনা দিয়েছেন। আমরা প্রত্যেকটি আরএস, সিএস ধরে ধরে প্রত্যেক জেলায় কোথায় কোথায় আমাদের নদী-খাল দখল করা আছে সেটি নিরূপণ করেছি। পানি আইন ২০১৩ অনুযায়ী যেসব নদী-নালা, খাল-বিল বেদখল হয়ে গেছে সেগুলো উদ্ধার এবং খনন কাজ হাতে নিয়েছি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনায় একটি ঐতিহাসিক দলিল হলো ডেল্টা প্ল্যান ২১০০। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ২০১৮ সালে একনেকের বৈঠকে একশ’ বছরের উন্নয়ন পরিকল্পনায় ডেল্টা বা বদ্বীপ পরিকল্পনা পাস করা হয়েছে। এর আলোকে প্রাথমিকভাবে একটি উন্নয়ন পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রযুক্তিগত, কারিগরি ও আর্থসামাজিক দলিল এই পরিকল্পনা। এই পরিকল্পনার মধ্যে বন্যার ঝুঁকি কমাতে নদী ও পানিপ্রবাহের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ রাখা; পানিপ্রবাহের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি নদীগুলো স্থিতিশীল রাখার কথা বলা হয়েছে। পর্যাপ্ত পরিমাণ ও মানসম্মত স্বাদু পানি সরবরাহ করার ব্যবস্থা রাখা, নদীগুলোর পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় রাখা, নদীগুলোতে নিরাপদ নৌপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা, হাওড় ও আকস্মিক বন্যাপ্রবণ এলাকায় পানির সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে টেকসই জীবন-জীবিকা নিশ্চিতের জন্য এই পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সারাদেশে নদী খাল জলাশয় উদ্ধারের মহাপরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। গত বছর থেকে ঢাকার চারপাশে নদীর দখল উচ্ছেদ কার্যক্রম শুরু হয়। দ্বিতীয় ধাপে ফেব্রুয়ারি থেকে আবারও শুরু হয়েছে এই অভিযান। গত বছর তিন দফায় বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা নদী তীরে অবৈধ উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়। এবার নদী উচ্ছেদের পাশাপাশি ঢাকার খালগুলো উদ্ধারে একযোগে অভিযান শুরু করার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। পানিসম্পদ সচিব কবির বিন আনোয়ার গত সোমবার বলেন, এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে প্রথম পর্যায়ে ঢাকা মহানগরীর রামচন্দ্রপুর খালের অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ঢাকা জেলা প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা কমিটির মাধ্যমে এই উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। সারাদেশে ৪৪ হাজার হেক্টর জমি দখলে রয়েছে। ৬৪ জেলায় একসঙ্গে ৪৬৮টি নদী উদ্ধার ও খননের কাজ এগিয়ে চলেছে। ক্রমান্বয়ে সেগুলো উদ্ধার করব। শুধু যে দখল উচ্ছেদ করব তাই নয়, পাশাপাশি খনন করে এর পানি প্রবাহ ঠিক করা এবং যে প্রাকৃতিক ভারসাম্য বিনষ্ট হয়েছে সেটি ফিরিয়ে আনতেও একসঙ্গে কাজ করা হবে বলে তিনি জানান।

গত বছরর ফেব্রুয়ারি মাসে রাজধানীর আশপাশের বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, তুরাগ ও চট্টগ্রামের কর্ণফুলীসহ অন্য নদী দখল ও দূষণমুক্ত এবং নাব্য ফিরিয়ে আনতে ১০ বছরের একটি মাস্টারপ্ল্যানের খসড়া চূড়ান্ত করা হয়। খসড়া চূড়ান্ত করার পর স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়, দীর্ঘদিন পর্যন্ত নদী সঠিকভাবে সংরক্ষণ না করার কারণে অনেক দূষণ ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ সকল নদী উদ্ধারের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে নদীগুলো নিয়ে একটি মাস্টারপ্ল্যান করার জন্য কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই মাস্টারপ্ল্যানের অংশ হিসেবে চট্টগ্রামের কর্ণফুলীসহ ঢাকার চারপাশের নদীগুলোর দূষণরোধ ও নাব্য বৃদ্ধির জন্যও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে সরকার।

এতে আরও উল্লেখ করা হয়, নদী দূষণমুক্ত করে যাতে সঠিকভাবে ব্যবহার করা যায় ও স্যুয়ারেজ সিস্টেম, ওয়েস্টেজ ম্যানেজমেন্টÑ এগুলোর জন্য কাজ করা হয়Ñ এ জন্য মাস্টারপ্ল্যান করা হয়েছে। এর মধ্যে পানি দূষণমুক্ত করা, গৃহস্থালির বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় নিয়ে আসার জন্য বলা হয়েছে। আরবান এলাকায় যে সব বর্জ্য আছে সেগুলো শতভাগ যেন ডিসপোজ করা যায় তার উদ্যোগ নেয়া হবে। এসব পরিকল্পনা পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করতে পারলে নদীর পাশাপাশি পরিবেশেরও উন্নয়ন হবে।

এই মাস্টারপ্ল্যানে যে সব ড্রেনেজ বর্জ্য আছে সেগুলো ক্রাশ করার ব্যবস্থা করা হয়েছে। নদীর পাড়ের যেসব জায়গা দখল এবং বর্জ্য নদীতে ফেলা হচ্ছে ও নদীদূষণ হচ্ছে সেগুলো দখলমুক্ত করে দৃষ্টিনন্দন ও সবুজায়ন করার পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। নদীর নাব্য বৃদ্ধির জন্য কর্মসূচী নেয়া হয়েছে। বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, কর্ণফুলী, শীতলক্ষ্যা নদীর নাব্য বৃদ্ধি ও দূষণমুক্ত করার জন্য ১০ বছরের কর্মসূচী হাতে নেয়া হয়েছে। এক বছর, তিন বছর, পাঁচ বছর ও ১০ বছরের পর্যায়ে ভাগ করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন সরকারের নদী উদ্ধারের এ সব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা গেলে নদীগুলোর নাব্য অনেকাংশে ফিরে আসবে।

সরকারের নেয়া নদী উদ্ধারে মহাপরিকল্পনার অংশ হিসেবে গত বছরের পর এ বছরও শুরু হয়েছে নদী ও খাল উচ্ছেদের অভিযান। গত কয়েক দিন ধরে গাজীপুরের টঙ্গী এলাকায় তুরাগ তীরে অভিযান চালাচ্ছে বিআইডব্লিউটিএ। বুধবার সেখানে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। অভিযান পরিদর্শনে গিয়ে বিআইডব্লিউটিএ ও নৌ মন্ত্রণালয় কর্মকর্তারা জানান, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের পাশাপাশি স্যুয়ারেজ লাইনের মুখে ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট স্থাপনের মাধ্যমে ঢাকার চার পাশে নদীর দূষণ রোধেও কাজ শুরু করা হবে।

ঢাকার চার পাশের নদী তীর রক্ষা প্রকল্পের পরিচালক নুরুল আলম বলেন, এই প্ল্যান্টের মাধ্যমে আমরা পানি মোটামুটি দূষণমুক্ত করার চেষ্টা করব। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব আবদুস সামাদ বলেন, একবার উচ্ছেদ ও ময়লা আবর্জনা অপসারণের পর কেউ নতুন করে নদীতে ময়লা ফেললে তার জেল-জরিমানা হবে।

ঢাকার চার নদীর মতো ঢাকার প্রাণ বুড়িগঙ্গা রক্ষায় নেয়া হয়েছে মহাপরিকল্পনা। উচ্ছেদ অভিযান শেষে এই নদীভিত্তিক এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে বলে জানান বিআ্ইডব্লিউটিএর যুগ্মপরিচালক একেএম আরিফ উদ্দিন। এর আগে তিনি জনকণ্ঠকে বলেন, নদীর দুই ধার দিয়ে ৫০ কিলোমিটার ওয়াকওয়ে নির্মাণ করা হবে। ওয়াকওয়ে নির্মাণের জন্য নক্সা প্রণয়নের কাজ শুরু হয়েছে। এছাড়াও ওয়াকওয়ে নির্মাণের পাশাপাশি জাহাজের পণ্য ওঠা-নামানোর জন্য জেটি নির্মাণ করা হবে। বালু ব্যবসায়ীরা যাতে নদী থেকে অবৈধ বালু উত্তোলন করতে না পারে এবং অবৈধভাবে ব্যবসা করতে না পারে এ কারণেই জেটি নির্মাণ করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

নদী রক্ষণাবেক্ষণের পাশাপাশি ঢাকাসহ সারাদেশে খাল উদ্ধারে শুরু হচ্ছে একযোগে অভিযান। ইতোমধ্যে ঢাকার খাল উদ্ধারেও অভিযান শুরু করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। গত সোমবার থেকে রাজধানীর রামচন্দ্রপুর খাল এলাকায় অভিযান চালানো হয়। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব এ সময় সাংবাদিকদের বলেন, অবৈধ দখলদারদের কারণে রামচন্দ্রপুর খাল রীতিমতো ভরাট হয়ে গেছে। বিভিন্ন স্থাপনা তৈরি হয়েছে, যার সবই উচ্ছেদ করব। সুপ্রীমকোর্টের আপীল বিভাগ থেকে আগেই নির্দেশনা রয়েছে সিএস খতিয়ান ধরে আমাদের উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করতে হবে। অভিযান চালাতে গিয়ে কতগুলো বিষয় আমরা নজর রাখছি যেমন, আমরা চেষ্টা করছি যেখানে হতদরিদ্র মানুষ থাকে, নদীর বাঁধ ভাঙ্গা মানুষ থাকে তাদের জন্য পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করে তারপর উচ্ছেদ করা। স্কুল-কলেজ বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান যেমন মসজিদ, মাদ্রাসা, মন্দির থাকলে সেগুলো অন্যত্র স্থানান্তর করা হবে। নদী-খাল উদ্ধারে সরকারের ১০০ বছরের ডেল্টা প্ল্যানের অংশ হিসেবে এই অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে নদীর পাড়ে ওয়াকওয়ে নির্মাণ, ছোট ছোট পার্ক নির্মাণ, বৃক্ষরোপণসহ নানা কর্মসূচী হাতে নিয়েছে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন শুষ্ক মৌসুমে পর্যাপ্ত পানি বা প্রবাহ না থাকায় বিলীন হওয়ার পথে দেশের এক-তৃতীয়াংশ নদী। বর্ষাকালে প্রবাহমান থাকা অর্ধেকের বেশি নদীতে শুষ্ক মৌসুমে পানি থাকে না। সারা বছরই চলে চাষাবাদ। বর্ষাকাল ছাড়া অন্য সময়ে এগুলোকে আর নদী বলে মনে হয় না। আবার অনেক নদী বিলুপ্ত হয়ে কালের সাক্ষী হয়ে গেছে। মৃত্যুর প্রহরও গুনছে অনেক নদী। যে নদীগুলোকে কেন্দ্র করে রাজধানীর গোড়াপত্তন হয়েছিল সেই বুড়িগঙ্গাসহ এর চারপাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া তুরাগ, বালু, শীতলক্ষ্যা এবং ধলেশ্বরী নদী দখল দূষণে করুণ অবস্থার শিকার। এগুলোর অস্তিত্বও হুমকির মুখে রয়েছে। দেশের মধ্যে থাকা নদীগুলোতে চলছে সীমাহীন দখল উৎসব। তারা বলছেন মানুষ তার লোভ বা মুনাফার কারণে শুধু নদীর গতিপথই বদলে দিচ্ছে না। আঘাত করছে নদীগুলোর প্রাণবৈচিত্র্যের ওপর। বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বংশী, বালু, লৌহজং এবং শীতলক্ষ্যা নদীর দুধারে গড়ে ওঠা শিল্প কারখানার অপরিশোধিত বর্জ্য গিয়ে পড়ছে এসব নদীতে। ফলে বিষক্রিয়ায় এসব নদী প্রাণহীন হয়ে পড়েছে। তারা বলেন, নদীর পানির উৎসমুখ বন্ধ করে, ভরাট করে, দখল করে নদীকে মেরে ফেলা হয়েছে।

প্রকাশিত : ১৪ ফেব্রুয়ারী ২০২০

১৪/০২/২০২০ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



শীর্ষ সংবাদ: