২৫ জানুয়ারী ২০২০, ১২ মাঘ ১৪২৬, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
 
সর্বশেষ

কেরানীগঞ্জের প্লাস্টিক কারখানাটি সিলগালা

প্রকাশিত : ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯
  • ঢামেক আইসিইউতে গুরুতর ১০ জন

গাফফার খান চৌধুরী/ সালাহ উদ্দিন মিয়া ॥ ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের প্লাস্টিক কারখানাটি সিলগালা করে দিয়েছে কেরানীগঞ্জ উপজেলা প্রশাসন। এ নিয়ে কোম্পানিটির দুটি কারখানায়ই সিলগালা করে দেয়া হলো। চল্লিশ বছরের ইতিহাসে কেরানীগঞ্জে অগ্নিকা-ে দগ্ধদের মতো এমন পোড়া রোগী আর ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হয়নি। এদিকে ছয় ঘণ্টার ব্যবধানে দুই ভাই নিহতের যে খবর ছড়িয়ে পড়েছিল, তার মধ্যে একজন এখনও জীবিত আছেন। তবে তিনি জীবনমৃত্যুর সন্ধিঃক্ষণে আছেন। তিনিসহ দশজন আইসিইউতে জীবনমৃত্যুর সঙ্গে লড়ে যাচ্ছেন। আইসিইউতে থাকা দশ জনের অবস্থাই অত্যন্ত গুরুতর বলে চিকিৎসকরা জানান।

শুক্রবার বেলা এগারোটার দিকে কেরানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অমিত দেবনাথ কারখানাটি সিলগালা করেন। ইউএনও অমিত দেবনাথ সাংবাদিকদের বলেন, ঘটনার তদন্ত চলছে। অগ্নিকাণ্ডে নিহত লোকজনকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এক লাখ টাকা করে সহায়তা দেয়া হবে। এ ছাড়া নিহত লোকজনের দাফনে জন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ২০ হাজার টাকা এবং আহত ব্যক্তিদের ১৫ হাজার টাকা করে দেয়া হয়েছে। এর আগে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন ঢাকা জেলা প্রশাসক আবু সালেহ মোহাম্মদ ফেরদৌস খান। পরে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, আবাসিক এলাকায় এ ধরনের কারখানা থাকার কথা নয়। এ ধরনের দুর্ঘটনা রোধে এ রকম নন কমপ্লায়েন্স কারখানা আর আছে কি না, খোঁজা হচ্ছে। মানুষের জীবনের ঝুঁঁকি কমানোর লক্ষ্যে শিল্প ও কলকারখানা সংক্রান্ত বিভিন্ন সংস্থা কাজ করছে। তিনি গ্যাস ও বিদ্যুত সংযোগ দেয়ার আগে কারখানাগুলো কি ধরনের, তা যাচাই করে নিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানান।

এদিকে বৃহস্পতিবারই একই মালিকের কেরানীগঞ্জের শুভাঢ্যায় থাকা আরেকটি কারখানা সিলগালা করে দেন কেরানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অমিত দেবনাথ। শুক্রবার জেলা প্রশাসক (ডিসি) কারখানা দুটি পরিদর্শন করেন। জেলা প্রশাসক জানান, সিলগালা করা দুটি কারখানায়ই আবাসিক এলাকার মধ্যে। তাছাড়া কারখানাটিতে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ছিল না। এমনকি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটলে সেখানে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি নিয়ে প্রবেশ মুশকিল।

দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার ওসি শাহ জামান জানান, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় বৃহস্পতিবার একটি হত্যা মামলা দায়ের হয়েছে। দুর্ঘটনায় নিহত আলমের ছোট ভাই জাহাঙ্গীর বাদী হয়ে কারখানার মালিক নজরুল ইসলামসহ কয়েকজনকে আসামি করে মামলাটি করেন। কারখানার মালিককে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।

শুক্রবার কেরানীগঞ্জের প্লাস্টিক কারখানায় দগ্ধ কর্মীদের অবস্থা আবারও দেখতে যান শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন এ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের প্রধান সন্বয়ক অধ্যাপক ডাঃ সামন্ত লাল সেন। পরে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, আমার ৪০ বছরের কর্মজীবনে দেশে আগুনে পোড়া এমন রোগী দেখিনি। যত রোগী দেখেছি, তাদের মধ্যে এদের অবস্থা সবচেয়ে ভয়াবহ। শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন এ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের আইসিইউতে লাইফ সাপোর্টে রয়েছেন দশ জন। এদের মধ্যে অনেকেরই মুখ দেখে তাদের চেনা যায় না। চিকিৎসাধীন ১০ জন রোগীর শ্বাসনালি ৬০ থেকে ৮০ ভাগ পুড়ে গেছে। আব্দুর রাজ্জাক নামের একজনের দেহের শতভাগ পুড়ে গেছে। এদের কেউই শঙ্কামুক্ত নন। সবাই লাইফ সাপোর্টে আছেন। তবে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন দগ্ধরা প্রাথমিকভাবে সম্পূর্ণ শঙ্কামুক্ত। তাদের শরীরের ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পুড়ে গেছে। তিনি আরও বলেন, প্রতি মুহূর্তে রোগীর স্বজনদের সবকিছু জানানো হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ মোতাবেক সরকারী অর্থায়নে রোগীদের চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।

এদিকে কেরানীগঞ্জে অগ্নিকা-ে নিহতদের মধ্যে ১২ জনের লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার রাতে ও শুক্রবার তাদের লাশ হস্তান্তর করা হয়। ঢাকার জেলা প্রশাসনের তরফ থেকে করেন জ্যেষ্ঠ সহকারী কমিশনার মোঃ আব্দুল আওয়াল লাশ হস্তান্তর প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন। সহকারী কমিশনার জানান, লাশ দাফন কাফনের জন্য প্রত্যেকের পরিবারকে ২০ হাজার টাকা আপাতত দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি আহতদেরও ২০ হাজার টাকা করে চিকিৎসার জন্য দেয়া হয়েছে।

বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুক্রবার পর্যন্ত কেরানীগঞ্জের আলম (৩৫), পিরোজপুরের জাহাঙ্গীর হোসেন (৫৫), নরসিংদীর বাবলু (২৬), নড়াইলের রায়হান বিশ্বাস (১৬), পটুয়াখালীর ইমরান হাওলাদার (১৮), বরিশাল বাকেরগঞ্জের আব্দুল খালেক (৩৫), মাগুরার জিনারুল মোল্লা (৩২), জয়পুরহাটের সুজন দেওয়ান (১৯), মুন্সীগঞ্জ জেলার ফয়সাল দেওয়ান (২৪), টাঙ্গাইলের সালাউদ্দিন (২৬), জয়পুরহাটের ওমর ফারুক (৩২) ও কেরানীগঞ্জের মেহেদী হাসানের (২০) লাশ হস্তান্তর করা হয়।

আর হাতের ব্রেসলেট ও আংটি দেখে মাহবুব হোসেন একজনকে শনাক্ত করেন তার পিতা গুলজার হোসেন। তার বাড়ি রংপুরে। নিশ্চিত হওয়ার জন্য নিহত ও তার ছেলে দাবি করা পরিবারের ডিএনএ পরীক্ষা করা হবে বলে জানান জ্যেষ্ঠ সহকারী কমিশনার মোঃ আব্দুল আওয়াল।

প্রসঙ্গত, গত ১১ ডিসেম্বর কেরানীগঞ্জের চুনকুটিয়ার হিজলতলা এলাকায় প্রাইম প্লেট এ্যান্ড প্লাস্টিক ইন্ডাস্ট্রিজ নামের ওয়ান টাইম থালা ও গ্লাস তৈরির কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকা-ের ঘটনাটি ঘটেছে। ফায়ার সার্ভিসের ১৩টি ইউনিট দুই ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। কারখানার গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়ে অগ্নিকা-ের ঘটনাটি ঘটে বলে আহত ও স্থানীয়রা জানান। ঘটনার সময় কারখানায় পুরুষ ও নারী মিলিয়ে ৮৮ জন শ্রমিক কর্মরত ছিলেন।

শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন এ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারী ইনস্টিটিউটের আবাসিক সার্জন ডাঃ পার্থ শংকর পাল এবং ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের বার্ন ইউনিটের আবাসিক সার্জন ডাঃ আ ফ ম আরিফুল ইসলাম নবীন জনকণ্ঠকে জানান, দগ্ধদের মধ্যে ৩৩ জন হাসপাতালে এসেছিলেন। তাদের মধ্যে একজন আগেই চিকিৎসা নিয়ে চলে যান। বাকিদের মধ্যে দুর্জয় (২৫) নামের একজনকে তার পরিবার বাইরে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যায়। ভর্তি করা হয় ৩১ জনকে। বর্তমানে ১৮ জন চিকিৎসাধীন আছেন।

এদিকে সরকারের তরফ থেকে নিহত প্রত্যেকের পরিবারকে এক লাখ টাকা আর দগ্ধদের পরিবারকে ৫০ হাজার টাকা করে অনুদান দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এ ঘটনায় শ্রম মন্ত্রণালয়ের তরফ থেকে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

স্থানীয়রা জানান, ওই কারখানায় তৃতীয় বারের মতো অগ্নিকা-ের ঘটনা ঘটে। এর আগে ২০১৬ সালের ২৮ নবেম্বর ও চলতি বছরের ২৫ নবেম্বর আগুন লেগেছিল কারখানাটিতে। আগের দুটি অগ্নিকা-ে কারখানার ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হলেও কেউ হতাহত হয়নি। এদিকে কেরানীগঞ্জে প্লাস্টিক সামগ্রী তৈরির কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকা-ে শ্রমিক মৃত্যুর ঘটনায় শ্রমিক কর্মচারী ফেডারেশন তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে। বাংলাদেশ শ্রমিক কর্মচারী ফেডারেশনের সভাপতি জহিরুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক উজ্জ্বল রায় এক যৌথ বিবৃতিতে বলেছেন, একটি অনিরাপদ পরিবেশে শ্রমিকদের কর্মে রেখে মালিকেরা বারবার এরকম ঘটনা ঘটিয়েই চলেছে। প্লাস্টিক কারখানার মালিকসহ সকল অব্যবস্থাপনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও হতাহত সকল শ্রমিকের পরিবারকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ প্রদান করতে হবে।

অন্যদিকে কেরানীগঞ্জে প্রাইম প্লাস্টিক কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় দায়ীসহ সংশ্লিষ্টদের দ্রুত গ্রেফতারের দাাবি জানিয়েছে সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্ট। শুক্রবার জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এ সমাবেশ থেকে নেতৃবৃন্দ এমন দাবি জানান। সমাবেশে খুলনার প্লাটিনাম জুট মিলে অনশনরত পাটকল শ্রমিক নিহত হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন বক্তারা। সংগঠনের ঢাকা মহানগর শাখার সভাপতি জুলফিকার আলীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্টের সভাপতি রাজেকুজ্জামান রতন, সাধারণ সম্পাদক আহসান হাবিব বুলবুল, আইন বিষয়ক সম্পাদক এ্যাডভোকেট বিমল চন্দ্র সাহা, মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদক খালেকুজ্জামান লিপনসহ অন্য নেতারা।

প্রকাশিত : ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯

১৪/১২/২০১৯ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

শেষের পাতা



শীর্ষ সংবাদ: