১৯ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৭ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

ইন্দোনেশিয়া ॥ সঙ্কটে জোকোভি


বিশ্বের সর্বাধিক জনবহুল মুসলিম রাষ্ট্র ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট জোকো উইডোডো কিংবা যে নামে তিনি সর্বাধিক পরিচিত সেই জোকোভির সময়টা ভাল যাচ্ছে না। অর্থনীতির অবস্থা তেমন ভাল নয়। সমাজে সম্পদের বৈষম্য বাড়ছে। নির্বাচিত হওয়ার আগে তিনি যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তার অনেকগুলোই রক্ষা করতে পারেননি। এ অবস্থায় ২০১৯ সালে অনুষ্ঠেয় নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে আসছে। সেই নির্বাচনকে তিনি দ্বিতীয় মেয়াদের জন্য দাঁড়াতে চান। তবে পুনর্নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা মোটেও উজ্জ্বল নয়।

অথচ ২০১৪ সালে তিনি যখন নির্বাচিত হন উৎসাহী পর্যবেক্ষকরা সেটিকে ইন্দোনেশিয়ার রাজনীতিতে মোড় পরিবর্তন হিসেবে দেখেছিল। নির্বাচনী প্রচারে তিনি সততা ও বিনয় নম্রতার ওপর জোর দিয়েছিলেন। ভাঙ্গাচোড়া রাস্তাঘাট, বন্দর ও বিমানবন্দর উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। রাজনীতি থেকে ঘুষ-দুর্নীতি দূর করার ও বিদেশী বিনিয়োগ বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। সামাজিক মিডিয়ার একনিষ্ঠ ব্যবহারকারী জোকোভি ইউটিউবে নিয়মিত আপলোড দিয়ে থাকেন যার জন্য বেশিরভাগ রাজনীতিকের তুলনায় তিনি জনগণের অনেক বেশি কাছের।

ক্ষমতার প্রথম বছর জোকোভি সংস্কারকের ভূমিকায় আবির্ভূত হন, ঠিক যেমনটি ভেবেছিল উদারপন্থীরা। জ্বালানি খাতে তিনি অপচয়মূলক ভর্তুকি বাতিল করেন এবং এক জনপ্রিয় স্বাস্থ্যবীমা স্কিম চালু করেন যে স্কিমের আওতায় চলে আসে ১৩ কোটি নিবন্ধিত সদস্য অর্থাৎ জনগোষ্ঠীর প্রায় অর্ধেক। অবকাঠামো উন্নয়নে রাষ্ট্রের ব্যয় ২০১৪-১৫ সালে ৫১ শতাংশ বেড়ে গিয়ে ১৫৫০ কোটি ডলারে দাঁড়ায়। তিনি দুর্নীতি দমন কমিশনকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দেন যদিও পার্লামেন্ট বার বার কমিশনকে নখদন্তহীনে পরিণত করার চেষ্টা করছিল। এ সবের কারণে ব্যক্তিগত পরিসরে তার বিশাল জনপ্রিয়তা সৃষ্টি হয়। শহর ও গ্রামাঞ্চলে এবং শিক্ষার বিভিন্ন স্তরের মানুষদের কাছে তার জনপ্রিয়তা প্রায় ৬৮ শতাংশে দাঁড়ায়।

তার পরও জোকোভির পুনর্নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা অনুজ্জ্বল। গত সেপ্টেম্বরে পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা যায় যে জরিপভুক্তদের মাত্র ৫০ শতাংশ তাকে ভোট দেবে। তা থেকে বোঝা যায় ২০১৯ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনটা এক হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে আগের বারের মতোই। সে সময় জোকোভি ৫৩ শতাংশ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছিলেন। গত এপ্রিলে জাকার্তার গবর্নর পদে নির্বাচনে জোকোভির মিত্র আহোক হেরে যান। অথচ তার জনসমর্থন ছিল অনেক বেশি। তা ছাড়া ক্ষমতায় থেকে নির্বাচন করার তো আলাদা একটা সুবিধা আছে। তার পরও তার এই বিপর্যয় ইন্দোনেশিয়ার রাজনীতিকে অনেক বেশি অনিশ্চিত করে তুলেছে।

সমস্যার একাংশ জোকোভি নিজেই। তিনি মুসলমান হলেও দৃষ্টিভঙ্গির দিক দিয়ে ধর্মনিরপেক্ষ। সে কারণে ধর্মীয় উগ্রপন্থীরা মাথা চাড়া দিচ্ছে। গত নির্বাচনী প্রচারের সময় এরা গুজব ছড়িয়েছিল যে জোকোভি প্রকৃতপক্ষে খ্রীস্টান। জোকোভি ২০১২ সালে জাকার্তার গবর্নর পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সময় আহোক ছিলেন। তার রানিং মেট ও ডেপুটি। এই আহোক নিজে খ্রীস্টান। গবর্নর পদে আহোকের প্রতিদ্বন্দ্বিতার সময় ইসলামপন্থীরা তা তার ধর্মমতকে ইস্যুতে পরিণত করে। এমনও অপপ্রচার চালায় যে আহোক পবিত্র কোরানের সমালোচনা করেছেন। তার ফলে ব্লাসফেমির অভিযোগে তার দু’বছর কারাবাস চলছে। ইসলামিক ডিফেন্ডার ফ্রন্ট নামে একটি গ্রুপ এই প্রচারের পেছনে ছিল। গত ২৯ সেপ্টেম্বর এই সংগঠনই জাকার্তায় জোকোভি ও আহোকের বিরুদ্ধে ব্যাপক বিক্ষোভের আয়োজন করে। তারা এমনও বলে যে এই সরকার পুঁজিবাদের প্রসার ঘটাচ্ছে। সম্পদের সুষ্ঠু বণ্টন না থাকায় ধনী আরও ধনী ও গরিব আরও গরিব হচ্ছে। ধর্মীয় বিক্ষোভকারীদের মধ্যে শুধু যে এরাই আছে তা নয়, আরও বেশকিছু সংগঠন আছে।

ইন্দোনেশিয়ার বেশিরভাগ মুসলমানের তাদের ধর্মের বিভিন্ন দিকের প্রতি রয়েছে শিথিল দৃষ্টিভঙ্গি। যেমন ধরা যাক হজ। মাত্র ১১ শতাংশ মনে করে এটা একান্তই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু অনেক এলাকার মানুষের মধ্যে ধর্মীয় গোড়ামি আছে। ৬৭ শতাংশ মনে করে শরিয়তী আইন চালু হওয়া দরকার। তাতে নৈতিক মূল্যবোধ জোরদার হবে। মেয়েদের হিজাব পরা দরকার। সুহার্তোর পতনের পর ধর্মীয় সহিংসতার জোয়ার উঠলেও পরে তা স্তিমিত হয়ে যায়। এখন তা আবার ফিরে আসছে।

কিন্তু জোকোভির জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়ার পেছনে ধর্মীয় উন্মাদনা একমাত্র কারণ নয়। অর্থনীতি চাঙ্গা থাকলে ধর্মীয় ইস্যুগুলো বিরোধীদের হাতে কার্যকর হাতিয়ার হতে পারত না। ২০১৪ সাল থেকে জিডিপির ৫ শতাংশের আশপাশেই ঘুরপাক খাচ্ছে যা জোকোভির পূর্বসূরির সময়কার প্রবৃদ্ধির নিচে এবং ১৯৭০ ও ৮০-এর দশকের সময়কার চাইতে আরও নিচে। পণ্যমূল্য কমে যাওয়ায় এবং জটিল বিধিনিয়ম থাকার কারণে বিনিয়োগে ভাটা পড়েছে। অবকাঠামো ব্যয়ও ২০১৪ এর পর মন্থর হয়েছে। এ সবই জোকোভির জনপ্রিয়তার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

সূত্র : দি ইকোনমিস্ট