ঢাকা, বাংলাদেশ   বুধবার ৩১ মে ২০২৩, ১৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩০

শোডাউন করতে চায় রাজপথে

তলে তলে ভোটের প্রস্তুতি নিচ্ছে জামায়াত

শরীফুল ইসলাম

প্রকাশিত: ২২:৫৩, ২০ মার্চ ২০২৩

তলে তলে ভোটের প্রস্তুতি নিচ্ছে জামায়াত

তলে তলে জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে জামায়াত

তলে তলে জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে জামায়াত। তাই দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজপথে শোডাউন করতে চায় স্বাধীনতাবিরোধী এ রাজনৈতিক দলটি। এদিকে নিজেদের দলের নিবন্ধন বাতিল হওয়ায় একাদশ জাতীয় নির্বাচনের মতো এবারও বিএনপির সঙ্গে নির্বাচন করতে চায় ওই দলটি। এ জন্য বিএনপির সঙ্গে আসন ভাগাভাগি করতে গোপনে দরকষাকষি শুরু করেছে। 
যুদ্ধাপরাধের বিচারে শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের ফাঁসি হওয়া ও নির্বাচন কমিশন থেকে দলের নিবন্ধন বাতিল হওয়ার পর মাঠের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন নীরব ছিল জামায়াত। কিন্তু সম্প্রতি বিএনপির নেতৃত্বে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল সরকারবিরোধী যুগপৎ আন্দোলন কর্মসূচি শুরুর পর জামায়াতও রাজপথে নেমে শক্তি প্রদর্শনের চেষ্টা করে। তবে তারা পুলিশের অনুমতি না পেয়ে হঠাৎ রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় দলীয় কর্মসূচি পালনের  নামে রাস্তায় নেমে ঝটিকা মিছিল করে গ্রেপ্তার এড়াতে দ্রুত পালিয়ে যায়। এভাবে কর্মসূচি পালন করতে গিয়ে মাঝে মাঝে দলটির নেতাকর্মীরা পুলিশের হাতে গ্রেপ্তারও হয়। 
বিভিন্ন সূত্র জানায়, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজপথে শোডাউন করার প্রস্তুতি নিচ্ছে জামায়াত। যে কোনো একটি কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে হঠাৎ রাজপথে নেমে বিশাল শোডাউন করে দলের শক্তি প্রদর্শন করতে চায় জামায়াতের নেতাকর্মীরা। এ জন্য রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় গোপনে নিজেদের মধ্যে বৈঠক করে প্রস্তুতি জোরদার করছে তারা। 
এদিকে সরকারবিরোধী যুগপৎ আন্দোলন নিয়ে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে আনুষ্ঠানিক কোনো বৈঠক না হলেও গোপনে দুই দলের সিনিয়র নেতাদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা হয়েছে এবং আরও হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়। এটি তাদের রাজনৈতিক কৌশল বলে অভিজ্ঞ মহল মনে করছেন। তবে এখন কৌশলে দূরত্ব বজায় রেখে চললেও দীর্ঘদিনের জোটসঙ্গী বিএনপি-জামায়াত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেই এক পর্যায়ে একসঙ্গে মাঠে নামবে এবং জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেবে। 
সূত্রমতে, জামায়াত নিষিদ্ধ করার বিষয়ে আদালতে একটি মামলা থাকলেও শেষ পর্যন্ত যাতে তাদের নিষিদ্ধ করা না হয় সে চেষ্টার অংশ হিসেবে সরকারি দলের সঙ্গেও তলে তলে যোগাযোগ রাখার চেষ্টা করছে জামায়াত। আর এ বিষয়টিকে প্রকাশ্যে এনে বিএনপি নেতারা বলতে চাচ্ছে তাদের সঙ্গে এখন জামায়াতের সম্পর্ক নেই। কিন্তু প্রকৃত পক্ষে জামায়াত নেতাদের সঙ্গে বিএনপির সিনিয়র নেতাদের বিভিন্ন মাধ্যমে নিয়মিতই যোগাযোগ হচ্ছে। 
বিএনপির সঙ্গে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যাওয়ার বিষয়ে এখন থেকেই আসন নিয়ে দরকষাকষি শুরু করেছে জামায়াত। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৫০ আসন দাবি করে ২৫ আসন পেলেও এবার তারা ৪০ আসন দাবি করে অন্তত ২০টি আসন পাওয়ার প্রত্যাশা করছে বলে জানা যায়। তবে বিএনপির পক্ষ থেকে এবার জামায়াতকে ১০টির বেশি আসন দেয়া সম্ভব নয় বলে প্রাথমিকভাবে জানিয়ে দেয়া হয়।

এ পরিস্থিতিতে কোনো কারণে বিএনপির সঙ্গে নির্বাচন করা সম্ভব না হলে জামায়াত যাতে নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত অন্য কোনো ছোট দলের প্রতীকে নির্বাচন করতে পারে সে প্রস্তুতিও রাখা হচ্ছে। নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধনের জন্য আবেদন জমা দেয়া বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি বিডিপির সঙ্গেও জামায়াত যোগাযোগ রাখছে। জামায়াতের সাবেক নেতারাই এ দলটি গঠন করেছে বলে জানা যায়। এ ছাড়া নানা কৌশলে দলের নিবন্ধন ফেরত পাওয়ার চেষ্টা করছে।
দীর্ঘদিন নীরব থাকার পর সাম্প্রতিক সময়ে জামায়াত খোদ রাজধানীতে ঝটিকা মিছিল করছে। এ ছাড়া সরকারের বিভিন্ন কর্মকা-ের সমালোচনা করে নিয়মিত গণমাধ্যমে বিবৃতি দিচ্ছে। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এ দলটি নতুন কৌশল নিয়ে রাজনীতির মাঠে সক্রিয় হতে চাচ্ছে। 
২০০৯ সালের এক রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট ২০১৩ সালের ১ আগস্ট রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামীকে নির্বাচন কমিশনের দেওয়া নিবন্ধন অবৈধ ঘোষণা করেন। এ রায়ের পর নির্বাচন কমিশন জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল করে। তবে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে ২০১৩ সালে আপিল করেছিল দলটি। তবে এত দিনেও তার নিষ্পত্তি হয়নি। 
সূত্র জানায়, বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট এখন অকার্যকর হয়ে গেলেও এ জোটের এলডিপি ও লেবার পার্টিসহ বেশ ক’টি দলের সঙ্গে জামায়াতের নিবিড়  সম্পর্ক রয়েছে। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কোনো কারণে জামায়াতের প্রার্থীরা বিএনপির প্রতীক ব্যবহার করতে না পারলে অথবা বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি (বিডিপি) নিবন্ধন না পেলে ২০ দলীয় জোটের পুরনো সঙ্গী এসব দলের যে কোন একটির সঙ্গে মিশে নির্বাচন করার চেষ্টা করবে। 
এদিকে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন মহলের চাপে জামায়াতের সঙ্গে প্রকাশ্যে দূরত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করছে বিএনপি। তবে ভেতরে ভেতরে দুই দলের নেতাদের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ হচ্ছে। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে জামায়াতের সঙ্গে তলে তলে পুরোনো সম্পর্ক বজায় রেখে সরকারবিরোধী যুগপৎ আন্দোলনে টানার চেষ্টা করছে বিএনপি। অতীতে প্রয়োগ করা রাজপথে জামায়াতের শক্তি ও ব্যাংক ভোটের কারণেই যে কোনো কৌশলে জামায়াতকে কাছে রাখার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। 
এদিকে আওয়ামী লীগসহ স্বাধীনতার পক্ষ শক্তি হিসেবে পরিচিত বিভিন্ন রাজনৈতিক দল চাচ্ছে স্বাধীনতাবিরোধী দল জামায়াত যেন সরাসরি দলীয় পরিচয়ে নির্বাচন করতে না পারে। জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু বলেছেন, স্বাধীনতা বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি আর যেন মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে না পারে সে ব্যাপারে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। 
সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী রাজনৈতিক দল জামায়াতের রাজনীতি করার অধিকার থাকা অনুচিত। কারণ, এখন পর্যন্ত জামায়াত জাতির কাছে ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চায়নি। তাই জামায়াতের রাজনীতি করার অধিকার নেই। 
অপরদিকে সম্প্রতি জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত আমির অধ্যাপক মুজিবুর রহমান এক বিবৃতিতে বলেন, জামায়াতকে রাজনীতি থেকে বঞ্চিত করার এখতিয়ার কারও নেই। তিনি বলেন, জামায়াত একটি নিয়মতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল। দেশের সংবিধান প্রত্যেক রাজনৈতিক দলকেই তাদের রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করার অধিকার দিয়েছে। এ অধিকার থেকে বঞ্চিত করার এখতিয়ার কারও নেই।