৬ ডিসেম্বর ২০১৯, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
 
সর্বশেষ

গ্যাস বিস্ফোরণে হত ৭ ॥ চট্টগ্রামে আবাসিক ভবনের নিচতলা ও সীমানা প্রাচীর বিধ্বস্ত

প্রকাশিত : ১৮ নভেম্বর ২০১৯
গ্যাস বিস্ফোরণে হত ৭ ॥ চট্টগ্রামে আবাসিক ভবনের নিচতলা ও সীমানা প্রাচীর বিধ্বস্ত
  • মারাত্মক আহত ও দগ্ধ আরও ১০
  • কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক
  • দুই তদন্ত কমিটি গঠন

স্টাফ রিপোর্টার, চট্টগ্রাম অফিস ॥ চট্টগ্রাম মহানগরীর পাথরঘাটা এলাকার একটি আবাসিক ভবনে গ্যাস সরবরাহের লাইনে ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। রবিবার সকালে বিস্ফোরণের এ ঘটনায় ঘটনাস্থলেই মর্মান্তিকভাবে প্রাণ হারিয়েছেন ৭ নারী-পুরুষ ও শিশু। যদিও চমেক হাসপাতালে এ ৭ জনকে মৃত ঘোষণা করা হয়। আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আরও কয়েকজনের মৃত্যুর আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিস্ফোরণে ধসে পড়েছে ভবনটির নিচতলার কক্ষের দুটি দেয়াল ও সংলগ্ন সীমানা প্রাচীর। এ ঘটনায় মারাত্মকভাবে আহত ও দগ্ধ হয়েছেন আরও ১০ জন। সকাল ৯টার দিকে ব্রিক ফিল্ড রোডের জনবহুল এলাকার বড়ুয়া ভবনে এ দুর্ঘটনা ঘটে। পৈত্রিক সূত্রে ভবনটির মালিক অমল বড়ুয়া ও টিটু বড়ুয়া নামের দুই সহোদর। উভয়ে পরিবারসহ ভবনটির পঞ্চম তলায় বসবাস করেন। এ ঘটনায় পৃথক দুটি তদন্ত কমিটি গঠন হয়েছে। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে একটি ও অপরটি গ্যাস সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (কেজিডিসিএল)।

ঘটনার পর ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানানো হয়েছে, বিস্ফোরণের এ ঘটনা গ্যাস লাইনে ত্রুটির কারণে হয়ে থাকতে পারে। পক্ষান্তরে, কেজিডিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী খায়েজ আহমদ মজুমদার দাবি করেছেন, তাদের গ্যাস লাইনে কোন ধরনের ত্রুটি ছিল না। কেন এ ঘটনা ঘটেছে তা তদন্ত ছাড়া বলা সম্ভব নয়।

অপরদিকে, নগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ কমিশনার (দক্ষিণ) শাহ মোঃ আবদুর রউফ সাংবাদিকদের বলেছেন, গ্যাস লাইনে ত্রুটি থাকায় পুরো বাড়িটি গ্যাস চেম্বার হয়েছিল। অথবা ভবনের নিচতলার ফ্ল্যাটের গ্যাসের চুলা খোলা ছিল।

সকালে পাথরঘাটার ব্রিক ফিল্ড রোডের পাঁচ তলাবিশিষ্ট বড়ুয়া ভবনটি হঠাৎ বিকট শব্দে বিস্ফোরিত ও প্রকম্পিত হওয়ার পর নিচতলার কক্ষের দুই দেয়াল ও ভবনের সীমানা প্রাচীরের ইটের গাঁথুনি লন্ডভন্ড হয়ে ধসে পড়ে। নিচতলায় বসবাসরত ভাড়াটিয়া হলেন কাজল দেবনাথ। প্রাথমিক অনুসন্ধানের তথ্যে গ্যাস লাইনের পাইপে এ বিস্ফোরণ হয় বলে ধারণা করা হচ্ছে। ঘটনাস্থল থেকে জানা গেছে, পাইপ লাইনের রাইজার দিয়ে গ্যাস লিক করছিল। এ অবস্থায় নিচতলার ভাড়াটিয়া কাজল দেবনাথের মেয়ে অর্পিতা দেবনাথ সকালে রান্নাঘরের চুলা জ্বালাতে গিয়ে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। ঠিক গ্যাস লাইনের কোন স্থানে বিস্ফোরণটি হয়েছে তা এখনও নিশ্চিত নয়। তবে আবাসিক ও বাণিজ্যিক পর্যায়ে গ্যাস সরবরাহকারী সংস্থা কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (কেজিডিসিএল) পক্ষ থেকে পাইপলাইনে কোন ত্রুটি নেই বলে দাবি করা হয়েছে।

দুর্ঘটনার পর পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয় লোকজন দ্রুত উদ্ধার কার্যক্রম শুরু করে। হতাহতদের উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। স্বাস্থ্য অধিদফতরের উপপরিচালক হাসান শাহরিয়ার কবির জানান, মোট ১৭ জনকে হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়েছিল। এর মধ্যে ৭ জনকে পরীক্ষা করে মৃত ঘোষণা করা হয়। এর মধ্যে ২ জন নারী, ১ জন কিশোর ও ৪ জন পুরুষ। বাকি ১০ জন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তন্মধ্যে ৫ জন ক্যাজুয়ালটি বিভাগে, ২ জন বার্ন ইউনিটে, ১ জন নিউরোলজি বিভাগে, ১ জন অর্থোপেডিক বিভাগে এবং ১ জনকে কার্ডিওলজি বিভাগে ভর্তি করা হয়েছে।

চমেক হাসপাতাল সূত্রে জানানো হয়েছে, বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অর্পিতা দেবনাথ (১৫) নামের এক কিশোরীর অবস্থা সঙ্কটাপন্ন। তার শরীরের প্রায় ৩০ শতাংশ দগ্ধ হয়েছে। শ্বাসনালীও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আহতদের সুস্থ করতে সর্বোচ্চ সেবা প্রদান করা হচ্ছে।

সিএমপির কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোঃ মহসিন জানান, পাথরঘাটার ব্রিক ফিল্ড রোডের বড়ুয়া ভবনে বিস্ফোরণের ঘটনায় নিহত ৭ জনের মধ্যে ৪ জনের পরিচয় পাওয়া গেছে। তারা হলেন, নুরুল ইসলাম (৩০), এ্যানি বড়ুয়া (৪০), ফারজানা (৩০) ও তার পুত্র আতিকুর রহমান (৮)। এর মধ্যে নুরুল ইসলাম পেশায় একজন রংমিস্ত্রি। তিনি পাশের ভবনে কাজ করছিলেন। ভবনটির দেয়ালের ভগ্নাংশের আঘাতে তার মৃত্যু হয়। এ্যানি বড়ুয়া পটিয়ার উনাইনপুরা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা। তিনি ওই পথ ধরেই যাচ্ছিলেন পিইসি পরীক্ষা কেন্দ্রের উদ্দেশে। ফারজানা তার সন্তান আতিকুরকে প্রাইভেট শিক্ষকের কাছে নিয়ে যাচ্ছিলেন। দেয়ালচাপা পড়ে মা-পুত্রের মৃত্যু হয়। নিহত ফারজানার স্বামী আতাউর রহমান একজন আইনজীবী। ব্রিক ফিল্ড রোডে একটি ভাড়া বাসায় বসবাসরত পরিবারটি। এ দম্পতির দুই সন্তান। এরমধ্যে নিহত বড় ছেলে আতিকুর রহমান নগরীর সেন্ট প্লাসিডস স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণীর ছাত্র ছিল।

ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক পূর্ণচন্দ্র মুৎসুদ্দি জানান, ভবনটির সীমানা প্রাচীরের একেবারে কাছেই ছিল গ্যাস লাইনের রাইজার। পাইপ লাইনে ত্রুটি বা লিকেজের কারণে এ দুর্ঘটনা ঘটে থাকতে পারে। অসতর্কতায় নিচতলার রান্নাঘরের গ্যাসের চুলা বন্ধ না করার ফলে গ্যাস জমেও এ দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তবে এ বিষয়ে পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া যাবে তদন্তের পর। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা খুব দ্রুত হতাহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে প্রেরণ করেছে।

এদিকে, কেজিডিসিএল কর্তৃপক্ষ গ্যাস লাইনে কোন ধরনের ত্রুটি নেই বলে দাবি করেছে। কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী খায়েজ আহমদ মজুমদার জনকণ্ঠকে জানান, ঘটনার পর তাদের বিশেষজ্ঞ টিম অকুস্থলে গেছে। তারা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে লাইনে কোন ফল্ট পাননি। বিষয়টি ফায়ার সার্ভিসসহ জেলা প্রশাসনের তদন্ত কমিটিকে অবহিত করা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে কেজিডিসিএলের জিএমকে প্রধান করে চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ কমিটি যত দ্রুত সম্ভব রিপোর্ট প্রদান করবে।

