২৪ জানুয়ারী ২০২০, ১১ মাঘ ১৪২৬, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
 
সর্বশেষ

সন্ত্রাসী-মস্তানদের নেতা হওয়ার দিন শেষ

প্রকাশিত : ৮ ডিসেম্বর ২০১৯
  • চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের ত্রিবার্ষিক সম্মেলনে ওবায়দুল কাদের

স্টাফ রিপোর্টার, চট্টগ্রাম অফিস ॥ সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ, দখলবাজ, টেন্ডারবাজসহ অসৎ কোন নেতার প্রয়োজন আওয়ামী লীগে নেই। ভবিষ্যতেও লাগবে না। মস্তানি করে নেতা হওয়ার দিন শেষ। খারাপ লোকের প্রয়োজন নেই। নেতা হবেন ত্যাগীরা, যারা দলের দুঃসময়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন। সুখে, দুঃখে এবং প্রয়োজনে যারা দলের সঙ্গে ছিলেন তারাই হবেন নেতা।

শনিবার চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের ত্রিবার্ষিক সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে দলের সাধারণ সম্পাদক সড়ক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এ কথা বলেন। সম্মেলনের উদ্বোধন করেন দলের কেন্দ্রীয় সভাপতিম-লীর সদস্য সাবেক মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন। চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ফজলে করিম চৌধুরী এমপির সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এমএ সালামের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন কেন্দ্রীয় সভাপতিম-লীর সদস্য আবদুল মতিন খসরু, কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল হক হানিফ, প্রচার সম্পাদক ও তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, সাংগঠনিক সম্পাদক ও পানিসম্পদ উপমন্ত্রী এনামুল হক শামীম, শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, উপপ্রচার সম্পাদক আমিনুল ইসলাম আমিন, উপদফতর সম্পাদক বিপ্লব বড়ুয়া। এছাড়া উপস্থিত ছিলেন সন্দ্বীপের এমপি মাহফুজুর রহমান মিতা, সীতাকুন্ডের এমপি দিদারুল আলম, নারী সংসদ সদস্য খাদিজাতুল আনোয়ার সনি।

সম্মেলনের শুরুতে নেতাদের গ্রুপিংয়ের জের হিসেবে কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ বেধে যায়। শুরু হয় মারামারি। সকাল ১০টার পর এ ঘটনায় নেতাদের সমর্থকদের মাঝে সংঘর্ষ ও পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। দলীয় সূত্র জানায়, উদ্বোধনী পর্ব শুরু করার আগেই উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি গিয়াস উদ্দিনের অনুসারী তথা নেতাকর্মীরা মাঠে অবস্থান নেন। এর পর মিছিল নিয়ে মাঠে প্রবেশ করে সাধারণ সম্পাদক হতে ইচ্ছুক আতাউর রহমানের অনুসারীরা। এ সময় দু’পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। প্রথমে চেয়ার ছোড়াছুড়ি ও পরে মারামারি শুরু করে দেয় সমর্থকরা। প্রায় ২০ থেকে ২৫ মিনিট এ ধরনের ঘটনা চলার পর মঞ্চ থেকে জ্যেষ্ঠ নেতাদের বারংবার অনুরোধে এবং পুলিশী হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।

এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ প্রধান অতিথি তার বক্তব্যে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, পেশীবলে আওয়ামী লীগের নেতা হওয়া যাবে না। বাড়াবাড়ির একটা সীমা আছে। সম্মেলনের শুরুতে যে ঘটনা ঘটেছে তা বাড়াবাড়ি বলে তিনি মন্তব্য করেন। বিরক্তি প্রকাশ করে বলেন, স্লোগান দিয়ে নেতা বানানো যাবে না। বিলবোর্ডে ছবি দিয়ে নেতা হওয়া যায় না। পোস্টারের ছবি কাউকে নেতা বানায় না। মস্তানি করে নেতা হওয়ার দিন শেষ। নেতা হবে দলের শৃঙ্খলা অনুযায়ী। ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সম্মেলনের প্রসঙ্গ টেনে মন্ত্রী বলেন, যাদের বিলবোর্ড, ব্যানার বেশি ছিল তারা কেউ নেতা হতে পারেননি।

