২৭ জানুয়ারী ২০২০, ১৪ মাঘ ১৪২৬, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
 
সর্বশেষ

কিডনিসহ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দান করা যাবে, কেনাবেচা নয়

প্রকাশিত : ৬ ডিসেম্বর ২০১৯
  • হাইকোর্টের রায়

স্টাফ রিপোর্টার ॥ অবশেষে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সংযোজনে আইনী জটিলতার অবসান ঘটল। মানবিক বিবেচনায় কিডনিসহ মানবদেহের যে কোন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নিকটাত্মীয় ছাড়াও অন্য কাউকে দান করা যাবে। কিন্তু কেনাবেচা করা যাবে না বলে রায় দিয়েছে হাইকোর্ট। নিকটাত্মীয় ছাড়া অন্য কাউকে শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দানের সুযোগ না থাকা সংক্রান্ত ‘মানবদেহ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন আইনের’ তিনটি ধারা সংশোধনের নির্দেশ দেয় আদালত। অবৈধভাবে কিডনি ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইন ব্যবস্থা নিতেও সরকারের প্রতি নির্দেশ দিয়েছে আদালত।

বৃহস্পতিবার এ সংক্রান্ত রিটের ওপর জারি করা রুলের নিষ্পত্তি করে বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি খন্দকার দিলীরুজ্জামানের হাইকোর্ট বেঞ্চ এই রায় দেয়। আদালতে রিটের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন ব্যারিস্টার রাশনা ইমাম ও আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) পক্ষে ছিলেন আইনজীবী জেড আই খান পান্না।

রায়ের পর ব্যারিস্টার রাশনা ইমাম বলেন, মানবদেহে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন আইন-১৯৯৯-এর ২(গ) ধারায় দাতার সংজ্ঞা দেয়া রয়েছে। সংজ্ঞায় দাতা হিসেবে নিকটাত্মীয়দের কথা বলা আছে। আর নিকটাত্মীয় বলতে বাবা-মা, ভাই-বোন, পুত্র-কন্যা, চাচা, ফুফু, মামা, খালা ও স্বামী-স্ত্রীকে বলা হয়েছে।

কিন্তু ভারতে এ বিষয়ক আইনে নিকটাত্মীয়ের সংজ্ঞায় ওই ক’জন ছাড়াও নানা-নানি, দাদা-দাদি, খালাতো, মামাতো, চাচাতো ভাই-বোনের কথা বলা আছে। তিনি বলেন, হাইকোর্ট এই বিধান সংশোধনের নির্দেশ দিয়েছে। ভারতের আইনে বিশেষ ক্ষেত্রে বিশেষ পরিস্থিতিতে নিকটাত্মীয় ছাড়াও অন্যরা দাতা হতে পারবে। এক্ষেত্রে ওই আইনে নির্দিষ্ট করে দেয়া আছে কারা বিশেষ পরিস্থিতিতে দাতা হতে পারবে। তিনি বলেন, আমাদের আইনে দাতাকে ১৮ থেকে ৬৫ বছর পর্যন্ত বয়সের ব্যক্তি হতে হবে। মেডিক্যাল বোর্ডের ছাড়পত্র নিতে হবে। আইনের এ বাধ্যবাধকতায় চিকিৎসা ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

আদালতে রিটের বিষয়ে ব্যারিস্টার রাশনা ইমাম সাংবাদিকদের বলেন, আদালতে রিট আবেদনটি দায়ের করেন ফাতেমা জোহরা নামে এক ব্যক্তি। ফাতেমা জোহরা ’১৫ সালে তার মেয়ে ফাহমিদাকে একটি কিডনি দান করেন। এরপরও মেয়ের কিডনি অকেজো হয়ে গেছে। বর্তমানে ডায়ালাইসিস করতে হচ্ছে, যা ব্যয়বহুল। কিন্তু আইনী বাধার কারণে মেয়েকে দাতার কিডনি দিতে পারছেন না তিনি। এ অবস্থায় রিট আবেদন করেন ফাতেমা জোহরা।

এদিকে গত ২০১৭ সালের ২৪ আগস্টে এই রিটের শুনানি শেষে মানবদেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন আইনের ৩টি ধারা কেন অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করে হাইকোর্ট। মানবদেহে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন আইন, ৯৯-এর এই তিনটি ধারা হলো ২(গ), ৩ ও ৬। এছাড়াও ১৯৯৯ সালের আইনের কয়েকটি বিধি প্রণয়নে বিবাদীদের নিষ্ক্রিয়তা কেন অবৈধ ও অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না, রুলে তাও জানতে চেয়েছিল আদালত। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সচিব ও স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালককে এসব রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছিল।

অঙ্গ প্রত্যঙ্গ সংযোজন আইন নিয়ে সুচিন্তিত রায় দিয়েছেন আদালত

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, অঙ্গ প্রত্যঙ্গ সংযোজনের জটিলতা দূর করে দিয়েছে আদালত। এতে অঙ্গ প্রত্যঙ্গ সংযোজনের দরকার হবে এমন রোগীদের জীবন রক্ষা পাবে। পাশাপাশি নিজ দেশে স্বল্প ব্যয়ে অঙ্গ প্রত্যঙ্গ সংযোজনের দ্বার উন্মোচিত হয়েছে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা আরও বলেন, দেশে কিডনি বিকল রোগীদের জন্য কিডনিদাতার সঙ্কট প্রকট হয়ে উঠেছে। টাকা দিয়েও কিডনি সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছে না। দেশে প্রায় ১০ হাজার কিডনি বিকল রোগী প্রতি বছর কিডনি প্রতিস্থাপন করে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন। কিন্তু বাংলাদেশে মাত্র দশটি সরকারী ও বেসরকারী হাসপাতালে বছরে প্রায় ২৫০ কিডনি সংযোজন হয়ে থাকে। কিডনি প্রতিস্থাপনের জন্য বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর ন্যূনতম ৮শ’ কোটি টাকা পাচার হয়ে যাচ্ছে। তাই ’১৮ সালের সংশোধিত বাংলাদেশের ‘মানবদেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন আইনের কিছুটা পরিবর্তন আনা দরকার ছিল। ডায়ালাইসিস চালিয়ে যাওয়ার তুলনায় কিডনি প্রতিস্থাপন ব্যয় অনেক কম। তাই রক্তের সম্পর্কের বন্ধনে আবদ্ধ না রেখে যে কোন প্রাপ্তবয়স্ক সুস্থ ও সবল ব্যক্তিকে কিডনি দানের অনুমতি দেয়া দরকার ছিল। এক্ষেত্রে কিডনিদাতা ও গ্রহীতা নির্ণয়ের জন্য এবং অবৈধ কিডনি বাণিজ্য প্রতিরোধ করতে সরকারী উদ্যোগে ‘প্রত্যয়ন প্রদানকারী বোর্ড’ গঠন করে দিতে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

কিডনি বিকল রোগীদের ডায়ালাইসিসহ কিডনি সংযোজনের বিশাল ক্ষেত্রে তৈরি করেছে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র। এই প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা ডাঃ জাফরুল্লাহ চৌধুরী অঙ্গ প্রত্যঙ্গ সংযোজনের আইনী জটিলতা দূর করে রায় প্রদানের জন্য আদালতকে ধন্যবাদ জানিয়ে জনকণ্ঠকে বলেন, ঐতিহাসিক রায় দিয়েছেন আদালত। নিঃসন্দেহে সুচিন্তিত রায়। এ রায়ে বিবেকের পরিচয় পাওয়া গেছে। তিনি বলেন, এ রায়ের মাধ্যমে শুধু কিডনি রোগী নয়, অঙ্গ প্রত্যঙ্গ সংযোজনের প্রয়োজন হবেন সকল রোগী উপকৃত হবে। কিডনিদাতার সঙ্কট দূর হওয়ার পাশাপাশি উপকৃত হবেন একজন মরণাপন্ন রোগী। নানা উদাহরণ দিয়ে ডাঃ জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, কিডনির উত্তম চিকিৎসা হচ্ছে কিডনি সংযোজন। ডায়ালাইসিসে উপকার পাওয়া গেলেও খুবই ব্যয়বহুল। ডায়ালাইসিসের তুলনায় বিকল কিডনি রোগীর শরীরে কিডনি প্রতিস্থাপন ব্যয় অনেক কম। দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা ব্যয়ে সুস্থ ব্যক্তির দেহ থেকে একটি কিডনি সংগ্রহ করে সরাসরি একজন বিকল কিডনি রোগীকে কিডনি প্রতিস্থাপন করে ১৫ থেকে ২০ বছর সুস্থ জীবনযাপন করতে পারেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কিডনি প্রতিস্থাপনের অবাধ সুযোগ থাকার বিষয়টি তুলে ধরে ডাঃ জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, কানাডা, যুক্তরাজ্য, ইরান, সৌদি আরবসহ অনেক দেশে যে কোন প্রাপ্তবয়স্ক সুস্থ ব্যক্তি অপরিচিতি রোগীর জন্য কিডনি দান করতে পারেন। আর ভারতে অনাত্মীয় ব্যক্তি অঙ্গ দান করতে চাইলে প্রত্যেক রাজ্যে নিবন্ধিত কমিটিকে জানাতে হয়। শ্রীলঙ্কাতেও একই অবস্থা বিদ্যমান।

কিডনি প্রতিস্থাপন ও ডালাইসিস দেয়ার তুলনামূলক সুবিধা-অসুবিধা তুলে ধরেন অধ্যাপক ডাঃ মহিবুল্লাহ খন্দকার বলেন, বাংলাদেশে প্রতি বছর দশ হাজার কিডনি প্রতিস্থাপন প্রয়োজন। দেশে বছরে প্রায় ২৫০টি কিডনি প্রতিস্থাপন হয়ে থাকে। দেশে কিডনি সার্জনের সঙ্কট রয়েছে। তবে তা স্বল্প সময়ের মধ্যে কিডনি প্রতিস্থাপনকারী সার্জন সৃষ্টি করা সম্ভব। কিন্তু আইনী জটিলতাসহ নানা অনাকাক্সিক্ষত ঘটনার কারণে কিডনি প্রতিস্থাপন কার্যক্রমে অংশ নিতে চান না সার্জনরা। এভাবে অঙ্গ প্রত্যঙ্গ সংযোজন আইনের জটিলতার কারণে শত শত কিডনি বিকল রোগী স্বাভাবিক চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। কিডনিদাতার যোগান থাকলে মাত্র ২ লাখ টাকা দিয়ে কিডনি প্রতিস্থাপন করানো সম্ভব। আর একই কাজ ভারতে ৩৫ থেকে ৪০ লাখ টাকা, শ্রীলঙ্কায় ৪০ লাখ টাকা, সিঙ্গাপুরে এক থেকে দেড় কোটি টাকা এবং আমেরিকার মতো উন্নত দেশে তা দুই কোটি টাকা পর্যন্ত ব্যয় হবে। দেশের মেডিক্যাল কলেজগুলোতে কিডনি প্রতিস্থাপন সেন্টার গড়ে তোলা সম্ভব। ডায়ালাইসিস শুরু করলে তা চালিয়ে যেতে হয় আজীবন। একজন কিডনি রোগীকে প্রতি সপ্তাহে ডায়ালাইসিসের পেছনে ব্যয় করতে হয় গড়ে ৬ থেকে ৮ হাজার টাকা। ডায়ালাইসিসের এই উচ্চ ব্যয় গরিব রোগী তো দূরের কথা, অনেক ধনাঢ্য পরিবারের রোগীর পক্ষেও আজীবন বহন করা সম্ভব হয়ে উঠে না। ডায়ালাইসিস করানোর তিন বছরের খরচ দিয়ে অনায়াসেই কিডনি প্রতিস্থাপন করিয়ে নেয়া যায়। তবে কিডনিদাতার পথ সুগম করে দিতে হবে।

ডাঃ জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, দেশেও কিডনি রোগের উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থা রয়েছে। তবে কিডনিদাতার সঙ্কট দেখা দিয়েছে। এ রোগের চিকিৎসা বেশ ব্যয়বহুল। তাই নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানোসহ সচেতনতা কার্যক্রম বাড়ানো উচিত। অঙ্গ প্রতিস্থাপন আইনের সময়োপযোগী সংস্কার, সংশোধন ও সংযোজনের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন ডাঃ জাফরুল্লাহ চৌধুরী।

প্রকাশিত : ৬ ডিসেম্বর ২০১৯

০৬/১২/২০১৯ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



শীর্ষ সংবাদ: