১৭ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

ছাপা হলেই হয় না লেখা


লেখালেখি করার প্রথম দিককার কথা। সিটি কলেজে পড়ি । প্রথম গল্প ছাপা হয় ’৮৭-র ফেব্রুয়ারির ১৮ তারিখ। দৈনিক ইত্তেফাকের ছোটদের পাতা কচিকাঁচার আসরে। রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই এই পাতার সম্পাদক। কম কথা বলার মানুষ। তার পাতায় ছড়া ছাপা হলে তিনি ছড়াকারের তকমা পেতেন। তখন কচিকাঁচার আসর বের হতো বুধবার।

’৮৭ সালের ফেব্রুয়ারির কোন এক শনিবার। গল্প দেয়ার সময় দাদা ভাই গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করলেন, কোথায় পড়াশোনা করো। উত্তর দিলাম। তারপর ভয়ে ভয়ে লেখা দিয়ে চলে এসেছি। ভেতরে টেনশন কাজ করছে, গল্পটা কবে ছাপা হবে কিংবা আদৌ ছাপা হবে কি না তা নিয়ে। পরের বুধবার দেখি আমার গল্প কচিকাঁচার আসরে ছাপা হয়েছে। এর মধ্যে চাঁদের হাট, খেলাঘরের সাহিত্য বাসরে নিয়মিত যাওয়া হয়। ইত্তেফাকে গল্প ছাপা হওয়ার পর ভাবলাম, যাক, এখন থেকে তাহলে দৈনিক পত্রিকার ছোটদের সব পাতায় আমার লেখা ছাপা হবে। সে সময় প্রিয় অগ্রজদের কাছে শুনতাম বাংলাদেশে ছোটদের সেরা দুটো পাতা বের হয়। এর একটা ইত্তেফাকের ‘কচিকাঁচার আসর’ আরেকটা দৈনিক বাংলার ‘সাত ভাই চম্পা’। তখন ‘সাত ভাই চম্পা’ সম্পাদনা করতেন আফলাতুন। প্রথমে এই নামটা শুনেই মনে হল, এ আবার কেমন নাম! শুনেছি আফলাতুন ভাই নাকি খুব রাশভারী মেজাজের মানুষ। তখন জনশ্রুতি ছিল এ রকম, ছোটদের এই দুই পাতার যে কোনোটাতে কারো লেখা ছাপা হলে ধরে নেয়া হতো লেখালেখির জগতে তারা প্রবেশপত্র পেয়েছে।

তখনও ‘সাত ভাই চম্পা’য় লেখা দেয়া হয়নি। ইত্তেফাকে গল্প বের হওয়ার পরের সপ্তাহে একদিন কলেজ ফাঁকি দিয়ে নতুন গল্প নিয়ে মহা উৎসাহের সঙ্গে দৈনিক বাংলার চারতলায় ফিচার বিভাগে চলে গেলাম। ফিচার বিভাগের দুপাশে ছোট ছোট খোপের মতো ঘর। ফিচার বিভাগে ঢুকতেই বাঁ দিকেরা ঘরে মাফরুহা চৌধুরী বসেন (আগে এ ঘরে কবি আহসান হাবীব বসতেন)। মাফরুহা চৌধুরীর পাশের ঘরে আফলাতুন। ডান দিকের প্রথম ঘরে বসতেন রেজোয়ান সিদ্দিকী। তারপরে বসতেন সৈয়দ লুৎফুল হক, অলকেশ ঘোষ আর কবি নাসির আহমেদ।

চারতলায় উঠলে একটা কাঠের বোর্ডে বিভাগগুলোর নাম চোখে পড়ে। ফিচার বিভাগে গিয়ে আফলাতুন ভাইয়ের ঘর খুব সহজেই পেয়ে গেলাম। দরোজার ওপর তার নাম। দরোজায় দাঁড়িয়ে উঁকি দিয়ে দেখলাম একজন চিকন-চাকন মানুষ চেয়ারে বসে আছেন।চোখে মোটা কালো ফ্রেমের চশমা কাঁচা-পাকা গোঁফ। চুলগুলো টাইট করে ব্যাক ব্রাশ করা, তাতে মাথার ওপরকার সব চুল টানটান হয়ে পেছনে চলে গেছে। গায়ে শার্ট।শার্টের তলায় ছাইরঙের একটা কোট। শুনেছি, আফলাতুন ভাই অসম্ভব রুচিবান মানুষ। গল্পের ব্যাপারে ভীষণ খুঁতখুঁতে। তিনি এক সময় গল্প লিখতেন। তার গল্প ‘ধোঁয়া’ ’৬২ সালে কলকাতার সাপ্তাহিক দেশ-এ ছাপা হয়েছে। পরে একটা গল্পের বইও বেরিয়েছে তার, ‘অলৌলিক এক পাখি’ নামে। সালাম দিয়ে আফলাতুন ভাইয়ের ঘরে ঢুকতেই দেখলাম, আরও তিন জন চেয়ার দখল করে বসে আছেন। এদের মধ্যে একজন আমার বয়েসী আর দু’জন আমার চেয়ে একটু সিনিয়র। তিনজন বসে থাকার পরও একটা চেয়ার খালি। আফলাতুন ভাইয়ের সামনে কাচের বড় টেবিলÑ কাচের নিচে সবুজ রঙের র‌্যাক্সিন। টেবিলের এক কোণায় ফেটে যাওয়া দাগ। হাতে কলেজ ফাইল নিয়ে দরোজায় দাঁড়িয়ে আছি। আফলাতুন ভাই তার দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা আগন্তুককে বললেন, কাকে চাই?

আমার গলা তখন শুকিয়ে কাঠ। আমি নার্ভাস হয়ে কোনমতো বললাম, গল্প।

আফলাতুন ভাই হাত দিয়ে চেয়ার দেখিয়ে ঘরে ঢোকার ইঙ্গিত দিয়ে বললেন, দেখি গল্প।

চেয়ারে বসার পর দেখলাম ছোটমতো একটা ছেলে চার কাপ চা এনে টেবিলে রাখল। আফলাতুন ভাই আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, চা খাবে? আমি মাথা নাড়িয়ে সম্মতিসূচক জবাব দিলাম।

আফলাতুন ভাই গল্পটা নিয়ে গভীর অভিনিবেশের সঙ্গে দেখলেন। মনে হলো, প্রথম প্যারা ভাল করে পড়লেন। তারপর লেখাটা ঠিকমতো দেখলেন কী দেখলেন না বোঝা গেল না, তার আগেই পাতা উল্টিয়ে চলে গেলেন দ্বিতীয় পাতায়। একইরকম করে জাম্প করে তৃতীয় পাতায় চলে গেলেন। তারপর গল্পটা টেবিলের ওপর রেখে দিলেন।

চা খাওয়া শেষ হলে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে যাবার জন্য উশখুশ করছি, তখন আফলাতুন ভাই বললেন, এর আগে কোথাও কী গল্প ছাপা হয়েছে।

আফলাড়ুন ভায়ের কথায় আমি বেশ আত্মপ্রত্যয় নিয়ে বললাম, গত সপ্তাহে ইত্তেফাকের কচিকাঁচার আসরে আমার গল্প ছাপা হয়েছে।

আমার কথা শুনে আফলাতুন ভাই একটু হাসলেন। তারপর বাকি তিনজনের দিকে তাকিয়ে হাসিটাকে একটু দীর্ঘায়িত করে বললেন, শোন, মনোযোগ দিয়ে শোন, ‘ছাপা হলেই হয় না লেখা’ বলে তিনি আমার লেখার ওপর কাচের পেপার ওয়েট রাখলেন।

সেদিন বিদায় নিয়ে চলে এলাম। কিন্তু ‘ছাপা হলেই হয় না লেখা’Ñ আফলাতুন ভাইয়ের এই কথাটা আমার মাথার মধ্যে গেঁথে রইল।

লোকটা বলে কী! তাহলে প্রতিদিন পত্রিকার পাতায় যে এত এত লেখা ছাপা হচ্ছেÑ সেসব কী লেখা না! তারপর, অনেক দিন পর একদিন একা পেয়ে আফলাতুন ভাইকে জিজ্ঞেস করলাম,আফলাডুন ভাই ‘ছাপা হলেই হয় না লেখা’ কথাটার মানে কী?

তিনি তখন ছোট করে আমার কথার জবাব দিয়ে বললেন, পত্রিকার পাতায় প্রতিদিন যে এন্তার লেখা ছাপা হচ্ছেÑ তার সবই কী লেখা!

কথাটা বলে চুপ মেরে গেলেন তিনি। আফলাতুন ভাইয়ের কথায় আমার সবকিছু তালগোল পাকিয়ে গেল।

athairidha15@yahoo.com