২০ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৪ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

বঙ্গবন্ধুর জীবন ও রাজনীতি এবং বাংলাদেশের সৃষ্টি


(গতকালের পর)

এই বছরই বাঙালীদের পরিচিতি থেকে বাঙালীয়ানার শেষ চিহ্ন মুছে দেয়ার গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে পূর্ব বাংলাকে পূর্ব পাকিস্তান নামকরণ করা হয়। সরকারের এই একতরফা সিদ্ধান্তে মুজিব ক্ষুব্ধ হন। সংসদে দাঁড়িয়ে বাঙালী সংস্কৃতি, কৃষ্টি মুছে ফেলার ষড়যন্ত্রের পরিণতি ভবিষ্যতে শুভ হবে না এই মর্মে শাসক শ্রেণী ও তাদের এই দেশীয় দালালদের বিরুদ্ধে তিনি কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। ১৯৫৬ সালে শেখ সাহেব পুনরায় মন্ত্রী এবং একই বছর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। মন্ত্রী অপেক্ষা দলের সম্পাদকের দায়িত্বই তাঁর কাছে অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়। তাঁর মতে দুটি দায়িত্ব কোনভাবেই একসঙ্গে পালন করা সম্ভব নয়। তাই আওয়ামী লীগকে জনগণের দলে পরিণত করার সংকল্প থেকে তিনি মন্ত্রিত্ব ত্যাগকরত সম্পূর্ণভাবে দলীয় কর্মকা-ে নিজেকে নিবেদিত করেন। ১৯৫৮ সালের অক্টোবরে ইসকান্দার মির্জাকে হটিয়ে আইয়ুব খান ক্ষমতা দখল করেন। নিজ শাসনকে দীর্ঘস্থায়ী ও ঝামেলামুক্ত করার উদ্দেশ্য নিয়ে শেখ মুজিবুর রহমানকে দ্রুতই কারাগারে পাঠান হয়। এখানে উল্লেখ্য, বারংবার কারাগারে আসা-যাওয়া এবং রাজনীতি নিয়েই ব্যস্ততা তাঁর পারিবারিক জীবনকে একেবারে বিপর্যস্ত করে তুলেছিল। পরিবারের জন্য সবচেয়ে কষ্ট ও বিব্রতকর ব্যাপার ছিল সরকারী গোয়েন্দা সংস্থাসমূহের উপদ্রব। পর্দার অন্তরালে এই টিকটিকির দলের চোখ রাঙানিতে ভীত হয়ে কোন বাড়িওয়ালাই মুজিব পরিবারকে বাড়ি ভাড়া দিতে চাইত না। তারপরও হাল ছাড়েননি পিতা শেখ লুৎফর রহমান। ব্যক্তিজীবনে আগাগোড়াই তিনি খুব ধার্মিক ছিলেন; কিন্তু পুত্রের ভবিষ্যত নিয়ে জ্যোতিষের মন্তব্য তাঁর মন থেকে কখনই মুছে যায়নি। তাঁর বিশ^াস জন্মেছিল মুজিব হয়ত একদিন ইতিহাসের নায়ক হবে। তাই প্রিয় খোকাকে ঝামেলা ও চিন্তামুক্ত রাখতে ছেলের পরিবারকে সকল ঝড়-ঝাপটা থেকে সর্বদা আগ্লে রাখেন। অন্যদিকে বেগম মুজিবের ধৈর্য, স্বামীর প্রতি অন্ধ ভালবাসা ও সহযোগিতা ছিল অতুলনীয়। ছোট ছোট ছেলেমেয়ে নিয়ে সংসার সামাল দিয়ে তিনি তাঁর স্বামীকে সব সময়ই মানসিকভাবে উজ্জীবিত রেখেছেন। সম্মুখে কালো মেঘ দেখেও স্বামীকে পেছনে টেনে ধরেননি, নিজে কখনই মনোবল হারাননি। এমন সৌভাগ্যবান সন্তান ও স্বামী ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। সম্ভবত এ কারণেই সংসার নিয়ে ব্যস্ত থাকা অপেক্ষা দেশ ও জাতির জন্যই অধিকতর সময় ও মনোযোগ দিতে পেরেছিলেন তিনি।

এরপর ১৯৬১ সালের ৭ ডিসেম্বর হাইকোর্টের নির্দেশে সরকার তাঁকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। জেলের বাইরে আসতে দেয়া হলেও তাঁকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখার উদ্দেশ্যে আইয়ুবের সামরিক সরকার ডিক্রী জারি করে। কিন্তু এতদিনে জেল খাটা তাঁর গা সওয়া হয়ে গেছে। অতএব পুনরায় জেলে যাওয়ার মানসিক প্রস্তুতি নিয়েই গোপনে তিনি তাঁর স্বপ্ন অর্থাৎ স্বাধীনতার মহাপরিকল্পনা ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতাদের কাছে তুলে ধরেন। তারা মুজিবের পরিকল্পনা লুফে নেয়। তাঁর পরিকল্পনা অনুযায়ী গোপনে স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ এবং মহকুমা- থানা পর্যায়ে নিউক্লিয়াস গঠন করা হয়। নথি ও দালিলিক তথ্য-প্রমাণ না পেলেও কিছু একটা হচ্ছে এমনটি আঁচ করতে পেরে ১৯৬২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিবকে জননিরাপত্তা আইনে আটক করা হয়। ৮ জুন সামরিক শাসন প্রত্যাহার করা হলে তাঁকে আর বেশিদিন কারাগারে আটকে রাখা সম্ভব হয়নি। এরপর তিনি সোহরাওয়ার্দীকে নিয়ে গ্রামে-গঞ্জে সাংগঠনিক সফরে বের হন। এই বছরে শিক্ষা কমিশনের বিরুদ্ধে ছাত্ররা আন্দোলনে নামে। ওয়াজিউল্লাহ ও বাবুল শহীদ হন। অবশেষে এই শিক্ষা কমিশন তারা বাতিল করতে বাধ্য হয়। এই আন্দোলনের পেছনে শেখ মুজিবের প্রচ্ছন্ন সমর্থন ছিল। তাঁর সমর্থনের আসল উদ্দেশ্য পরবর্তীকালে স্পষ্ট হয়ে যায়। যে বৃহত্তর আন্দোলন ও স্বপ্নের পেছনে তিনি ছুটছেন সেই স্বাধীনতা অর্জনের জন্য যে তাঁর এই ছাত্র সমাজেরই প্রয়োজন হবে। ১৯৬৩ সালে মোনেম খান গবর্নর নিযুক্ত হলে শেখ মুজিবুর রহমানের ওপর নির্যাতনের মাত্রা আরও বেড়ে যায়। গবর্নর হয়েই তিনি এই মর্মে হুঙ্কার ছাড়েন যে, মোনেম খান যতদিন এই চেয়ারে আছে ততদিন শেখ মুজিব জেলের বাইরে থাকতে পারবে না। গবর্নরের হুঙ্কারের প্রতিক্রিয়ায় আরমানিটোলা ময়দানে জনসভায় দাঁড়িয়ে তিনি কৌতুক প্রকাশ এবং আবদুল মোনেম খানকে ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানের সুযোগ্য পুত্র হিসেবে তিরস্কার করেন। ১৯৬৩ সালের ডিসেম্বরে বৈরুতে নেতা সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুতে মুজিব তাঁর রাজনৈতিক অভিভাবককে হারান। আওয়ামী লীগের দায়িত্ব তাঁর কাঁধে এসে পড়ে। ২৫ জানুয়ারি ’৫৭ সালে আওয়ামী লীগ পুনর্গঠিত হলে মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগিশ সভাপতি ও শেখ মুজিবুর রহমান সাধারণ সম্পাদক পুনর্নির্বাচিত হন। ৮ ও ৯ মার্চ ’৬৪ মোনেম খান ও তার সাঙ্গ-পাঙ্গদের প্ররোচনায় পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন এলাকায় হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা হয়। ১১ মার্চ শেখ মুজিবের নেতৃত্বে সর্বদলীয় দাঙ্গা প্রতিরোধ কমিটি গঠন করা হয়। ওইদিনই তিনি ‘পূর্ব পাকিস্তান রুখিয়া দাঁড়াও’ মর্মে বিবৃতি এবং ঢাকায় দাঙ্গাবিরোধী মিছিলে নেতৃত্ব দেন। এর সুফল হিসেবে খুব দ্রুতই দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণে আসে।

১৯৬৪ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ঘোষণা দেয়া হয়। সম্মিলিত বিরোধী দলের পক্ষে পাকিস্তানের জাতির পিতার ভগ্নি ফাতেমা জিন্নাহকে মনোনয়ন দেয়া হয়। মুজিব প্রচারাভিযানের এই সময় সুযোগটুকু পুরোপুরি কাজে লাগান। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলসমূহে প্রচারাভিযানকালে তিনি দলীয় নেতাকর্মীদের আগামী দিনের কঠিন আন্দোলনের প্রস্তুতি নেয়ার আহ্বান জানান। নির্বাচনী প্রচারাভিযানের নামে মুজিব পাকিস্তানের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে উস্কানিমূলক বক্তব্য রাখছেন এমন অভিযোগ এনে নির্বাচনের ক’দিন আগে তাঁকে আটক এবং এক বছরের কারাদ- দেয়া হয়। কিন্তু হাইকোর্ট তাঁকে মুক্তিদানের নির্দেশ দেয়। ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধ পূর্ব পাকিস্তানের জন্য আরেকটি টার্নিং পয়েন্ট এবং মুজিব কর্তৃক বাঙালীদের ঘুম জাগানিয়ার গান শোনানোর সুযোগ এনে দেয়। যুদ্ধকালে এই অঞ্চলের কোন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা না থাকায় পূর্ব পাকিস্তান শত্রুর করুণা ও দয়ার ওপর নির্ভর হয়ে পড়ে। পশ্চিমাদের এমন বিমাতাসুলভ আচরণে শেখ মুজিব ক্ষুব্ধ ও হতাশ হন। তিনি জাতির সম্মুখে মাতৃভূমির এমন দুরবস্থার চিত্র তুলে ধরেন। এই যুদ্ধ পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি শাসকশ্রেণীর চরম অবহেলা মুজিবকে স্বাধীনতার পথে হাঁটার গতি বাড়িয়ে দেয়ার তাগিদ দেয়। এ ব্যাপারে তিনি প্রথম সারির কয়েকজন বিশ^স্ত দলীয় নেতা এবং প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীর সঙ্গে পরামর্শ করেন। শেখ মুজিবুর রহমান তাদের কাছে নিজের লক্ষ্য তুলে ধরেন। তুলে ধরেন ঐতিহাসিক ছয় দফা। ১৯৬৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে লাহোরে অনুষ্ঠিত হয় বিরোধী দলের বৈঠক। শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর ছয় দফা নিয়ে এই বৈঠকে উপস্থিত হন এবং তা উপস্থাপন করেন। ছয় দফা নিছক তাঁর স্বায়ত্তশাসনের দাবি নয়, ভবিষ্যতে পূর্ব পাকিস্তানকে স্বাবলম্বী করার মাধ্যমে স্বাধীনতার পথে নিয়ে যাওয়ার সুক্ষ্ম পরিকল্পনা। তাই শাসকগোষ্ঠী তো বটেই, এমনকি বাংলার মাটিতে জন্ম, আলো বাতাসে বেড়ে ওঠা অনেক বাঙালী নেতা ছয় দফাকে বিচ্ছিন্নতাবাদের সনদ আখ্যায়িত করে তা নাকচ করে দেন। তারা প্রকারান্তরে শেখ মুজিবুর রহমানকে পাকিস্তানের শত্রু আখ্যায়িত করেন। পরদিনই শেখ সাহেব ঢাকায় ফিরে আসেন। পহেলা মার্চ তিনি আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। ছয় দফাকে জনগণের দাবিতে পরিণত করার লক্ষ্য নিয়ে তিনি এবার পূর্ব পাকিস্তানের মাঠ-ঘাট, পথ-প্রান্তর চষে বেড়ান। ছয় দফার পক্ষে এত দ্রুত গণজাগরণ সৃষ্টি হবে তা সরকার তো বটেই, স্বয়ং শেখ সাহেবও ভাবেননি। তিনি ভেবেছিলেন ছয় দফাকে বাঙালীদের আত্মস্থ করাতে হয়ত আরও দু’এক দশক সময় ব্যয় করতে হবে এবং অবশ্যই এই দীর্ঘ সময় তাঁকে আইয়ুব-মোনেম খানের জেলের ঘানি টানতে হবে। ছয় দফার পক্ষে প্রচারণা বাধাগ্রস্ত করতে আইয়ুব-মোনেম সরকার তাঁর বিরুদ্ধে সিলেট-খুলনা-যশোর-কুষ্টিয়া-ময়মনসিংহ-নারায়ণগঞ্জ-ঢাকায় একের পর এক মামলা ও হয়রানির খেলায় মেতে ওঠে। তিন মাসে তাঁকে মোট আটবার আটক ও মুক্তি দেয়া হয়।

চলবে...