১৯ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

বাংলাদেশ থেকে সরাসরি কার্গো পরিবহনে জার্মানির নিষেধাজ্ঞা


আজাদ সুলায়মান ॥ অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাজ্যের পর জার্মানিও বাংলাদেশ থেকে সরাসরি কার্গো পরিবহনের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। গত রবিবার এ সংক্রান্ত একটি আদেশ গ্রহণ করেছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ও সিভিল এ্যাভিয়েশন। প্রভাবশালী তিনটে দেশ এ ধরনের বিধিনিষেধ আরোপ করায় বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়বে দেশের গার্মেন্টস খাত। বাংলাদেশ থেকে বছরে ৫ বিলিয়ন ডলারের গার্মেন্টস পণ্য জার্মানিতে রফতানি করা হয়। ঢাকা থেকে জার্মানির এয়ারলাইন্স লুফথানসা এককভাবে এ কার্গো পরিবহন করে। প্রতি সপ্তাহে বিমানের কার্গো হাউস থেকে ৬০ টন গার্মেন্টস পণ্য নেয় লুফথানসা। রবিবারের এ নিষেধাজ্ঞার ফলে গার্মেন্টস খাতে আবারও বড় আঘাত এলো। বিজিএমইএ বলছে, এটা মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা। এদিকে একের পর এক ইউরোপের প্রভাবশালী দেশের এ ধরনের আকস্মিক নিষেধাজ্ঞার ফলে যুক্তরাজ্যের নিরাপত্তা কোম্পানি রেডলাইনকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাজ দেয়ার যৌক্তিকতা নিয়ে আবারও প্রশ্ন উঠেছে। এ্যাভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রেডলাইন গত তিন মাসে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা পরিস্থিতি যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে বলে যে দাবি করছে, জার্মানির নিষেধাজ্ঞা তো তারই বিপরীত চিত্র প্রমাণ করে।

বিমান সূত্র জানায়, রবিবার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো হাউসে রফতানির জন্য বিপুল পরিমাণ গার্মেন্টস পণ্য লুফথানসা এয়ারওয়েজের মাধ্যমে পাঠানোর প্রস্তুতি নেয়। মালামাল জাহাজে তোলার পূর্ব মুহূর্তে জানানো হয়, জার্মানি নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। ঢাকা থেকে জার্মানিতে সরাসরি কোন কার্গো পণ্য পাঠাতে হলে তৃতীয় কোন দেশে তা আবারও পরীক্ষা (স্ক্রিনিং) করতে হবে।

উল্লেখ্য, এর আগে গত ৯ মার্চ ঢাকা থেকে বিমানের সরাসরি লন্ডনের কার্গো ফ্লাইটের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে যুক্তরাজ্য। এখনও পর্যন্ত এ নিষেধাজ্ঞা বহাল রয়েছে। তারও আগে অস্ট্রেলিয়াও একই কায়দায় ঢাকা থেকে সরাসরি কার্গো ফ্লাইট বন্ধ করে দেয়। অস্ট্রেলিয়াও যুক্তরাজ্যের মতো একই সুরেই অপর্যাপ্ত নিরাপত্তা, যন্ত্রপাতি ও জনবলের অভাবকে দায়ী করেছে। লন্ডনের কার্গো ফ্লাইট বন্ধ করায় বিমানকে বড় ধরনের মাসুল গুনতে হচ্ছে। সপ্তাহে ঢাকা থেকে চারটি ফ্লাইটে যে পরিমাণ কার্গো বহন করা হতো- তাতে মাসিক কমপক্ষে ৪ থেকে ৫ কোটি টাকা রাজস্ব আয় হতো। গত তিন মাস এ আয় থেকে বিমান বঞ্চিত। বিমান এ বিপর্যয়ের জন্য দায়ী করেছে সিভিল এ্যাভিয়েশনের উদাসীনতা ও গাফিলতিকে। কারণ কার্গো হাউসের নিরাপত্তা, যন্ত্রপাতি সরঞ্জামাদিসহ অন্যান্য অবকাঠামোগত স্থাপনার তত্ত্বাবধানের একক কর্তৃপক্ষ হচ্ছে সিভিল এ্যাভিয়েশন। সিভিল এ্যাভিয়েশন যদি ব্রিটিশ অডিট টিমের পর্যবেক্ষণগুলো মেনে সময় মতো সব পদক্ষেপ নিত তাহলে এ বিপর্যয় এড়ানো যেত। এ বিষয়ে সাংবাদিকরা জানতে চাইলেও সিভিল এ্যাভিয়েশনের কোন কর্মকর্তা মুখ খোলেননি। তবে সিভিল এভিয়েশনের একজন উর্ধতন কর্মকর্তা জনকণ্ঠকে বলেন, এবার জার্মানি যা করেছে তাতে বিমানকেই দায়ী করা হয়েছে। চিঠিও দেয়া হয়েছে বিমানকেই।

এদিকে সোমবার বিমানের রফতানি কার্গোতে গিয়ে দেখা যায়- সেখানকার কর্মরত জনবলের মাঝে চরম হতাশা নেমে এসেছে। সারি সারি কার্গোর স্তূপ জমে গেছে ওই হাউসে।

কি কারণে অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাজ্যের পর জার্মানি এমন কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছে জানতে চাইলে বিমানের কোন দায়িত্বশীল কর্মকর্তাও মুখ খুলতে রাজি হননি। তবে পীড়াপীড়ির মুখে বিমান চেয়ারম্যান এয়ারমার্শাল ইনামুল বারী জনকণ্ঠকে বলেন, এ সংক্রান্ত একটা ই-মেইলের মাধ্যমে জানতে পারি জার্মানি ঢাকা থেকে সরাসরি কার্গোর ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। ই-মেইলে তারা কার্গো ভবনের এক্সপ্লোসিভ ডিটেকশান টেস্ট (ইডিটি) নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। এ কাজটা করে সিভিল এ্যাভিয়েমশন। ইডিটি দেখভাল করার দায়িত্ব সিভিল এ্যাভিয়েশনের, বিমানের নয়। যাই হোক এ ধরনের নিষেধাজ্ঞার দরুন শুধু বিমান নয়, দেশের ক্ষতি। তবে আমরা চেষ্টা করছি কিভাবে এ সঙ্কট উত্তরণ করা যায়।

এ বিষয়ে বিমানের কার্গো শাখার এক কর্মকর্তা জনকণ্ঠকে বলেন, জার্মানির এ সিদ্ধান্ত বিমান কিংবা সিভিল এ্যাভিয়েশনের কোন গাফিলতি বা ঘাটতির দরুন নয়। জার্মানির গোয়েন্দার সংস্থা গোটা বাংলাদেশকেই তাদের জন্য নিরাপদ মনে করছে না। অনেক আগেই তারা বাংলাদেশকে রেড এলার্ট দিয়ে রেখেছে। জার্মানি এ ধরনের আকস্মিক সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে বিমান ও সিভিল এ্যাভিয়েশনকে কোন সতর্ক বার্তাও দেয়নি কখনও। এ থেকেই এটা স্পষ্ট, এটা জার্মানির বিবেচনায় এখনও বাংলাদেশ নিরাপত্তা উদ্বেগের তালিকাভুক্ত দেশগুলোর একটি অর্থাৎ রেড লিস্টের আওতায়।

বিমান সূত্র জানায়, বিমানের কার্গো কমপ্লেক্সের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়ায় গত ছয় মাসেও অস্ট্রেলিয়া তাদের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেনি। গত ডিসেম্বর থেকে দেশটি বিমানে কার্গো নিচ্ছে না। এতে প্রতিদিন গড়ে অর্ধশত কোটি টাকার ব্যবসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। পাশাপাশি আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিও নষ্ট হচ্ছে।

এ বিষয়ে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, যুক্তরাজ্য এ্যাভিয়েশন গোয়েন্দা দল তাদের সর্বশেষ রিপোর্টে বিমানের ঢাকা-লন্ডন সরাসরি যাত্রী পরিবহন ব্যবস্থায় সন্তোষ প্রকাশ করলেও কার্গো পণ্য পরিবহনে সিভিল এ্যাভিয়েশনের গাফিলতি ও অবহেলা দেখে চরম অসন্তোষ প্রকাশ করে। যার মাসুল দিতে হচ্ছে বিমানকে।

এ বিষয়ে গত এপ্রিলে দাখিলকৃত এক প্রতিবেদনে জানা যায়, কার্গো রফতানি ভিলেজে ব্রিটিশ গোয়েন্দা দল যা প্রত্যক্ষ করেছে তাতে তারা এখানকার নিরাপত্তা নিয়ে চরম উদ্বেগ প্রকাশ করে। যেমন ওই টিম বার বার তাগিদ দিয়েছিল, কার্গো স্ক্যানার ও এক্সপ্লোসিভ টেস্ট ডিটেকশন (ইটিডি) দক্ষতার সঙ্গে অপারেট করার জন্য। কিন্তু সিভিল এ্যাভিয়েশন ইটিডি বসালেও দক্ষ অপারেটর নিয়োগ করতে পারেনি। ব্রিটিশ টিমের ভ্যালিডেটর ওয়াইনি রেইন শো নিজে কার্গো হাউসে দাঁড়িয়ে পর পর তিন দিন যে চিত্র দেখলেন তাতে তিনি আঁতকে উঠেন। তিনি দেখলেন, ইটিডির মাধ্যমে কার্গো বক্স ঠিকই পরীক্ষা করা হচ্ছে। মেশিনে একদিক দিয়ে ঢুকিয়ে অন্যদিক দিয়ে বের করা হচ্ছে। কিন্তু ওই কার্গোতে কোন ধরনের বিস্ফোরক দ্রব্য আছে কিনা সেই রিপোর্ট তাৎক্ষণিক বের করা যাচ্ছে না। তিনি তখন অপারেটরের কাছে জানতে চান ইটিডির রিপোর্ট কোথায়? জবাবে অপারেটর কিছুই বলতে পারেননি। অর্থাৎ ইটিডির জন্য দক্ষ কোন অপারেটর নেই সিভিল এ্যাভিয়েশনে।

দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে বিমানের কার্গো রফতানি হাউসে অনেক গুরত্বপূর্ণ কাজ করানো হচ্ছে বহিরাগত জনবল দিয়ে। এ ধরনের জনবল মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। রফতানি টার্মিনালে কর্মরত ৩০০ জনবলের মধ্যে মাত্র ৬০ জন বিমানের নিজস্ব। বাকিরা বিভিন্ন সিএ্যান্ডএফ এজেন্ট ও বহিরাগত। এদের মধ্যে চোরাচালানসহ বিভিন্ন মামলার আসামিও আছে। নামমাত্র স্ক্যানের পর এরা টার্মিনালে প্রবেশ করছে। একইভাবে স্ক্যান ছাড়াই অবাধে পণ্যসামগ্রীও বিভিন্ন এয়ারলাইন্সে ওঠানো হচ্ছে। এ অবস্থায় কার্গো পণ্যের সঙ্গে বোমা বা অন্য কোন এক্সপ্লোসিভ বিমানের মধ্যে ঢুকিয়ে দেয়ার মতো আশঙ্কার কথাও বলা হয়েছে যুক্তরাজ্যের রিপোর্টে। নিরাপত্তা শিথিলতায় কার্গো ফ্রেইটগুলো যেসব দেশের বিমানবন্দরে যাচ্ছে সেখানে বড় ধরনের নাশকতার আশঙ্কাও আছে। নিজস্ব জনবলের বিষয়টি নিয়ে বার বার বলা হলেও সেটা বাস্তবায়ন করতে পারেনি বিমান। অথচ নিরাপত্তা নির্বিঘœ করতে শাহজালাল বিমানবন্দরের জন্য ২৫০ সদস্যের জনবল নিয়োগ দিলেও সরকার কার্গো (রফতানি) শাখায় নিজস্ব জনবল নিয়োগ দেয়নি।

এদিকে তৈরি পোশাক খাতের একাধিক সূত্র জানায়, আকাশ পথে জার্মানিতে প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টস ও নমুনা পাঠানোর সুযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিকল্প পথে অন্য দেশের আশ্রয় নিতে হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন সময় নষ্ট হচ্ছে তেমনি আর্থিক ব্যয়ও বাড়ছে। এখন জার্মানি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করায় বিপদে পড়েছে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীরা।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ফ্রুটস ভেজিটেবল এলাইট প্রোডাক্ট এক্সপোর্টার এ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মনসুর আহম্মেদ জানান, বর্তমানে বছরে ১ হাজার থেকে ১৫শ’ কোটি টাকার বেশি সবজি রফতানি হচ্ছে বাংলাদেশ থেকে। এর অধিকাংশই যাচ্ছে অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, জার্মানিসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে।

সিভিল এ্যাভিয়েশনের একজন পরিচালক জানান, অপ্রতুল নিরাপত্তা ও বহিরাগতদের অবাধ প্রবেশের অজুহাতে বিমানে কার্গো নেয়া বন্ধ করে দিয়েছে জার্মানি। তারা জানিয়েছে, বিমানের কার্গো রফতানি টার্মিনালটি বহিরাগত জনবল দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। এসব জনবল মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার এ্যাসোসিয়েশন (বাপা) নামে একটি সংগঠনের দখলে পুরো কার্গো রফতানি টার্মিনাল। তাদের প্রায় ১০০০ জনবল দিয়ে বিমান মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণভাবে রফতানিকৃত কার্গো পণ্য লোড-আনলোড করছে। বিমান ও সিভিল এ্যাভিয়েশন কর্তৃপক্ষ তাদের ড্রেস ও সিকিউরিট পাস দিয়ে অবাদে কার্গো টার্মিনালে প্রবেশের সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। জানা গেছে, বাপার একজন শীর্ষ কর্মকর্তার সঙ্গে বিমান ও সিভিল এ্যাভিয়েশনের শীর্ষ কর্তাদের সুসম্পর্ক থাকায় গত ৬ মাস ধরে তারা অবাদে টার্মিনালে প্রবেশ করছে। অভিযোগ আছে বিমান বোর্ড সম্প্রতি এক সভায় বাপার এসব কর্মীদের বিমানের কার্গো শাখায় নিয়োগ দেয়ার জন্যও সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আরও ভয়াবহ তথ্য হচ্ছে শাহজালাল বিমানবন্দরে নিয়োগকৃত যুক্তরাজ্যের সিকিউরিটি কোম্পানি রেডলাইনের সঙ্গেও এই বাপার শীর্ষ নেতাদের ঘনিষ্ট সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। জানা গেছে, ইতোমধ্যে রেডলাইন কর্তৃপক্ষ গোপনে বাপার ২শ’ কর্মীকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে। যদিও রেডলাইনকে নিয়োগ দিয়েছে সরকার। অথচ তারা কাজ করছে বেসরকারী সংগঠন বাপার কর্মীদের প্রশিক্ষণ দেয়া নিয়ে।

এ সম্পর্কে বিমানের একজন কর্মকর্তা বলেন, রেডলাইনকে কাজ দেয়ার পর যেখানে আশা করা হচ্ছিল, যুক্তরাজ্য ঢাকা থেকে বিমানের সরাসরি কার্গোর ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেবে। এখন উল্টো সেখানে যুক্তরাজ্যের পথ অনুসরণ করে জার্মানিও আরোপ করে বসেছে নিষেধাজ্ঞা। এই অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে তাহলে ৭৭ কোটি টাকা ব্যয়ে রেডলাইনকে বিনা টেন্ডারে তাড়াহুড়ো করে কাজ দেয়ার সার্থকতা কোথায়?

সম্পর্কিত:
পাতা থেকে: