ঢাকা, বাংলাদেশ   বৃহস্পতিবার ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৩ আশ্বিন ১৪২৯

কোচ-অধিনায়ককে অসম্মান করায় নিন্দার ঝড়

জাহিদুল আলম জয়

প্রকাশিত: ২১:৩১, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২২

কোচ-অধিনায়ককে অসম্মান করায় নিন্দার ঝড়

বাফুফে ভবনে সংবাদ সম্মেলনে প্রতিমন্ত্রী ও কর্মকর্তাদের পেছনে দাঁড়ানো কোচ ছোটন ও অধিনায়ক সাবিনা

সোনার মেয়েদের অবিস্মরণীয় সাফল্যগাথার পর গোটা বাংলাদেশে উৎসব-আনন্দ বিরাজ করছে। বুধবার অদম্য বাঘিনীদের রাজসিক সংবর্ধনা দিয়েছেন দেশবাসী। কিন্তু দেশের ক্রীড়া ইতিহাসের সেরা এই সাফল্যের পর ফুটবলের অভিভাবক সংস্থা বাফুফের কর্মকা-ে সন্তুষ্ট হতে পারেননি দেশবাসী। শুরু থেকেই বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের অনেকটা গাছাড়াভাবে হতাশ ক্রীড়াপ্রেমীরা। যার সবশেষ নিদর্শন দেখা গেছে বুধবার রাতে মতিঝিল বাফুফে ভবনে। সেখানে সাফ চ্যাম্পিয়ন বাংলার মেয়েদের সংবাদ সম্মেলনের একটা পর্যায়ে পেছনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় বাংলাদেশ জাতীয় নারী দলের কোচ গোলাম রব্বানী ছোটন ও অধিনায়ক সাবিনা খাতুনকে। ওই সময় মঞ্চ দখল করে রেখেছিলেন কর্মকর্তা ও অবাঞ্ছিত মানুষেরা। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে সারাদেশে চলছে নিন্দা ও সমালোনার ঝড়।  
সংবাদ সম্মেলনে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মোঃ জাহিদ আহসান রাসেল এমপি, যুব ও ক্রীড়া সচিব মেজবাহ উদ্দিন, বাফুফে সভাপতি কাজী মোঃ সালাউদ্দিন, সিনিয়র সহসভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদীসহ আরও কয়েকজন কর্মকর্তা সামনের চেয়ারে বসেছিলেন। আর চ্যাম্পিয়ন কোচ গোলাম রব্বানী ছোটন ও অধিনায়ক সাবিনা খাতুন দাঁড়িয়ে ছিলেন তাদের পেছনে। সেখানে দাঁড়িয়েই তারা সংবাদমাধ্যমের প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন। অবশ্য সংবাদ সম্মেলনের শুরুটা হয়েছিল কোচ-অধিনায়ককে মঞ্চে বসিয়েই। পরে কর্মকর্তাদের ধাক্কাধাক্কি করে সামনে চলে আসলে কোচ ও অধিনায়ক উঠে গিয়ে তাদের জায়গা ছেড়ে দেন। ওই সময়ে ইতিহাস গড়া কোচ-অধিনায়ককে মঞ্চে রাখতে কোন উদ্যোগই নেয়নি বাফুফে।
যাদের নেতৃত্বে বাংলাদেশ পেয়েছে ক্রীড়া ইতিহাসের অন্যতম সেরা সাফল্য তাদের এভাবে অসম্মান করাটা মেনে নিতে পারছেন না ক্রীড়াপ্রেমীরা। সাফ জয়ের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে সবখানে মেয়েদের প্রশংসায় ভাসানো হচ্ছে। তাদের কীভাবে সংবর্ধনা দেয়া উচিত, কীভাবে বরণ করে নেয়া উচিত এটা নিয়ে মানুষের কৌতূহলের অন্ত ছিল না। বিজয়ী বীরেরা দেশে ফেরার পর বিমানবন্দর থেকে বাফুফে ভবন পর্যন্ত যেভাবে অভ্যর্থনা জানানো হয়েছে তা এককথায় অভাবনীয়, অকল্পনীয়। কিন্তু বিজয়ী মেয়েদের আসল অভিভাবক বাফুফেকে এটা নিয়ে তেমন মাতামাতি করতে দেখা যায়নি। এ বিষয়টি নিয়ে অনেকের মাঝেই আছে ক্ষোভ। এর সঙ্গে নতুন করে যোগ হয়েছে চ্যাম্পিয়ন কোচ ও অধিনায়ককে অসম্মান করা।
অপ্রত্যাশিত বিষয়টি নিয়ে সমালোচনার ঝড় বয়ে চলেছে দেশব্যাপী। বাফুফের দিকেই যাচ্ছে তির্যক তীর। ৪৫ মিনিটের মতো সংবাদ সম্মেলন হয়। প্রথমে অধিনায়ক সাবিনা খাতুনকে বসানো হয় সবার মাঝখানে বাফুফে বস সালাউদ্দিনের পাশে। কোচ গোলাম রব্বানী ছোটন ছিলেন সর্বডানের চেয়ারে নারী টিমের চেয়ারম্যান মাহফুজা আক্তার কিরণের পাশে। বাফুফে স্টাফদের জন্য তাকে ঠিকমতো দেখা যাচ্ছিল না। সংবাদ সম্মেলনের ১৫ মিনিটের সময় সাবিনা বক্তব্য দেন। এরপর বক্তব্য দিতে বলা হয় কোচকে।

কিন্তু তিনি এতটাই দূরে ছিলেন যে সাবিনা উঠে গিয়ে তার স্যারকে ডেকে এনে মাঝখানে নিজের চেয়ারে বসতে দেন। ১৯ মিনিটের সময় কোচের বক্তব্য শেষ হলে সংবাদ সম্মেলনে প্রবেশ করেন ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেল। কোচ চেয়ার ছেড়ে দিলে সেখানে প্রতিমন্ত্রী বসেন। এরপর বাকি ২৬ মিনিট বাংলাদেশ জাতীয় দলের কোচ ও অধিনায়ক সংবাদ সম্মেলনের জন্য রাখা ১০টি চেয়ারের একটিতেও বসার সুযোগ পাননি।
এ সময়ে সাংবাদিকদের একাধিক প্রশ্ন ছিল সাবিনা ও ছোটনের কাছে। পেছনে দাঁড়িয়ে মাইক্রোফোন হাতে নিয়েই তারা প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। এ সময় ভদ্রতা দেখিয়েছেন কেবলমাত্র একজন ব্যক্তি। তিনি ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী। ৩১ মিনিটের সময় সাবিনা সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দেয়ার পর তিনি নিজে তাঁকে বসতে বলেছেন। সাবিনা আমতা আমতা করায় তিনি বলেছেন, ‘এটা কেমন দেখায়?’ এরপর ৪১ মিনিটের সময় কোচ ছোটন যখন সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দিচ্ছিলেন তখন তাঁকে চেয়ার ছেড়ে দিতে উঠে যেতে চান ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী। কিন্তু বাফুফে বস সালাউদ্দিনকে তখন মাইক্রোফোনে প্রতিমন্ত্রীর উদ্দেশ্যে বলতে শোনা যায়, ‘তুমি বসো’। এই পুরোটা সময় সংবাদ সম্মেলনের চেয়ার দখল করেছিলেন ক্রীড়া মন্ত্রণালয় ও বাফুফের কর্মকর্তারা। মন্ত্রী ও বাফুফের বসের ঠিক পেছনে যারা পুরো সময় ছিলেন তারা গুরুত্বপূর্ণ কেউ না।
বাংলাদেশে এমন নতুন দৃশ্য নয়। বিভিন্ন সময়েই দেখা যায়, সাফল্যের মূল কারিগরকে সঠিকভাবে মূল্যায়িত করা হয় না। এমন ঘটনায় সেটা আরেকবার প্রমাণ হয়েছে। তবে বিষয়টি এতটা নেতিবাচক হিসেবে না দেখতে অনুরোধ করেছেন অধিনায়ক সাবিনা খাতুন। নিজের ফেসবুক এ্যাকাউন্টে একটি পোস্টে এবারের সাফের সেরা খেলোয়াড় ও সর্বোচ্চ গোলদাতা বিষয়টি নিয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছেন। সংবাদ সম্মেলনের একটি ভিডিও ফুটেজ শেয়ার করেন সাবিনা। এরপর ফেসবুকে লিখেছেন, আমার বিনীত অনুরোধ, এটাকে কেউ নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখবেন না। নেতিবাচক চোখে দেখে দয়া করে আমাদের জীবনের সেরা দিনটি নষ্ট করবেন না। আসুন সবাই ইতিবাচক হই ও উপভোগ করি। শুধু বলতে চাই, আমরা আপনাদের ভালবাসি।
এদিকে আরও একটি বিব্রতকর ও লজ্জাজনক ঘটনা ঘটেছে উৎসবের মাঝে। বুধবার বিমানবন্দরে সংবর্ধনার সময় ভিড়ের সুযোগে দুই নারী ফুটবলার কৃষ্ণা রানী সরকার ও শামসুন্নাহার সিনিয়রের ডলার চুরির ঘটনা ঘটেছে। আনন্দ আর উল্লাসের মাঝে প্রথমে বিষয়টি কেউই বুঝতে পারেননি। পরে বাফুফে ভবনে নিজেদের লাগেজ খুলতে গিয়েই দেখা যায় ডলার চুরির বিষয়টি। সাফজয়ী দুই নারী ফুটবলারের ডলার চুরির ঘটনায় বৃহস্পতিবার মতিঝিল থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) লিগ্যাল উইং। পরে বিমানবন্দর থানায়ও সাধারণ ডায়েরি করার কথা আছে।

এ বিষয়ে বাফুফের নারী ফুটবল কমিটির চেয়ারম্যান মাহফুজা আক্তার কিরণ বলেন, ঢাকার শাহজালাল বিমানবন্দরে ডলার চুরি ঘটনার যদি কোন প্রমাণ না পাওয়া যায়, তাহলে আমরা নেপালের কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সঙ্গে যোগাযোগ করব। ঘটনাটা সেখানে ঘটেছে কি না তা খতিয়ে দেখার জন্য তাদের অনুরোধ জানাব। যদি দুই ফুটবলারের খোয়া যাওয়া ডলার উদ্ধার করা না যায়, তাহলে আমরা সমপরিমাণ অর্থ বাফুফের ফান্ড থেকে তাদের দিয়ে দেব।
জানা গেছে, কৃষ্ণার লাগেজের তালা ভেঙ্গে ৯০০ মার্কিন ডলার ও ৫০ হাজার টাকা চুরি করেছে দুর্বৃত্তরা। আর শামসুন্নাহারের লাগেজ কেটে নিয়েছে ৪০০ মার্কিন ডলার। শুধু তাই নয়, দুজনের মূল্যবান অনেক জিনিসও খোয়া গেছে বলে জানা গেছে।