মন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগে অনুপ্রবেশ ঠেকানোর ওপর জোর দেয়া হয়েছে। তিনি পরিষ্কার ভাষায় বলেন, কোন খারাপ লোকের প্রয়োজন আওয়ামী লীগে নেই। বুয়েটের আবরার হত্যাকারীর মতো কোন কর্মী দলের দরকার নেই। চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয়ে কথায় কথায় মারামারি করে এমন কোন নেতাকর্মীর প্রয়োজন নেই। রাজশাহীতে অধ্যক্ষকে পানিতে ফেলে দেয় এমন কর্মীরও দলে প্রয়োজন নেই। সেতুমন্ত্রী বলেন, চট্টগ্রামের মাটি শেখ হাসিনার ঘাঁটি। এ ঘাঁটিতে যে ফাটল ধরেছে তা ক্লোজ করে দলকে ঐক্যবদ্ধ করতে চাই, সুবিধাবাদী হতে চাই না। মৌসুমী ও অতিথি পাখির স্থান দলে নেই। নেতৃত্বে সুবিধাবাদীরা যদি আসে সেই আওয়ামী লীগ টিকে থাকতে পারবে না। দুঃসময়ে এদের খুঁজে পাওয়া যাবে না। এখন কর্মীর চেয়ে নেতা হু হু করে বেড়ে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করে ওবায়দুল কাদের বলেন, এদেশ এখন নেতা উৎপাদনের কারখানা। কর্মী উৎপাদন কমে গেছে। ব্যানার-পোস্টার লাগাতে কর্মী মেলে না। টোকাই ভাড়া করতে হয়। বর্তমানে সবাই নেতা, কর্মী নেই বলেও তিনি মন্তব্য করেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশের সবচেয়ে সাহসী রাজনীতিক বলে মন্তব্য করে মন্ত্রী বলেন, বিশে^ তিন শ’ রাজনীতিকের একজন তিনি। বিশে^র প্রভাবশালীদের একজনও তিনি।

উদ্বোধক হিসেবে বক্তব্য দিতে গিয়ে ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন বলেন, এক সময় আমার পাশে এ মঞ্চে যারা বসতেন আজ তাদের কেউ নেই। তিনি বলেন, এটি আমার জীবনের শেষ সম্মেলন। আমার সঙ্গে আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু, আতাউর রহমান খান কায়সার, এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীসহ যারা থাকতেন আজ তাদের কেউ নেই।

কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল হক হানিফ বলেন, বিএনপির আইনজীবীরা আদালতের এজলাসে সম্প্রতি যে কা- চালিয়েছে তা নজিরবিহীন। পৃথিবীর কোন দেশে প্রধান বিচারপতির এজলাসে এ ধরনের ঘটনার নজির নেই। গণতন্ত্রের প্রতি বিএনপির কোন শ্রদ্ধা নেই।

তথমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেন, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান রাজনীতিকদের বেচাকেনা করেছেন। দেশের উন্নয়ন নিয়ে দেশে-বিদেশে সর্বত্র যখন প্রশংসা চলছে তখন একটিমাত্র দল বিএনপি প্রশংসা করতে পারছে না। উন্নয়নের পথে দেশের এ অভিযাত্রা বিএনপির কাছে গাত্রদাহ হিসেবেই চলছে।

শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল বলেন, বিএনপি এখন মিডিয়ানির্ভর দলে পরিণত হয়েছে। দলটির কাজ শুধু প্রেস কনফারেন্স করা। ্আর এর মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে মিথ্যাচার করা।

লালদীঘি ময়দানের এ সম্মেলন রীতিমত বড় ধরনের জনসভায় রূপ নেয়। উত্তর চট্টগ্রামের সব উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পর্যায় থেকে হাজার হাজার নেতাকর্মী অনুষ্ঠানে অংশ নেন। দ্বিতীয় পর্বে নগরীর একটি কনভেনশন সেন্টারে অনুষ্ঠিত হয় নতুন নেতৃত্ব ঘোষণার কার্যক্রম।

নতুন নেতা নির্বাচিত

এদিকে সমঝোতার প্রয়াস ব্যর্থ হওয়ার পর শেষ পর্যন্ত ভোটে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি পদে এমএ সালাম ও সাধারণ সম্পাদক পদে আতাউর রহমান আতা নতুন নেতা নির্বাচিত হয়েছেন। সকালে লালদীঘি ময়দানে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে বিকেলে ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারে দ্বিতীয় অধিবেশনে নতুন নেতা নির্বাচিত করেন ভোটের মাধ্যমে কাউন্সিলরবৃন্দ। নতুন নেতাদের নাম ঘোষণা করেন দলের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। সভাপতি পদে চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের জেলা পরিষদের প্রশাসক এমএ সালাম ২২৩ এবং রাউজানের এমপি এবিএম ফজলে করিম চৌধুরী ১২৯ ভোট পান। সাধারণ সম্পাদক পদে শেখ আতাউর রহমান আতা ১৯৬ এবং গিয়াস উদ্দিন ১৫৪ ভোট পান।

নতুন নেতা নির্বাচন প্রক্রিয়ায় প্রথমে সমঝোতার চেষ্টা করা হলেও সেটা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হলে ভোট প্রদান পর্ব শুরু হয়। ৩৬৬ কাউন্সিলর ভোটের মাধ্যমে আগামী তিন বছরের জন্য চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব নির্বাচন করেন। এ উপলক্ষে দুপুর থেকে কাজির দেউড়ি, ওয়াসা ও চট্টেশ^রী সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়। সড়কের রোড ডিভাইডার স্থাপন করা হয়। মোতায়েন করা হয় বিপুলসংখ্যক পুলিশ।

প্রকাশিত : ৮ ডিসেম্বর ২০১৯

০৮/১২/২০১৯ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



শীর্ষ সংবাদ: