২৫ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ২ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

সঠিক যাকাত আদায়ের মাধ্যমে দারিদ্র্য কমানো সম্ভব


ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে যাকাত অন্যতম। যাকাত অর্থ পরিচ্ছন্নতা, পবিত্রতা ও বৃদ্ধি। মুসলমানদের নিসাব পরিমাণ ধন-সম্পদের একটি নির্দিষ্ট অংশ বছর পূর্তিতে আল্লাহ তায়ালার নির্ধারিত খাতসমূহে ব্যয় করাকে যাকাত বলে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আর তাদের (ধনীদের) সম্পদে অবশ্যই দরিদ্র ও বঞ্চিতদের অধিকার রয়েছে’ (আল-যারিয়াত-১৯)। যাকাত ইসলামে ধনী-গরিবের মধ্যে সেতুবন্ধ। নিসাব মানে নির্ধারিত পরিমাণ বা মাত্রা। যে পরিমাণ সম্পদ থাকলে যাকাত ফরজ হয় তাকে নিসাব বলে। অর্থাৎ দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় ব্যয় বাদে নিসাব পরিমাণ মালের অধিকারী হলে বছর পূর্তিতে একটি নির্দিষ্ট অংশ আল্লাহর নির্ধারিত খাতে যাকাত দিতে হয়। যেসব সম্পদ নিসাব পরিমাণ থাকলে যাকাত দিতে হয় সেগুলো হলো- ১. স্বর্ণ, রুপা (নগদ অর্থ ও গহনাপত্রসহ) ২. গবাদিপশু ৩. জমিতে উৎপন্ন ফসল ৪. ব্যবসা-বাণিজ্যের পণ্য ৫. অর্জিত সম্পদ ইত্যাদি। স্বর্ণ সাড়ে সাত ভরি বা সাড়ে সাত তোলা (৮৭.২৫ গ্রাম) বা রুপা সাড়ে বায়ান্ন তোলা (৬১২.২৫ গ্রাম) অথবা এর তৈরি গহনা থাকলে যাকাত দিতে হয়। এর কোন একটি অথবা উভয়টির মূল্য পরিমাণ অন্য কোন সম্পদ থাকলেও তার মূল্যের আড়াই শতাংশ হারে যাকাত দিতে হবে।

যাকাত দেয়ারও একটি নিয়ম রয়েছে। সবাইকে যাকাত দেয়া যাবে না। যাদের যাকাত দেয়া যাবে তারা হলেন- ১. ফকির বা অভাবগ্রস্ত ২. মিসকিন বা সম্পদহীন ৩. যাকাতের জন্য নিয়োজিত কর্মচারী ৪. ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হতে পারে এমন ব্যক্তি ৫. দাসমুক্তি ৬. ঋণগ্রস্ত ৭. আল্লাহর পথে সংগ্রামকারী ও ৮. অসহায় পথিকের জন্য।

যাকাত কিন্তু গরিবের জন্য কোন ধরনের দয়া প্রদর্শন নয়। বরং এটি যাকাত প্রাপ্তযোগ্য ব্যক্তির বাড়িতে গোপনে পৌঁছে দিতে পারলে আরও বেশি ভাল। কোন ব্যক্তির সম্পত্তি যাকাত প্রদানযোগ্য হলে তা পরিশোধ না করা পর্যন্ত তার ধন-সম্পত্তি পাক-পবিত্র হয় না। যাকাতপ্রাপ্তিতে ধনীদের প্রতি গরিবদের দাবি রয়েছে। বরং ধনী ব্যক্তি গরিবের হক মেরে খাচ্ছেন হিসেবে বিবেচনা করলেও ভুল হবে না। কারণ ইসলাম ধর্মমতে, সবার মধ্যে ধনী-গরিবের ব্যবধান কমিয়ে আনার জন্য যাকাতকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে রাখা হয়েছে। মানুষের অর্জিত সম্পদের সুষম বণ্টনের জন্য রাজনৈতিকভাবে গণতান্ত্রিক, সমাজতান্ত্রিক, ধনতান্ত্রিক কতশত সমাজব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে। সবকিছুই হলো মানুষের কল্যাণ ও সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহারের জন্য; কিন্তু ইসলাম ধর্মের যাকাত বিধান হলোÑ সমাজের আর্থিক ভারসাম্য রক্ষা করার জন্য একটি উৎকৃষ্টতম পন্থা। এই যাকাত বিতরণ করতে গিয়ে প্রতিবছর কোথাও না কোথাও দেখা দেয় বিপত্তি। যেমন গত বছর অনিয়মতান্ত্রিক ও অগোছালোভাবে যাকাত বিতরণ করতে গিয়ে ময়মনসিংহে ২৭ হতদরিদ্র মানুষের প্রাণ ঝরে পড়েছিল। এক পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত এই যাকাত বিতরণ করতে গিয়ে নানা স্থানে বিভিন্ন সময়ে প্রায় তিন শতাধিক যাকাতপ্রার্থী মানুষের মৃত্যু হয়েছে। কী কারণে হয় এসব মৃত্যুর ঘটনা! যাকাত হলো গোপনে পালনের একটি ধর্মীয় দায়িত্ব। সেখানে আগে থেকে যার যার নিজ নিজ এলাকায় প্রতিবেশীদের ভেতর যাকাত প্রাপ্য, সে সকল ব্যক্তিকে গোপনে তালিকা প্রণয়ন করে তা বাড়িতে বিতরণের ব্যবস্থা নিতে হয়। কিন্তু দেখা গেছে, সবাই তাদের নিজস্ব সম্পদের নিসাব পরিমাণ হলেই যাকাত তো পরিশোধ করছেনই না, বরং যখন বিতরণ করছেন তখন একে সামাজিক ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে একটি প্রচার-প্রচারণার ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছেন। সেজন্য তারা রমজানের ঈদকে সামনে নিয়ে নিজেদের সমাজের কাছে জাহির করার মানসে যাকাত বিতরণের নামে শাড়ি কিংবা লুঙ্গি প্রদান করে থাকেন। সেই যাকাত বিতরণের সময় কোনরকম পূর্ব প্রস্তুতি থাকে না, কোন শৃঙ্খলা থাকে না, প্রশাসনকে জানানো হয় না, পুলিশসহ কোন নিরাপত্তা কর্মীর বেষ্টনী থাকে না, যাকাত প্রদানের সংখ্যা কিংবা পূর্ব থেকে কোন তালিকা করা থাকে না। ফলে যা হওয়ার তাই হয়। আর এসব ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনার শিকার হয় নারী ও শিশু। অথচ একটু সতর্কভাবে পূর্ব প্রস্তুতি নিয়ে করলে সহজেই মৃত্যু বা দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব।

সঠিকভাবে ধর্মীয় বিধিবিধান মেনে সবাই যদি যাকাত পরিশোধ করত, তাহলে যাকাতের মাধ্যমে দেশের দারিদ্র্য কমানো সম্ভব হতো। এ সম্পর্কিত একটি পরিসংখ্যান এখানে তুলে ধরলেই তা একটু পরিষ্কার হবে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী বাংলাদেশের ২১ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। ভূমিহীন পরিবারের সংখ্যা ১৫ লাখ ৮ হাজার ৮৭৬ জন। একটি ব্যাংকের গবেষণা তথ্যমতে, শুধু মানুষের ব্যাংকে গচ্ছিত জমা টাকার আমানত থেকেই ১৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকার যাকাত আদায় করা সম্ভব। সেন্টার ফর যাকাত ম্যানেজমেন্টের এক গবেষণা তথ্যমতে, বর্তমানে বাংলাদেশে যাকাতযোগ্য অর্থের পরিমাণ ১০ লাখ কোটি টাকা। আড়াই শতাংশ হারে এ থেকে ২৫ হাজার কোটি টাকা আদায় করা সম্ভব, যা বাংলাদেশের বার্ষিক মোট উন্নয়ন কর্মসূচীর ৪০ শতাংশ। যদি এই ২৫ হাজার কোটি টাকা আদায় করা যায়, তাহলে সেই অর্থ সমভাগে ১৫ লাখ মানুষকে বিতরণ করলে তাদের প্রত্যেকের ভাগে দেড় লাখ টাকারও বেশি পড়বে। তাহলে কী দাঁড়াচ্ছে! যদি এ দেড় লাখ টাকা তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে দেয়া যায় তাহলে দুই-তিন বছর পরে আবার তারাই যাকাত দেয়ার উপযুক্ত হয়ে উঠবে। তবে হিসাব কষে যত সহজ মনে হলো বিষয়টি কিন্তু মোটেও তত সহজ নয়। কিন্তু সঠিক উদ্যোগ নিলে তা আবার অসম্ভবও নয়। কারণ মুসলিম দেশ হিসেবে এশিয়ারই একটি দেশ মালয়েশিয়া যাকাত ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি প্রয়োগ করে সফল হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে বর্তমানে যে যাকাত ব্যবস্থাপনা রয়েছে তার মাধ্যমে সে স্বপ্ন পূরণ করা যাবে না। টাকা হলো মানুষের। সেখানে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার যদি উদ্যোগ নেয়, তাহলে তা অবশ্যই বাস্তবায়ন করা সম্ভব। কারণ দেশের মানুষের আয়ের একটি বিরাট অংশ যদি আয়কর হিসেবে বাধ্যতামূলকভাবে দেয়ার বিধান থাকে এবং তার অংশীদারিত্বের ভিত্তিতেই দেশের জাতীয় বাজেট প্রণয়ন হতে পারে, তবে কেন যাকাত আদায়ের ক্ষেত্রে হবে না? এ কাজটি সরকারের ধর্ম মন্ত্রণালয়ের ইসলামী ফাউন্ডেশনের আওতাধীন বর্তমানে যাকাত বোর্ডকে কার্যকর করার মাধ্যমে সম্ভব।

লেখক : ডেপুটি রেজিস্ট্রার, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়

যশধনরৎভসড়@ুধযড়ড়.পড়স