জেলা প্রশাসনের তদন্ত কমিটি

পাথরঘাটায় বড়ুয়া ভবনে বিস্ফোরণের ঘটনায় ৫ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে জেলা প্রশাসন। অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এজেএম শরীফুল হাসানকে প্রধান করে গঠিত এ কমিটিতে রয়েছেন ফায়ার সার্ভিস, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর। সাত কর্মদিবসের মধ্যে এ কমিটিকে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য বলা হয়েছে।

চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোঃ ইলিয়াস হোসেন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। তিনি নিহতদের দাফনের জন্য প্রতি পরিবারকে ২০ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা প্রদানের কথা জানান।

চিকিৎসা ব্যয় বহন করবে চসিক

পাথরঘাটার ব্রিক ফিল্ড রোডের ওই বাড়িতে বিস্ফোরণের ঘটনা অবহিত হয়েই ছুটে যান চট্টগ্রাম সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন। তিনি সেখানে আহতদের কর্পোরেশনের খরচে চিকিৎসার ঘোষণা দেন। এছাড়া প্রতি পরিবারকে তাৎক্ষণিকভাবে ২০ হাজার টাকা প্রদান এবং পরে কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে আরও ১ লাখ টাকা করে প্রদানের ঘোষণা দেন। তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীনদের দেখতে যান এবং তাদের চিকিৎসাসেবার বিষয়ে খোঁজখবর নেন।

হতাহত সকলেই পথচারী

বড়ুয়া ভবনে গ্যাস বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটলেও এতে হতাহত সকলেই পথচারী ও আশপাশের বাসিন্দা বলে প্রাথমিক তথ্যে জানা গেছে। এলাকাটি বেশ ঘনবসতিপূর্ণ। ব্রিক ফিল্ড সড়কটিতে সকাল থেকে রিক্সা, ট্যাক্সিসহ ছোট যানবাহনের আধিক্য থাকে। অনেকেই হেঁটে কর্মস্থল ও গন্তব্যে যাতায়াত করেন। ঘটনার সময় ছিল অফিস, স্কুলগামীসহ বিভিন্ন কর্মস্থলে যাতায়াতকারীদের গমনাগমন। যখন দুর্ঘটনাটি ঘটে তখন ভবন সংলগ্ন সড়কে ছিল বেশকিছু রিক্সা। বিস্ফোরণে ভবনের দুটি দেয়াল সড়কে আছড়ে পড়লে অনেকে চাপা পড়েন। পাশের জসিম বিল্ডিংও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ভাঙ্গা দেয়ালের টুকরো ওই ভবনকেও আঘাত করে। এতে ভবনটির নিচতলায় থাকা ৩ সদস্য আহত হন। যাদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে তারা প্রায় সকলেই ওই পথের যাত্রী ছিলেন। নিহতদের মধ্যে বড়ুয়া ভবনের কেউ রয়েছেন কিনা তা সন্ধ্যায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত নিশ্চিত করতে পারেনি পুলিশ।

চউকের বক্তব্য

পাথরঘাটার এ ভবনটি বিল্ডিং কোড অনুযায়ী নির্মিত হয়নি বলে জানিয়েছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (চউক) । এলাকাটি খুবই ঘনবসতিপূর্ণ, সড়কগুলোও সরু। সেখানে একটি ভবনের সঙ্গে আরেকটি ভবনের যতটুকু দূরত্ব রাখা উচিত তা রাখা হয়নি। ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে চউকের নির্দেশনা মানা হয়নি। গাদাগাদি করে আছে একাধিক ভবন। চউকের ভবন নির্মাণ কমিটির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী শাহিনুর ইসলাম গণমাধ্যমকে জানান, এ বিষয়ে চউকের পক্ষ থেকেও তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

শিক্ষা উপমন্ত্রীর শোক

চট্টগ্রামের পাথরঘাটা ব্রিকফিল্ড সড়কের বড়ুয়া ভবনে গ্যাস লাইন বিস্ফোরণে সাতজনের প্রাণহানির ঘটনায় গভীর শোক ও সমবেদনা জানিয়েছেন শিক্ষা উপমন্ত্রী ও চট্টগ্রাম ৯ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল। তিনি নিহতদের দাফনের জন্য প্রত্যেকের পরিবারকে ১০ হাজার টাকা করে আর্থিক অনুদান দিয়েছেন। এছাড়া চিকিৎসাধীন সকলের পাশে থাকার আশ্বাস প্রদান করেন। চট্টগ্রাম মহানগর মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হাসিনা মহিউদ্দিনও দুর্ঘটনার খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে দেখতে যান এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক বোরহানুল হাসান চৌধুরী সালেহীন।

প্রকাশিত : ১৮ নভেম্বর ২০১৯

১৮/১১/২০১৯ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



শীর্ষ সংবাদ: