৮ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
 
সর্বশেষ

ভারতের সঙ্গে চুক্তি বাতিল দাবিতে বিএনপির কর্মসূচী

প্রকাশিত : ১১ অক্টোবর ২০১৯

স্টাফ রিপোর্টার ॥ প্রধানমন্ত্রী ভারত সফরে গিয়ে সে দেশের সঙ্গে যেসব চুক্তি করেছেন তা দেশবিরোধী বলে অভিযোগ করে এসব চুক্তি বাতিলের দাবিতে দেশব্যাপী দুইদিনের কর্মসূচী পালনের ঘোষণা দিয়েছে বিএনপি। কর্মসূচীর মধ্যে রয়েছে আগামীকাল ১২ অক্টোবর শনিবার সকল মহানগরে ও পরদিন ১৩ অক্টোবর রবিবার সকল জেলা সদরে জনসমাবেশ। বৃহস্পতিবার দুপুরে নয়াপল্টন বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে কর্মসূচী ঘোষণা করতে গিয়ে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, দেশের জনগণের স্বার্থ উপেক্ষা করে ভারতকে খুশি রেখে ক্ষমতায় দীর্ঘদিন টিকে থাকতে চায় আওয়ামী লীগ। অপর এক অনুষ্ঠানে ব্যারিস্টার মওদুদ বলেন, সরকার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছে।

ভারতের সঙ্গে করা চুক্তির সমালোচনা করে ড. মোশাররফ বলেন, সরকার দেশের ফেনী নদী থেকে ১ দশমিক ৮২ কিউসেক পানি ত্রিপুরার সাব্রুম শহরের জনগণের ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে। এ ছাড়া ভারতকে চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে। চুক্তি অনুসারে ভারতকে বাংলাদেশের সমুদ্র উপকূলে যৌথ পর্যবেক্ষণের জন্য রাডার বসানোর অনুমতি দিয়েছে এবং ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে বাংলাদেশ থেকে এলপিজি গ্যাস সরবরাহের নিশ্চয়তা দিয়েছে। অথচ বহু বছর ধরে তিস্তাসহ ৫৪টি অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা পাওয়ার বিষয়ে শুধুই আলোচনা করে চলেছে। এ বিষয়ে এবারও শুধু আশাই পেয়েছে, কোন স্পষ্ট নিশ্চয়তা পায়নি।

খন্দকার মোশাররফ বলেন, ইতোমধ্যেই দেশ ও দেশের জনগণের স্বার্থবিরোধী চুক্তির প্রতিবাদে দেশবাসী ফুঁসে উঠেছে। সচেতন ছাত্রসমাজ আন্দোলনে সোচ্চার হয়েছে। সমালোচনায় ভীত সরকার তার দলীয় লাঠিয়ালদের দিয়ে ফেসবুকে প্রতিবাদী পোস্ট দেয়ার জন্য বুয়েটের মেধাবী ছাত্র আবরারকে খুন করেছে। কিন্তু এই নৃশংস হত্যাকা- আন্দোলনের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে, কাউকে ভীত করতে পারেনি। আজ গোটা দেশের জনগণ এই সরকারকে দেশ ও জনগণের স্বার্থ বিসর্জনকারী এক ক্ষমতালিপ্সু শাসক বলে মনে করে। জনগণ মহান মুক্তিযুদ্ধের সোনালি ফসল গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে বর্তমান সরকারের পতন চায়।

ড. মোশাররফ বলেন, দেশের স্বার্থে যা কিছু দরকার তার সবকিছুই অনিশ্চয়তায় ঝুলিয়ে রেখে অন্যের স্বার্থ পূরণ করা সরকারের নতজানু নীতির প্রমাণ। তিনি বলেন, বাংলাদেশ এলপিজি আমদানিকারক দেশ হয়ে ভারতের প্রয়োজনে তা রফতানির জন্য ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠিত ওমেরা পেট্রোলিয়াম লিঃ ও বেক্সিমকো এলপিজি ইউনিট-১ -কে লাভবান করার উদ্যোগ ব্যক্তি ও গোষ্ঠী বিশেষকে লাভবান করবে, দেশকে নয়। দেড় হাজার কিলোমিটার পথের স্থলে এখন মাত্র ২০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে এলপিজি গ্যাস ভারত পৌঁছবে। তাদের এই সুবিধা দেয়ার বিনিময়ে ‘ঠাকুর শান্তি পুরস্কার’ ছাড়া আমরা আর কি পেলাম?

ড. মোশাররফ বলেন, অসমের নাগরিক পঞ্জির প্রেক্ষিতে কয়েক লাখ অসমবাসীকে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়ার বিষয়ে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ অসম রাজ্য ও কেন্দ্রীয় গুরুত্বপুর্ণ ব্যক্তিদের স্পষ্ট হুমকির মুখে দুই প্রধানমন্ত্রীর যৌথ বিবৃতিতে এ বিষয়ে ইতিবাচক কোন প্রতিশ্রুতির উল্লেখ নেই, যা হতাশাজনক।

খন্দকার মোশাররফ বলেন, ভারতে পাটজাত দ্রব্যসহ অন্য পণ্য রফতানির ওপর আরোপিত অন্যায় বাধা অপসারণের নিশ্চয়তা আদায় করতেও বাংলাদেশ সরকার নিদারুণভাবে ব্যর্থ হয়েছে। এতে বোঝা যায় যে, ভারত সফরের আগে সরকার যথাযথ প্রস্তুতি নেয়নি, দেশের জনগণকে কিছু জানতেও দেয়নি। এর আগেরবার ভারত সফর শেষে দেশে ফিরে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘আমরা যা দিয়েছি তা ভারত চিরদিন মনে রাখবে’। তাহলে এবার আরও এত কিছু দেয়ার কি প্রয়োজন ছিল? প্রধানমন্ত্রী একসময় বলেছিলেন, দেশের স্বার্থে বিদেশীদের গ্যাস দিতে রাজি হননি বলে ২০০১ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসতে পারেনি। এবার তাহলে আমদানি করা ডিউটি ফ্রি এলপিজি দেয়ার উদ্দেশ্য কি?

ড. মোশাররফ বলেন, ভারতকে চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দরকে ব্যবহারের অনুমতি দেয়ায় আমাদের দেশের অবকাঠামো, নাগরিক পরিবহন, চলাচল এবং অর্থনৈতিক বিষয়ে ক্ষয়ক্ষতির নিশ্চিত সম্ভাবনা রয়েছে। আর উপকূলে যৌথ নজরদারির ফলে জাতীয় নিরাপত্তা বিঘিœত হওয়ারও সম্ভাবনা রয়েছে। এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দেশবাসীর কাছে গোপন করা হয়েছে-যা জানার অধিকার তাদের রয়েছে।

ড. মোশাররফ বলেন, প্রধানমন্ত্রী ভারত সফরের মাধ্যমে দেশের বিপুল লাভ ও উন্নয়নের বর্ণনা দিতে গিয়ে নানা অবান্তর বিষয়ের অবতারণা করেছেন। আমরা এর নিন্দা জানাই। অনেক বিষয়ের মধ্যে আমরা শুধু গঙ্গা চুক্তি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ভারত সফর নিয়ে তিনি যেসব তথ্য দিয়েছেন সে সম্পর্কে সত্য তথ্য জানাতে চাই। ’৭৫ এর আগে গঙ্গার পানি নিয়ে কোন চুক্তি হয়নি-সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছিল। চুক্তি হয়েছে ১৯৭৭ সালে জিয়াউর রহমানের আমলে। এই চুক্তিতে যে গ্যারান্টি ক্লজ ছিল তা ১৯৯৬ সালে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক স্বাক্ষরিত চুক্তি থেকে বাদ দেয়া হয়। যার ফলে বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। খালেদা জিয়া ভারত সফরের সময় গঙ্গার পানির কথা বলতে ভুলে গিয়েছিলেন বলে প্রধানমন্ত্রী যে বক্তব্য দিয়েছেন তাও অসত্য।

মোশাররফ বলেন, ফেনী নদী আগে বাংলাদেশেরই নদী ছিল- যৌথ নদী ছিল না। বর্তমান সরকার আরও ৬টি যৌথ নদীর সঙ্গে ফেনী নদীর নাম সংযুক্ত করে একসঙ্গে এসব নদীর পানিবণ্টন নিয়ে আলোচনায় রাজি হয়। এবার ফেনী নদীকে আলাদাভাবে বিবেচনা করে তার পানি ভারতীয় একটি শহরের প্রয়োজনে দেয়ার চুক্তি হলো। আমাদের পররাষ্ট্র সচিব বিবিসিকে দেয়া সাক্ষাতকারে এই পানি না দিলে সাব্রুম শহর কারবালা হয়ে যেত বলে মন্তব্য করেছেন।

সংবাদ সম্মেলনে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, নজরুল ইসলাম খান, সেলিমা রহমান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাজাহান, বরকত উল্লাহ বুলু, যুগ্ম মহাসচিব মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, সাংগঠনিক সম্পাদক শামা ওবায়েদ, সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক সেলিমুজ্জামান প্রমুখ।

ছাত্রলীগ পেটুয়া লীগে পরিণত হয়েছে ॥ ছাত্রলীগ আজ পেটুয়া লীগ ও সন্ত্রাসী লীগে পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন। বুয়েটের ছাত্র আবরার হত্যার প্রতিবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, একজন মেধাবী ছাত্র হিসেবে সে যদি তার মতামত দিয়ে থাকে সে জন্য কি তাকে পিটিয়ে হত্যা করতে হবে? তাহলে স্বাধীনতা, কোথায়, মানবিক মূল্যবোধ কোথায়? বৃহস্পতিবার দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাবে শহীদ জেহাদ দিবস উপলক্ষে জেহাদ স্মৃতি পরিষদ আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।

সরকার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছে-মওদুদ ॥ আববার হত্যার ঘটনা প্রমাণ করে সরকার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ। বৃহস্পতিবার দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে এ্যাসোসিয়েশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশ (এ্যাব) আয়োজিত মানববন্ধনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ মন্তব্য করেন। মওদুদ বলেন, আবরার ফাহাদ সরকারী চুক্তির বিষয়ে প্রতিবাদ করেছিল। কিন্তু ছাত্রলীগের কর্মীরা যেভাবে তাকে হত্যা করেছে তাতে প্রমাণ করে এ সরকারের আর ক্ষমতায় থাকার অধিকার নেই। তাই এ সরকারের উচিত হবে এ মুহূর্তে পদত্যাগ করা। পদত্যাগ করে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের ব্যবস্থা করা। জনগণের ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা।

মওদুদ বলেন, প্রধানমন্ত্রী ভারত সফরে গিয়ে আমাদের জন্য কিছু না এনে ভারতের যা প্রয়োজন সেটা দিয়ে এসেছেন। অথচ প্রধানমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, বাংলাদেশের কোন স্বার্থ কোনদিন তিনি বিসর্জন দেবেন না। মানুষকে এত বোকা ভাবা তো ঠিক নয়। মওদুদ বলেন, ফেনী নদীতে শুষ্ক মৌসুমে এমনিতেই পানির অভাব থাকে। সেখানে প্রতি সেকেন্ডে ৫০ লিটার পানি ভারতে যাবে। অর্থাৎ প্রতিদিন চার লাখ লিটার পানি আমরা ভারতকে দিয়ে দেব। মানবিক কারণেই যদি এ চুক্তি হয়ে থাকে তাহলে তিস্তা নদীর পানিসহ ৫৪টা নদীর পানির হিস্যা আমরা পাই না কেন?

প্রকাশিত : ১১ অক্টোবর ২০১৯

১১/১০/২০১৯ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

শেষের পাতা



শীর্ষ সংবাদ: