ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে বিরোধী দলের ওয়াকআউট প্রসঙ্গে জাতীয় সংসদের নবনির্বাচিত স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেছেন, ওয়াকআউট করার অধিকার বিরোধী দলের রয়েছে। সংসদের এটি একটি প্রচলিত কার্যক্রম। তারা তাদের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি করেছে। না করলে ভালো হতো- বিশেষ করে প্রথম দিন না করলেই ভালো হতো। যাই হোক, সেটি তাদের বিষয়।
শুক্রবার (১৩ মার্চ) সকালে জাতীয় স্মৃতিসৌধ-এ মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর পর সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় তার সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল।
শ্রদ্ধা নিবেদনের পর বক্তব্যে স্পিকার বলেন, তিনি ও ডেপুটি স্পিকার স্মৃতিসৌধে উপস্থিত হতে পেরে নিজেদের অত্যন্ত সৌভাগ্যবান মনে করছেন। তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে রণাঙ্গনে শাহাদাত বরণকারী সকল শহীদের রুহের মাগফেরাত কামনা করেন।
তিনি স্বাধীনতার মহান ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া-এর রুহের মাগফেরাত কামনাও করেন। একই সঙ্গে তিনি বলেন, নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করেন যে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন এবং রণাঙ্গনে আহতও হয়েছিলেন। অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধার সর্বোচ্চ ত্যাগের বিনিময়ে দেশ স্বাধীন হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
স্পিকার বলেন, স্বাধীনতার মূল লক্ষ্য ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার প্রতিষ্ঠা করা। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রতিটি সদস্য এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে সর্বাত্মক উদ্যোগ নেবেন বলে তিনি আশা করেন।
তিনি বলেন, “আজ এক ঐতিহাসিক মুহূর্তে আমরা আপনাদের সামনে উপস্থিত হয়েছি। ১৭ বছরের ত্যাগ, তিতিক্ষা ও সংগ্রামের পর ফ্যাসিস্ট শাসনকে বিদায় করতে আমরা সক্ষম হয়েছি।”
তিনি বলেন, এ জন্য দেশের মানুষকে, বিশেষ করে রাজনৈতিক দলের কর্মী, ছাত্রছাত্রী, তাদের অভিভাবক এবং বিভিন্ন পেশার মানুষকে গভীর শ্রদ্ধা জানানো প্রয়োজন। জুলাই ও আগস্টের আন্দোলনে যারা ত্যাগ স্বীকার করেছেন, কষ্ট সহ্য করেছেন এবং “মাফিয়া সরকারের পতনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন”, তাদের প্রতিও শ্রদ্ধা জানান তিনি।
স্পিকার আরও বলেন, সাম্প্রতিক সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার যে সুযোগ তৈরি হয়েছে, তার সর্বোচ্চ ব্যবহার করা হবে। জাতির অর্থনৈতিক মুক্তি ও মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য বাস্তবায়নে সবাইকে অক্লান্ত পরিশ্রম করতে হবে। এ কাজে জনগণের সহযোগিতাও কামনা করেন তিনি।
সংসদে বিরোধী দলের ওয়াকআউট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি বিরোধী দলের একটি স্বীকৃত অধিকার এবং সংসদের প্রচলিত কার্যক্রমের অংশ। তারা তাদের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি করেছে। তবে প্রথম দিন ওয়াকআউট না করলে ভালো হতো বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেন, সংসদে সরকার ও বিরোধী দলের সহযোগিতা এবং ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার মাধ্যমেই সংসদ তার লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারে। ভবিষ্যতে বিরোধী দল সরকারের গঠনমূলক কর্মকাণ্ডে সহযোগিতা করবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে যাতে দেশে ফ্যাসিস্ট শক্তির পুনরুত্থান না ঘটে, সে বিষয়েও সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী সব রাজনৈতিক দলকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
স্পিকার বলেন, তিনি একটি ঐক্যবদ্ধ জাতি এবং ঐক্যবদ্ধ সংসদ দেখতে চান। তার আশা, এই সংসদ সেই ঐক্য প্রতিষ্ঠা করতে পারবে। জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণে সংসদ প্রয়োজনীয় সব কার্যক্রম গ্রহণ করবে এবং দেশকে ধীরে ধীরে উন্নতির পথে এগিয়ে নেবে।
তিনি বলেন, জনগণের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ণ রাখতে জাতীয় সংসদ সর্বাত্মক ভূমিকা পালন করবে।
বিরোধী দলকে পর্যাপ্ত সুযোগ দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে স্পিকার বলেন, নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার স্বার্থে তিনি তার ৩৪ বছরের পুরোনো দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল থেকে পদত্যাগ করেছেন, যাতে বিরোধী দল তার ওপর আস্থা রাখতে পারে। তিনি বলেন, বিরোধী দলের সব ধরনের সহযোগিতা তিনি কামনা করেন এবং আশা করেন তারা সেই সহযোগিতা করবে।
বিরোধী দলের অধিকারকে সম্মান করা হবে বলেও জানান তিনি। এ বিষয়ে তিনি আর কোনো মন্তব্য করতে চান না বলেও উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে তিনি বলেন, প্রত্যেক রাজনৈতিক দল তাদের নিজস্ব কর্মসূচি পালনের ক্ষেত্রে স্বাধীন থাকবে—এটাই প্রত্যাশা, এবং এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় সহনশীলতাও থাকা উচিত।
রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের দাবিতে বিরোধী দলের অবস্থান সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে স্পিকার বলেন, অধিবেশন চলাকালে কিছু স্লোগান তিনি দেখেছেন। তবে বিরোধী দলের কাজই হলো বিরোধিতা করা। তিনি আশা করেন, বিরোধিতা হবে গঠনমূলক এবং এমন কোনো কর্মকাণ্ড তারা করবে না, যাতে রাষ্ট্রের ক্ষতি হয় বা জাতীয় ঐক্য বিনষ্ট হয়।
রাজু








