১৮ ফেব্রুয়ারী ২০২০, ৬ ফাল্গুন ১৪২৬, মঙ্গলবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
 
সর্বশেষ

বস্তিতে বারবার আগুন লাগে কেন, বহির্বিশ্বে নেতিবাচক বার্তা

প্রকাশিত : ২৬ জানুয়ারী ২০২০
  • পবা ও বারসিকের সেমিনারে কমিশন গঠনসহ ১২ দফা দাবি

স্টাফ রিপোর্টার ॥ দেশের বিভিন্ন বস্তিতে প্রায়ই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে। বিশেষ করে অগ্নিকা-ের ঘটনা। সর্বশেষ ঢাকার রূপনগরের চলন্তিকা বস্তি ভয়াবহ আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। তিন শতাধিক টং ঘর হয়েছে ভস্মীভূত। দগ্ধ হয়ে মারা গেছে পারভীন নামে এক নারী। ঢাকার বস্তিগুলোয় বছরে গড়ে অন্তত দুবার করে বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে। এতে আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি প্রাণহাণির ঘটনাও ঘটে। বস্তিতে লাখ লাখ মানুষের বসবাস। এসব দুর্ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতিসহ প্রাণহানির ঘটনা বহির্বিশ্বে দেশের উন্নয়ন সম্পর্কে নেতিবাচক বার্তা দিচ্ছে।

গত ২৪ জানুয়ারি ঢাকার রূপনগরে চলন্তিকা বস্তিতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে তিন শতাধিক ঘর পুড়ে যায়। ফায়ার সার্ভিসের পনেরোটি ইউনিট টানা আড়াই ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। ভয়াবহ আগুনে দগ্ধ নারী গৃহকর্মী পারভীন আক্তার (৩৫) শনিবার সকাল সাতটার দিকে ঢাকা মেডিক্যালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়। শহিদুল নামের বস্তির আরেক বাসিন্দা ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন। ঘটনা তদন্তে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি কাজ করছে।

গত বছরের ১৬ আগস্ট চলন্তিকা বস্তিতে ভয়াবহ অগ্নিকা-ের ঘটনা ঘটেছিল। সে সময় আগুনে অন্তত এক হাজার ঘর পুড়ে যায়।

এ ঘটনার পর গত বছরের ২২ আগস্ট জাতীয় প্রেসক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা) ও বেসরকারী গবেষণা প্রতিষ্ঠান বারসিকের উদ্যোগে আয়োজিত এক সংলাপে বক্তারা বস্তিতে আগুন লাগে, না লাগিয়ে দেয়া হয়, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তারা বস্তিতে বারবার কেন আগুন লাগে তা খতিয়ে দেখা জরুরী বলে মত দেন। আলোচনায় জাতীয় বস্তি কমিশন গঠনের দাবিসহ ১২ দফা দাবির আহ্বান জানানো হয়।

ঐক্য ন্যাপের সভাপতি পঙ্কজ ভট্টাচার্য বলেন, বস্তি কেন পুড়ে তা খতিয়ে দেখতে হবে, নিম্নআয়ের মানুষের আবাসনের জন্য জাতীয় বস্তি কমিশন গঠন করতে হবে। বস্তিবাসী পুনর্বাসন না করা পর্যন্ত উচ্ছেদ না করতে হাইকোর্টের রুল থাকার পরেও প্রতিবছরই বস্তিতে আগুন লাগে। একটি পৃথক কমিশন গঠন করে সব অগ্নিকা-ের কারণ অনুসন্ধান ও বস্তিবাসীর আবাসনের ব্যবস্থা করার জানান তিনি।

১২ দফা দাবির মধ্যে চলন্তিকা বস্তিতে ভয়াবহ অগ্নিকা-ে আনুমানিক ৫ হাজার পরিবারকে ১৫ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেয়ার দাবি জানানো হয়। একই জায়গায় বস্তিবাসীর পুনর্বাসনের কথাও ওঠে। বস্তিকে নগরের দুর্যোগ ও ঝুঁকি হিসেবে সুস্পষ্টভাবে চিহ্নিত করার দাবিও জানানো হয়। বলা হয় বড় বস্তির কাছে সার্বক্ষণিক ফায়ার সার্ভিসের অন্তত একটি ইউনিট রাখার।

গত বছরের ২৭ ফেব্রুয়ারি মিরপুর-১৪ নম্বরে সরকারী দুই বিঘা জমির ওপর গড়ে ওঠা ভাষানটেক বস্তিতে ভয়াবহ অগ্নিকা-ে পাঁচ শতাধিক ঘর পুড়ে যায়। নিহত হয় তিনটি শিশু। ফায়ার সার্ভিসের ২১ ইউনিট সাড়ে সাত ঘণ্টা চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। ওই ঘটনার তদন্তেও ফায়ার সার্ভিসের তরফ থেকে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল।

এর আগে ’১২ সালে কমলাপুরের শাহজাহানপুর এলাকায় রেলওয়ের জায়গায় গড়ে ওঠা অবৈধ বস্তি উচ্ছেদ করতে গেলে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বস্তিবাসীর ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। বস্তিবাসীর হামলায় দুই ম্যাজিস্ট্রেট ও ৮ পুলিশ আহত হন। পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশকে শেষ পর্যন্ত গুলি চালাতে হয়েছিল। গুলিতে এক মহিলা মারা যায়। গুলিবিদ্ধ হন ৫ জন। এমন পরিস্থিতিতে উচ্ছেদ অভিযান থেমে যায়। শাহজাহানপুর রেল, বস্তিতে আর কোন অভিযান চালানো হয়নি। এছাড়া ’১৪ সালে খিলগাঁওয়ের ঝিলপাড় বস্তিতে ঘর ধসে ১২ জনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে।

একই বছরের ১১ সেপ্টেম্বর ঢাকার কাওরানবাজারে রেললাইনের ওপর অবৈধ মাছ বাজারে বেচাকেনার সময় দুই ট্রেনের ধাক্কায় ঘটনাস্থলেই ৪ জন মারা যায়। আহত হয় ১৬। এরপর রেল কর্তৃপক্ষ সারাদেশে রেলের জায়গায় সব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ শুরু করে। কয়েক দিনের টানা অভিযানে ৪ হাজার অবৈধ স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেয়া হয়। কিন্তু কোন বস্তিই আদালতের নির্দেশের কারণে উচ্ছেদ করা যায়নি।

স্থানীয় সরকারের অধীনে কাজ করা বিভিন্ন দাতা সংস্থার পরিসংখ্যান মোতাবেক দেশের ২৪ জেলার ২৯ শহরে ৪৫ হাজার বস্তি আছে। এর মধ্যে টঙ্গী ও সাভারে বস্তির সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। বস্তিগুলো ৫ হাজার একর সরকারী জমির ওপর গড়ে উঠেছে।

রেল বিভাগের তথ্য মোতাবেক সারাদেশে সরকারী, আধা সরকারী প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি পর্যায়ে সাড়ে ৪ হাজার একর রেলের জমি অবৈধ দখলে রয়েছে। বেদখল এসব জায়গায় ভারি ও হাল্কা আধাপাকা স্থাপনা ছাড়াও বস্তি গড়ে উঠেছে। ঢাকা থেকে টঙ্গী পর্যন্ত ২৩ কিলোমিটার রেলপথের দুই ধারের প্রায় ৫৮ একর জমিতে রয়েছে হাজার হাজার অবৈধ স্থাপনা আর বস্তি। এসব স্থাপনা নিয়ন্ত্রণ করছে প্রায় ৫ হাজার স্থানীয় প্রভাবশালী।

দাতাসংস্থা ইউপিপিআরের (আরবান পার্টনারশিপস ফর পোভার্টি রিডাকশন্সের প্রজেক্ট) জরিপ অনুযায়ী বস্তিগুলোয় ৫ লাখ হতদরিদ্র মানুষ বাস করছেন।

ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে ঢাকায় ছোট বড় একশ’ বস্তি আছে। গত প্রায় চার বছরের ছোট ছোট দশ বস্তি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। ওসব বস্তির বাসিন্দারা বড় বড় বস্তিতে আশ্রয় নিয়েছে। ইতোমধ্যে রেলওয়ের জায়গার ওপর গড়ে উঠেছে ৭০ বস্তি। অন্যান্য বস্তি সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের জায়গার ওপর গড়ে উঠেছে। ঢাকায় বস্তিতে বসবাস করছেন অন্তত ২ লাখ দরিদ গরিব মানুষ। বস্তিবাসীর অনেকেই ভোটার।

সিটি কর্পোরেশনের তথ্য মোতাবেক যুক্তরাজ্যের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন শাখা দেশের বস্তির সার্বিক উন্নয়নের জন্য ৭২০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। এসব অর্থ ব্যয় হচ্ছে স্থানীয় সরকার ও প্রকৌশল বিভাগের তদারকিতে বিভিন্ন এনজিওর মাধ্যমে। প্রজেক্টের কৌশলগত সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে ইউএনডিপি (জাতিসংঘ উন্নয়ন সংস্থা)। পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যুক্ত ও অধীন ৩০ সংস্থা, সুশীল সমাজ, হাজারখানেক এনজিও ছাড়াও বিভিন্ন সামাজিক উন্নয়ন সংস্থা জড়িত।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স সদর দফতরের অপারেশন্স শাখার তথ্য অনুযায়ী, দেশে থাকা বস্তি নিয়ে উদ্বিগ্ন সরকার। যদিও সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে বস্তির সঠিক পরিসংখ্যান, বস্তিতে বসবাসকারীদের প্রকৃত সংখ্যা সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট কোন তথ্য নেই। বেশির ভাগ সময়ই বস্তিতে আগুন লাগলে সেখানে ভারি কোন যানবাহন দিয়ে কাজ করা সম্ভব হয় না। ফলে আন্তরিকতা থাকলেও ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানির ঘটনা রোধ করা যাচ্ছে না। এতে সরকারের প্রতি মানুষের এবং বিদেশে দেশের ভাবমূর্তি মারাত্মক প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

প্রকাশিত : ২৬ জানুয়ারী ২০২০

২৬/০১/২০২০ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

শেষের পাতা



শীর্ষ সংবাদ: