২২ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৫ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

গ্রামের পর গ্রামজুড়ে সবজির মাচা, চার কোটি টাকা আয়


গ্রামের পর গ্রামজুড়ে সবজির মাচা, চার কোটি টাকা আয়

মীর আব্দুল আলীম ॥ কাঁকরোল বর্ষাকালীন তরকারি হিসেবে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। পুষ্টিগুণে ভরপুর এ সবজির চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে এর উৎপাদন। নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদীর পাঁচটি উপজেলাজুড়ে ফলছে বর্ষাকালীন এ সবজি। তবে বর্ষার আগেভাগেই নামে এ সবজি। পৃথক পাঁচটি উপজেলার প্রায় ৪৫টি গ্রামজুড়ে ছড়িয়ে আছে কাঁকরোলের মাচা। ঠিক কবে থেকে এ অঞ্চলে কাঁকরোলের চাষ হচ্ছে তা নিশ্চিত করে বলতে পারেন না এসব এলাকার প্রবীণরাও। তবে শুধু অনুমান করে বলে থাকেন, কম করে হলেও ২শ’ বছর আগে এসব এলাকায় কাঁকরোল চাষ শুরু হয়। হালে এর ব্যাপক চাষ শুরু হয়েছে। নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার, রূপগঞ্জ, নরসিংদীর শিবপুর, রায়পুরা ও বেলাবো উপজেলার মধ্যে রায়পুরাতেই এর ফলন বেশি হচ্ছে। গ্রামের পর গ্রাম, মাইলের পর মাইল যতদূর চোখ যায় শুধু কাঁকরোলের মাচা চেখে পড়বে। চাষাবাদ, ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে জীবন-জীবিকা সবকিছুই এখানে কাঁকরোলকেন্দ্রিক। দেশে যত কাঁকরোল কেনাবেচা হয় তার সিংহভাগই আসে এসব এলাকা থেকে।

দুই জেলার ৪৫টি গ্রামের দেড় হাজার পরিবারের কয়েক হাজার মানুষ আজ কাঁকরোল চাষের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন। তবে তাদের কারও দিন এখন ভাল যাচ্ছে না। আষাড়-শ্রাবণ-ভাদ্র এ তিন মাস কাঁকরোলের জমজমাট ব্যবসা চলে। তবে এখন এ সবজি বৈশাখ মাসের শুরু থেকেই মেলে। চাষের সময় তিন মাস হলেও এরপরও খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলে আরও তিন মাস। এ কয় মাসের আয় দিয়েই তাদের চলতে হয় বছরের বাকি মাসগুলো। তবে যা আয় হয় তা মন্দ নয়। দাম ভাল পাওয়ায় আনেকেই এখন কাঁকরোল চাষে সচ্ছলতা ফিরে পেয়েছেন।

বছরে ৪ কোটি টাকার কাঁকরোল ॥ টানা তিন মাস চলে কাঁকরোলের ব্যাবসা। এরপর আরও তিন মাস অপরিপক্ব কাঁকরোল জমি থেকে পাওয়া যায়। তা দিয়ে টুকটাক সংসারের খরচ চলে কৃষকদের। নরসিংদী উন্নয়ন সংস্থার হিসাব অনুযায়ী প্রতি বছর শিবপুর, বেলাবো ও রায়পুরা উপজেলায় প্রায় দেড় কোটি টাকার কাঁকরোল ফলে এ তিন উপজেলায়। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ এবং আড়াইহাজারে ৫০ লাখ টাকার কাঁকরোল উৎপাদন হয়। এ হিসাবে এখানে এক হাজার ৫শ’ পরিবার সাড়ে পাঁচ হাজার বিঘা জমিতে এ কাঁকরোলের চাষ করছে। স্থানীয় কৃষকদের দেয়া হিসাব অনুযায়ী এক বিঘা জমিতে গড়ে ১০ মণ কাঁকরোল উৎপন্ন হয়। মণপ্রতি গড় মূল্য ৭শ’ ৫০ টাকা হিসেবে ৫০ হাজার মণ কাঁকরোলের বাজারমূল্য দাঁড়ায় তিন কোটি ৭৫ লাখ টাকারও বেশি। মৌসুমের শুরুতে দাম খানিকটা চড়া থাকলেও পরে তা নিচে নেমে আসে।

সরকারী পৃষ্ঠপোষকতার অভাব, অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, রোগের প্রাদুর্ভাব প্রভৃতি কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কাঁকরোলচাষীদের মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছে। মরজাল এলাকার কাঁকরোলচাষী আমজাদ মিয়া (৪০) বলেন, ‘আমগো দুঃসংবাদ হুইন্না আর কী অইব, কেডা আমাগো খবর লয়।’ তার কথাÑ ‘কৃষিঋণ পায় বড় লোহে আমগার খবর কেডা রাহে।’ একই কথা বললেন বাড়িচাওয়ের নান্নু মিয়া ও অশীতিপর আব্দুল জব্বার। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সরকারী পৃষ্ঠপোষকতার বড়ই অভাব এখানে। নিজেদের চেষ্টায় তারা আগের চেয়ে ভাল আছেন বলে জানালেন আড়াইহাজারের কাঁকরোলচাষী মির্জা মিজান। কাঁকরোলচাষী মরজালের নূর আহম্মেদ বললেন, ‘জন্মই হয়েছে কাঁকরোলের ভেতর, কাঁকরোল ছাড়া কিছুই বুঝি না।’

কৃষক ঠকাতে পাইকারদের কৌশল ॥ কৃষকদের ঠকাতে পাইকাররা সব সময়ই বিশেষ কৌশল অবলম্বন করে থাকে। হাটে আগত পাইকাররা প্রথমে জোটবদ্ধ হয়। তারা প্রতি হাটের জন্য নির্দিষ্ট দর নির্ধারণ করে দেয়। এ দরের বাইরে কোন পাইকার যায় না। তাদের দেয়া অঘোষিত দরেই হাটে কাঁকরোল বেচাকেনা চলে। এ কৌশলে কৃষক ক্রেতাদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়ে। নানা পরিস্থিতির মুখে তারা বেশি মূল্যের কাঁকরোল কম দামেই বেচে দিতে বাধ্য হয়। পাইকাররা তাদের কাছ থেকে ৫-৬শ’ টাকা দরের কাঁকরোল কিনে তারা ঠিকই এক হাজার-১২শ’ টাকায় বিক্রি করছে। কৃষকরা কৃষি অফিসগুলো থেকে তেমন কোন সহায়তা পায় না।

কাঁকরোলের সর্ববৃহৎ হাট নারায়ণপুর ॥ দেশের সর্ববৃহৎ কাঁকরোলের হাট জমে নারায়ণপুরে। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে প্রতি শনি ও মঙ্গলবার আধা কিলোমিটারজুড়ে শুধু চোখে পড়ে কাঁকরোলের সবুজ সমারোহ। বিশাল হাটজুড়ে কৃষকরা কাঁকরোলের পসরা সাজিয়ে রেখেছে। পাইকাররা কাঁকরোল কেনায় ব্যস্ত। রাস্তার ধারেই চলছে ট্রাক বোঝাইয়ের কাজ। কুমিল্লা থেকে হাটে আগত আব্দুল জব্বার ব্যাপারী জনকণ্ঠকে জানান, সেদিন তিনি দুই ট্রাক কাঁকরোল কিনেছেন। এক ট্রাক কুমিল্লার নিজ আড়তে ও অন্য ট্রাকটি পাঠাবেন রাজধানীর সায়েদাবাদে। লাভের কথা জিজ্ঞাসা করতেই তৃপ্তির হাসি দিয়ে বলেন, ‘মাশআল্লাহ্ খেয়েপরে বেশ ভালই চলে আমার।’ এদিকে কৃষকরা বলেন, সারাবছর ধরে কষ্ট করি আমরা আর লাভের মোটা অংশ নিয়ে নেয় মহাজন আর ফড়িয়ারা।

আশা-হতাশার দুলছে কৃষক ॥ আশা-হতাশার দোলায় দুলছে কাঁকরোলচাষীরা। তাদের কথা- সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা তারা পাচ্ছে না। পেলে ঠিকই তাদের ভাগ্য ঘুরিয়ে নিতে পারত। এমপি, চেয়ারম্যান, মেম্বাররা ভোটের আগে আশ্বাস দেয় ঠিকই কিন্তু নির্বাচনে জিতে কেউই তাদের খবর রাখে না।

সর্বাধিক পঠিত:
পাতা থেকে: