২৩ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ২ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

বর্জ্যে দূষিত কর্ণফুলী


স্টাফ রিপোর্টার, চট্টগ্রাম অফিস ॥ দু’পাড়ে গড়ে উঠা কারখানার বর্জ্যে বিনষ্ট হচ্ছে কর্ণফুলী নদীর পরিবেশ। কারখানার রাসায়নিক বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ জাহাজ হতে নির্গত তেল এবং নগরীর অর্ধকোটি বাসিন্দার গৃহস্থলি বর্জ্যও প্রতিনিয়ত দূষিত করছে নদীর পানি। গৃহস্থলি ও রাসায়নিক বর্জ্যরে ক্রমাগত দূষণে একদিকে নদীর বাস্তুসংস্থান বিনষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে প্রাকৃতিক পরিবেশ হুমকির মুখে পড়ছে। এক সময়ের মৎস্যভা-ার হিসেবে পরিচিত দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের অন্যতম কর্ণফুলী নদী মৎস্য শূন্যের পাশাপাশি জীববৈচিত্র্যহীন হয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

এদিকে দীর্ঘদিন ধরে কারখানার বর্জ্যে কর্ণফুলী দূষিত হতে থাকলেও পরিবেশ অধিদফতর দূষণ রোধে কার্যকর কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারছে না। উল্টো কারখানাগুলো ইটিপি (ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট) কার্যকর না করায় দিন দিন দূষণের হার বাড়ছে। পরিবেশ ছাড়পত্র নেয়ার সময় ইটিপি বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিলেও অনেক কারখানা পরবর্তীতে প্রতিশ্রুতি মানছেন না। বিশেষ করে রাষ্ট্রয়াত্ত কারখানাগুলো ইটিপির কোন ধারে কাছে নেই। তারা কারখানার রাসায়নিক বর্জ্য সরাসরি কর্ণফুলী নদীতে ফেলে দিচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কর্ণফুলী নদীকে কেন্দ্র করে নদীর দু’পাড়ে গড়ে উঠেছে ছোট-বড় প্রায় সাতশ শিল্প-কারখানা। দেশের অর্থনীতিতে ব্যাপক অবদান রেখে আসলেও কারখানাগুলোর নির্গত বর্জ্যে বিপন্ন হতে চলেছে কর্ণফুলী নদীর প্রাণ। কর্ণফুলী পেপার মিল (কেপিএম), রেয়ন মিল, চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লি. (সিইউএফএল), কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি (কাফকো), ডাই সুপার ফসফেট (টিএসপি), তেল পরিশোধন প্রতিষ্ঠান ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড, বিপণন সংস্থা পদ্মা, মেঘনা, যমুনার ডিপো, চিটাগাং ড্রাইডক লিমিটেড, সিমেন্ট কারখানাসহ ২২০টি কারখানাকে মারাত্মক দূষণকারী হিসেবে চিহ্নিত করেছে পরিবেশ অধিদফতর।

এই তালিকার শীর্ষে আছে ৪টি সরকারী প্রতিষ্ঠান। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক), চট্টগ্রাম ওয়াসা, চট্টগ্রাম ইউরিয়া সার কারখানা (সিইউএফএল) ও কর্ণফুলী পেপার মিল (কেপিএম) এ চার সরকারী ও স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা নদী দূষণের জন্য দায়ী বলে একাধিক গবেষণা প্রতিবেদনে ওঠে এসেছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর কোন বর্জ্য শোধনাগার নেই। তাই প্রতিনিয়ত বর্জ্য পড়ছে কর্ণফুলীতে। সরকারী প্রতিষ্ঠান হওয়ার কারণে এ চার প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নিতে পারছে না পরিবেশ অধিদফতর। পরিবেশ অধিদফতর থেকে বার বার ইটিপি কার্যকরে তাগাদা দেয়া হলেও প্রতিষ্ঠানগুলো কোন কিছুর তোয়াক্কা করছেন না।

উল্টো কারখানাগুলোর ক্রমাগত দূষণে বিনষ্ট হচ্ছে নদীর বাস্তুসংস্থান। দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে জীববৈচিত্র্য। কর্ণফুলী নদীকে নিয়ে পরিচালিত বেশ কয়েকটি গবেষণা প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, কর্ণফুলীতে মাছ ও অন্যান্য জলজপ্রাণীর প্রাণ ধারণের জন্য পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের (ডিও) গ্রহণযোগ্য মাত্রা থাকার প্রয়োজন প্রতি লিটারে ৪ থেকে ৬ মিলিগ্রাম। কিন্তু চরম দূষণের শিকার এ নদীর পানিতে ডিও পাওয়া গেছে শূন্য দশমিক ১ থেকে ৪ মিলিগ্রাম। নদীর পানিতে জীব-রাসায়নিক অক্সিজেন চাহিদার (বিওডি) আদর্শ মান ২ থেকে ৩ ধরা হলেও বর্তমানে তা রয়েছে প্রতি লিটারে ১০ থেকে ২৫ মিলিগ্রাম। নদীর রাসায়নিক অক্সিজেন চাহিদার (সিওডি) আদর্শ মান প্রতি লিটারে ২০০ মিলিগ্রাম ধরা হলেও এখানেও তার ওপরে রয়েছে।

এছাড়া পানির বিদ্যুত পরিবাহী (ইলেকট্রিক কন্ডাকটিভিটি) ক্ষমতার সহনীয় মাত্রা প্রতি সেন্টিমিটারে ৭০০ থেকে ২৮০০ মাইক্রো সিমেন্স। কিন্তু এ নদীতে রয়েছে প্রতি সেন্টিমিটারে গড়ে ৩৪০০ মাইক্রো সিমেন্স। জলজ প্রাণী বেঁচে থাকার জন্য এ মাত্রা খুবই বিপজ্জনক বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

গবেষকদের মতে, কর্ণফুলী নদী সংলগ্ন কারখানাগুলোর ৯০ শতাংশের নেই ইটিপি। ১০ শতাংশের ইটিপি থাকলেও তাদের আবার ৫০ শতাংশ কারখানা খরচ কমাতে প্ল্যান্ট বন্ধ রাখে। ফলে এসব কারখানার বর্জ্যরে কারণে নদীর বাস্তুসংস্থান নষ্ট হয়ে পড়ছে। এখানকার বাস্তুসংস্থান নষ্টের কারণে জলজপ্রাণী বিলুপ্ত হয়ে গেলে কর্ণফুলী মরা নদীতে পরিণত হতে বাধ্য বলে দাবি করেন পরিবেশবাদীরা।

বিশিষ্ট নদী গবেষক চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মোঃ মনজুরুল কিবরিয়া বলেন, ‘আইনের মাধ্যমে প্রতিটি কারখানায় ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্লান্ট (ইটিপি) ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হলেও কর্ণফুলী নদীর পাড়ে গড়ে ওঠা কারখানাগুলো মানছে না। কারখানাগুলোর ক্রমাগত দূষণে দিন দিন নদীটির বাস্তুসংস্থান বিনষ্ট হচ্ছে। কর্ণফুলী থেকে ক্রমেই মাছসহ বিভিন্ন জলজপ্রাণী বিলুপ্ত হচ্ছে।