২৩ ফেব্রুয়ারী ২০১৮, ১১ ফাল্গুন ১৪২৪, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
 
সর্বশেষ

বই পড়া, কেনা এবং বইমেলা

প্রকাশিত : ১১ ফেব্রুয়ারী ২০১৮
  • হাবিবুর রহমান স্বপন

যে বই পড়ে না তার মধ্যে মর্যাদাবোধ জন্ম নেয় না। বই কিনে কেউ কোন দিন দেউলে হয় না। বইয়ের ব্যবসা লাভজনক না জেনেও যারা ব্যবসা করেন তারা সত্যিই মহৎ। ক্রমশ মানুষ জ্ঞান-বিজ্ঞানে উন্নতি লাভ করছে। আমাদের দেশেও শিক্ষিতের হার বাড়ছে। তবে সর্বোচ্চ বুদ্ধিবৃত্তিক মান আশাব্যঞ্জক নয়। যারা বিজ্ঞতা দিয়ে, অভিজ্ঞতা দিয়ে, মেধা বা যোগ্যতা দিয়ে সমাজের কল্যাণ করবেন এমন মানুষ আমাদের খুবই কম।

জ্ঞানার্জনের জন্য বই পড়তে হয়। দুঃখজনক হলেও সত্য, বই পড়ার অভ্যাস কমেছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। আমরা ছোটবেলায় দেখতাম অনেক সাধারণ মানুষ বই কেনার সামর্থ্য নেই তারপরা এর-ওর কাছ থেকে বই ধার নিয়ে পড়ছেন। সাধারণ বই যেমন- গোয়েন্দা কাহিনী, পুঁথি, হাল্কা হাসির বই ইত্যাদি পড়তেন অনেকেই। এখন সাধারণ মানুষের মধ্যে সেই বই পড়ার অভ্যাস কমেছে। বেড়েছে টেলিভিশন দেখা এবং মোবাইল ফোনের ব্যবহার। একটি বাড়ির প্রায় প্রতিটি কক্ষে দামী টেলিভিশন আছে এবং বাড়ির প্রতিটি সদস্যের হাতে দামী মোবাইল ফোনও আছে। কিন্তু বাড়িতে বইয়ের সেল্ফ বা আলমারি নেই। যদিও বিজ্ঞজনরা বলেন, বইয়ের চেয়ে উৎকৃষ্ট আসবাব আর নেই। বইবিহীন কক্ষকে আত্মাবিহীন দেহের সঙ্গে তুলনা করা চলে। হ্যাঁ, এটা ঠিক, বই সবাই কিনতে ও পড়তে পারেও না। কারণ, বই একটা মননশীল চিন্তাশীল বিষয়। যে বই পড়ে সে অন্য রকম, জীবনযাপন সম্পর্কে তার একটা ধারণা থাকে। এটা খুব বেশি মানুষের মধ্যে নেই। সব মানুষই বই পড়বে তা সম্ভব না। এর সুযোগও নেই। তবে, যে বই পড়ে তার শত্রু কম।

পৃথিবীর যা কিছু শ্রেষ্ঠ জিনিস, শ্রেষ্ঠ চিন্তা, শ্রেষ্ঠ স্বপ্ন সবই বইয়ের মধ্যে। বই না পড়ার অর্থ হলো শ্রেষ্ঠ স্বপ্নগুলো থেকে দূরে থাকা। বই একটি জাতিকে মুক্তি দিতে পারে। যেমন এই যে রাজনৈতিক টানাপোড়েন, ক্ষুদ্র চেতনাসম্পন্ন মানুষ আমাদের রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে সব ল-ভ- করে দিচ্ছে। এ থেকে উচ্চতর মনের মানুষ দরকার। আলোকিত মানুষ দরকার। এর জন্য দরকার বই আর বই।

মানুষের বিকাশ খুবই রহস্যময় ব্যাপার। বিষয়টি দীর্ঘমেয়াদী যখন কেউ কোন সমাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন কিংবা নীতিনির্ধারক হয়ে ওঠেন- ঠিক বিভিন্ন ক্ষেত্রে, ভিন্ন জায়গায়, তখন ওই যে ছেলেবেলায় তার সুন্দর মনটা তৈরি হয়েছে। তার কাজের মধ্য দিয়ে সেই কাজের প্রতিফলন ঘটতে থাকে। ছোট সময়ে ওই যে তার মনটা বড় হয়েছিল, তার স্বপ্নটা বড় হয়েছিল, দৃষ্টিভঙ্গিটা বড় হয়েছিল। পরবর্তীতে তার সুফল জাতি পায়। এই মানুষই যদি এ প্রক্রিয়ার মধ্যে না আসতেন তিনি সাধারণ মাপের চিন্তা-চেতনা ধারণ করতেন। কিন্তু যেটা ছোটবেলায় বিকশিত হয় সেটা সারাজীবন তাকে প্রভাবিত করে। ভিত্তিটাই আসল। ছেলেবেলার বিকাশটা গুরুত্বপূর্ণ। ছেলেবেলার বড় মনটা বড় স্বপ্ন দেখায়। কর্মজীবনে এমন মানুষের সিদ্ধান্ত ভাল হবেই। তাতে দেশ ও জাতি উপকৃত হবে। বড় মন থেকে বড় স্বপ্নের জন্ম হয়। যে জাতির মন ছোট, সে জাতি বড় হবে কী করে? জাতি বড় হতে হলে মনও বড় হতে হবে। দেশে সুনাগরিক গড়ে তোলার প্রধান উপায় একটাই, তা হলো সুলিখিত এবং সৃষ্টিশীল ও মননশীল বই।

বিশ্ববিখ্যাত লেখক ম্যাক্সিম গোর্কি বলেছেন, ‘আমার মধ্যে উত্তম যদি কিছু থাকে তার জন্য আমি বইয়ের কাছে ঋণী।’ বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ‘ধন বল আয়ু বল, অন্যমনস্ক ব্যক্তির ছাতা বল, সংসারে যত কিছু মরণশীল পদার্থ আছে বাংলা বই হচ্ছে সকলের সেরা।’ শ্রেষ্ঠ বইগুলো হচ্ছে শ্রেষ্ঠ বন্ধু।

গত প্রায় চার দশক ধরে রাজধানী ঢাকায় ‘একুশে গ্রন্থমেলা’ হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে ছোট পরিসরে বইমেলা হয়। বইমেলাকে কেন্দ্র করে লেখক ও প্রকাশকগণ বই প্রকাশ করেন। যদিও সারা বছরই বই প্রকাশিত হয়। তবে প্রকাশনা ব্যবসায় এখন মুনাফাকেই প্রাধান্য দেয়ার প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। প্রকাশক লেখকের চেয়ে বেশি বা সমপর্যায়ের জ্ঞানী মানুষ। প্রকাশককে হতে হয় চৌকস। তাঁকে জ্ঞান-বিজ্ঞান সবক্ষেত্রেই কম-বেশি অবহিত হতে হয়। প্রকাশকের ভূমিকাই এখানে মুখ্য। চাইলেই যে কেউ বই বের করতে পারে না। কিন্তু এখন কী দেখা যাচ্ছে? যে কেউ বই লিখতে পারেন, বই ছাপতে পারেন, কোন বাধা কিংবা নিয়ম-কানুন নেই। বই লিখতে বা ছাপতে জ্ঞানী হওয়ার বাধ্যবাধকতা নেই। কেউ হয়ত দু’-চারটি লাইন লিখতে শিখেছেন, নিজের চেনা-জানা পরিম-লে এই ‘অনন্য কীর্তি’ দেখিয়ে বাহবাও পাচ্ছেন। বাহবার পরিমাণ আরও বাড়াতে এক সময় তাঁর মনে জেগে ওঠে স্বপ্নচারা। মুদ্রণশিল্প অনেক অগ্রসর হয়েছে। যে কেউ নিজের লেখা বই নিজেই ছেপে ফেলতে পারেন, যদি খরচ করার টাকা তার পকেটে থাকে। এর বাইরে যারা নিজেরা করবেন না, প্রকাশককে দিয়ে করাবেন- তাদেরও চিন্তার কারণ নেই। চাইলেই হয়ে যাবে। প্রকাশক শুধু বই প্রকাশ করার জন্যই দরকার নয়, -বইয়ের প্রচারের ব্যাপার আছে, বাজারজাত বড় বিষয়। কারও মনে যখন প্রচার, বাজারজাতের চিন্তা উদয় হবে, তখন অবশ্যম্ভাবী তাকে প্রকাশকের দ্বারস্থ হতেই হবে। প্রকাশকের কাছে এখন ব্যবসাটা মুখ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতে দেখা যাচ্ছে- যা খুশি লিখছেন, আর প্রকাশক নগদপ্রাপ্তির বিনিময়ে তা প্রকাশ করছেন। তৃতীয় পক্ষ পাঠক সেখানে গৌণ হয়ে যাচ্ছেন।

পাবলিককে যা ‘খাওয়ানো’ হবে তাই-ই খাবে! এক-আধটু লিখতে-পড়তে জানলে আর পকেটে টাকা থাকলেই হলো- লেখক হওয়া ঠেকায় কে? লেখক হওয়া কঠিন কোন বিষয় নয়। যা কিছু মুদ্রিত তাই মানসম্পন্ন! ভাল-মন্দ মিশিয়েই সবকিছু। যারা লেখেন তাদের প্রায় সবারই দৃঢ় ইচ্ছা থাকে, ভাল কিছু সৃষ্টি করার। সৃষ্টির পথে সফল হোন গুটিকয়েক মানুষ। অন্যরা কোন রকমে থাকার মতো থাকেন। প্রযুক্তি সহজ এবং নাগালে থাকায় বই প্রকাশ করা এখন খুবই সহজ হয়েছে। কোন কোন লেখক ডজন ডজন বই লিখেছেন। এখনও শুদ্ধ করে ভাবতে পারেন না, লেখকের যে নিজস্ব চিন্তা, দর্শন থাকতে হয় তাও জানেন না, বানান, বাক্য শুদ্ধ নয়, কী বলতে চান তাও পরিষ্কার নয়, তার পরেও বই লিখছেন।

এ প্রসঙ্গে একদিনের ঘটনা বলার লোভ সামলাতে পারছি না। একুশে গন্থ মেলায় প্রয়াত লেখক হুমায়ুন আজাদ বসতেন আগামী প্রকাশনীর স্টলে। তিনি বসে ভক্ত অনুরাগীদের অটোগ্রাফ দিচ্ছিলেন। একজন নতুন লেখক, বই লিখেছেন। তিনি হুমায়ুন আজাদকে বইটি দিয়ে পড়ার অনুরোধ করে বিদায় নিলেন। হুমায়ুন আজাদ বইটি হাতে নিয়ে উল্টেপাল্টে দেখলেন। তার পর পাশে বসে থাকা নবীন লেখক আমার বন্ধু রুদ্রাক্ষ রাহমানের হাতে বইটি দিয়ে বললেন- পড়, ভুল বের কর। বইটি মনোযোগ সহকারে দেখে রুদ্রাক্ষ রহমান বললেন, স্যার- ভুল বের করতে পারলাম না। এবার হুমায়ুন আজাদ তার ¯েœহভাজন অনুজ লেখকের ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে বললেন, তোমরা সবাই এমন মুর্খ কেন? তারপর বইয়ের প্রথম বাক্যটি পড়লেন, ‘তারা পরস্পর হাঁটছে’। হুমায়ুন আজাদ বললেন, ‘পরস্পর হাঁটা যায় না। পাশাপাশি বা আগে পিছে হাঁটা যায়। একজনের হাঁটা আরেকজন হেঁটে দিতে পারেন না।’ হুমায়ুন আজাদ বইটি ছুড়ে ফেলে দিলেন এবং বললেন, যে উপন্যাসের প্রথম বাক্যেই ভুল সে বইপড়া যায় না।

প্রমথ চৌধুরীর একটি বিখ্যাত উক্তি মনে পড়ে গেল,- বই কিনলেই যে পড়তে হবে, এটাই হচ্ছে পাঠকের ভুল, বই লেখা জিনিসটে একটা শখমাত্র হওয়া উচিত নয় কিন্তু বই কেনাটা শখ ছাড়া আর কিছু হওয়া উচিত না।’ লেখালেখি একটি শ্রমসাধ্য কাজ। খুব কম সংখ্যক মানুষই পারেন, এই কঠিন কাজে নিজেকে যথাযথভাবে ডুবিয়ে রাখতে। নাম কামানো বা হুজুগের বশবর্তী হয়ে, শিল্পের জন্য শিল্প সৃষ্টি করতে। অবশ্য প্রতিভাও একটা বিষয়। কারও প্রতিভা নেই কিন্তু চেষ্টার পর চেষ্টা করে যাচ্ছেন। সহজেই কাউকে ভাল বা খারাপ লেখক হিসেবে আখ্যায়িত করা যায় না। ভাল খারাপ নির্ধারণের সুনির্দিষ্ট কোন মানদ- নেই। একজনের কাছে যা ভাল অন্যজনের কাছে তা মন্দ। আবার আরেকজনের কাছে যা খারাপ অন্যজনের কাছে তাই উপাদেয়! সুতরাং লেখকের মধ্যে শ্রেণী-বিভাজনের বা বিতর্কের অবকাশ নেই। তবুও এসবের ভেতর থেকেই কেউ কেউ উতরে যান। কোন কোন লেখক দৃষ্টি আকর্ষণ করেন পাঠকের, বোদ্ধাজনের।

পাঠকেরও এখন ব্যস্ত হওয়ার, বিনোদন উপকরণের কমতি নেই। আধুনিক প্রযুক্তির ‘ফেসবুক’, ‘টুইটার’ ইত্যাদি কত কি এখন নবপ্রজন্মকে আটকে রাখছে। তারপরও কিছু পাঠক আছেন যাঁরা গড্ডালিকাপ্রবাহ ভেসে যাননি। এখনও বইয়ের পাতায় খুঁজে নেন যাপিতজীবনের কাক্সিক্ষত-অনাকাক্সিক্ষত ছবি। বই থেকেই লাভ করতে চান নতুন জীবনবোধ। বই কেনা এখনও বেশিরভাগ মানুষের কাছে বিলাসিতার মধ্যে পড়ে। আগে তার মৌলিক চাহিদা পূরণ, তার পর বই। উদরের জন্য খাদ্যরস আহরণের পরই আসে মনের পুষ্টিরসের প্রশ্ন। যাদের বই কেনার সামর্থ্য আছে- বলাবাহুল্য, তাদের অনেকই বইয়ের ভুবন থেকে অনেক দূরে অবস্থান করেন!

মানুষের ক্ষেত্রে যেমন বইয়ের ক্ষেত্রেও তেমনই। অল্প সংখ্যকই মহান ভূমিকা পালন করে বাকি সব হারিয়ে যায় আগমনের মধ্যে। অর্থাৎ পৃথিবীতে কত মানুষের জন্ম হয়। এর মধ্যে কয়েকজন স্মরণীয় হোন। অন্যরা হারিয়ে যান। তেমনই কত বই-ই প্রকাশিত হয়। তার মধ্যে কিছু বই হয় কালজয়ী। ইতালিতে একটি প্রবাদ প্রচলিত ‘খারাপ বইয়ের চেয়ে নিকৃষ্টতম তস্কর আর নেই।’ কিছু বই আছে যেগুলোর প্রচ্ছদ ও পেছনের মলাটই হলো সেরা অংশ।

জীবন নিতান্তই একঘেয়ে, দুঃখ-কষ্টে ভরা, কিন্তু মানুষ বই পড়তে বসলেই সে সব ভুলে যায়। ব্যায়ামের দ্বারা মনেরও তেমন উন্নতি হয়ে থাকে। বই হচ্ছে শ্রেষ্ঠ আত্মীয়, যার সঙ্গে কোনদিন ঝগড়া হয় না, মনোমালিন্য হয় না। মনে রাখতে হবে ভাল বই পড়তে হবে। একটি ভাল বই হলো বর্তমান ও চিরদিনের জন্য সবচেয়ে উৎকৃষ্ট বন্ধু। এককালে পৃথিবী বইয়ের ওপর কাজ করত। এখন বই-ই পৃথিবীর ওপর কাজ করে।

বই পাঠকের জন্য টমাস হুডের বাণী- ‘আমি তাকে করুণা করি কারণ সে প্রতিদিন প্রচুর মাখন খায় কিন্তু বই পড়ে না।’ শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বলেছেন, ‘বই পড়াকে যথার্থ হিসেবে যে সঙ্গী করে নিতে পারে, তার জীবনের দুঃখ-কষ্টের বোঝা অনেক কমে যায়।’ আর লেখকের জন্য উক্তি করেছেন বিখ্যাত দার্শনিক বার্টান্ড রাসেল ‘বই কেনাটা নিষ্পাপ বৃত্তি এবং এতে দুষ্কর্মের থেকে নিজেকে রক্ষা করা যায়।’ আর বই প্রকাশক ও বই বিক্রেতাদের উদ্দেশ্যে বলি- ‘ভাল বই প্রকাশ ও বিক্রি করে আপনিও ইতিহাসে স্থান করে নিতে পারেন।’

সর্বশেষে কালজয়ী লেখক, লিও টলস্টয়ের সঙ্গে সুর মিলিয়ে বলতে হয়- ‘জীবনে মাত্র তিনটি জিনিসের প্রয়োজন বই বই আর বই।’

hrahman.swapon@gmail.com

প্রকাশিত : ১১ ফেব্রুয়ারী ২০১৮

১১/০২/২০১৮ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


শীর্ষ সংবাদ: