ঢাকা, বাংলাদেশ   রোববার ১৫ মার্চ ২০২৬, ১ চৈত্র ১৪৩২

রংপুরে অরেঞ্জ ইকোনমি হাব: সুষম প্রবৃদ্ধি ও দারিদ্র্য বিমোচনে নতুন সম্ভ

মেহেদী হাসান সুমন

প্রকাশিত: ২২:০৭, ১৫ মার্চ ২০২৬

রংপুরে অরেঞ্জ ইকোনমি হাব: সুষম প্রবৃদ্ধি ও দারিদ্র্য বিমোচনে নতুন সম্ভ

প্রতীকী ছবি। এআই জেনারেটেড

বাংলাদেশ যখন উন্নয়নশীল দেশ থেকে উন্নত অর্থনীতির পথে এগিয়ে যাওয়ার পথনকশা বাস্তবায়নে সচেষ্ট, তখন আঞ্চলিক বৈষম্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে সামনে দাঁড়িয়েছে। নিবিড় কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি নির্ভর রংপুর বিভাগ এখনও বহুমাত্রিক দারিদ্র্য, মৌসুমি বেকারত্ব, শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের অভাবে জাতীয় উন্নয়নের মূলস্রোতের বাইরে রয়ে গেছে। জাতীয় পর্যায়ে দারিদ্র্যের হার কমলেও অঞ্চলভিত্তিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই বিভাগ দারিদ্র্য ও বেকারত্বের একটি ঘনীভূত কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

দেশের উত্তরাঞ্চলের আট জেলার ৫৮ উপজেলা এবং ৩৩টি সংসদীয় আসনের সমন্বয়ে গঠিত বিভাগটি পৌনে দুই কোটি জনগণ নিয়ে একটি যুবসমৃদ্ধ সম্ভাবনাময় অঞ্চল। এ অঞ্চলে প্রায় ৩৫% জনসংখ্যা (১৫-৩৫ বছর) কর্মক্ষম, কিন্তু দারিদ্র্য, পুনঃপুন বন্যা-নদী ভাঙ্গণ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ না থাকায় তারা জাতীয় উৎপাদনের বাইরে থেকে যাচ্ছে। হাজার হাজার শিক্ষিত অথচ কর্মসংস্থানহীন তরুণ-তরুণী রয়েছে যাদের কেউ ন্যূনতম জীবিকার জন্য শ্রমঘন পেশা বেছে নিচ্ছে, কেউ উপযুক্ত কাজের অভাবে হতাশাগ্রস্ত হয়ে বিপথগামী নানা কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। এই সম্ভাবনাময় তরুণ জনগোষ্ঠীকে বাজার চাহিদাভিত্তিক কারিগরি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ করে তুলতে পারলে তারা হয়ে উঠতে পারে দেশের উৎপাদনশীল মানবসম্পদ।

বর্তমানে বাংলাদেশে ‘জনমিতিক লভ্যাংশ’ (Demographic Dividend) বা কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর (১৫-৬৪ বছর) আধিক্যের স্বর্ণযুগ চলমান যা ২০৪০ সাল পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। সুষম উন্নয়ন, দারিদ্র্য নিরসন ও সর্বোচ্চ জনমিতিক লভ্যাংশ অর্জনে দক্ষতা উন্নয়ন এবং বিনিয়োগে গুরুত্বারোপ না করলে এই জনমিতিক সম্ভাবনা নষ্ট হবে যা দ্বিতীয়বার অর্জন করা সম্ভব হবেনা। কারণ ২০৪০ সালের পর এই তারুণ্য নির্ভর জনগোষ্ঠী আর কর্মক্ষম থাকবেনা। সঠিক পরিকল্পনা ও নীতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে সারাদেশের ন্যায় রংপুরকে অর্থনীতির মূলস্রোতের সাথে একীভূত করার দারুণ সুযোগ রয়েছে। উন্নয়ন প্রশ্নে অতীতের মত রংপুরের জনগণের সাথে বিমাতৃসুলভ আচরণ এবং উপযুক্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি না করলে এই কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী এক সময় দেশের বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)-এর সর্বশেষ খানার আয় ও ব্যয় জরিপ ২০২২ এবং জানুয়ারি ২০২৫-এ প্রকাশিত দারিদ্র্য মানচিত্র অনুযায়ী, বাংলাদেশে সামগ্রিক দারিদ্র্যের হার ১৮.৭%। কিন্তু রংপুর বিভাগের দারিদ্র্যের হার ২৪.৮%, যা জাতীয় গড়ের চেয়ে বেশি। শুধু আয়ভিত্তিক দারিদ্র্য নয়-খাদ্য নিরাপত্তার সূচকেও রংপুর দেশের মধ্যে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের একটি। বিবিএস-এর ২০২৩ সালের খাদ্য নিরাপত্তা জরিপ অনুযায়ী, এই বিভাগের প্রায় ২৯.৯৮% মানুষ মাঝারি বা তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে, যা জাতীয় গড় ২১.৯১% শতাংশের তুলনায় প্রায় ৮ শতাংশ বেশি।

সম্প্রতি সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি) এবং ইউনিসেফের এক গবেষণা প্রতিবেদনে বাংলাদেশে শিশু দারিদ্র্যের এক উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। শিশু দারিদ্র্যের ক্ষেত্রে, ২০২৫ সালের জিইডি গবেষণা বলছে, দেশের সর্বোচ্চ ২৯.৯৯% শিশু দারিদ্র্যের হার এই রংপুর বিভাগেই বিদ্যমান।

এমন শোচনীয় বাস্তবতার নিরিখে, রংপুর বিভাগের কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি উন্নয়নের বাইরেও নীতিনির্ধারকদের ভিন্নধারার উন্নয়ননীতি নিয়ে ভাবার সময় এসেছে। এক্ষেত্রে রংপুর বিভাগে "অরেঞ্জ ইকোনমি হাব" প্রতিষ্ঠার বিষয়টি নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করতে পারে। অরেঞ্জ ইকোনমি মূলত সৃজনশীলতা, সংস্কৃতি, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনভিত্তিক অর্থনৈতিক কার্যক্রমকে বোঝায়-যেখানে উৎপাদনশীল মেধা ও সৃজনশীল মননশীলতাই প্রধান পুঁজি। ডিজিটাল কনটেন্ট নির্মাণ, গ্রাফিক ডিজাইন, অ্যানিমেশন, গেমিং, ফ্রিল্যান্সিং, লোকজ সংস্কৃতিভিত্তিক পণ্য উন্নয়ন, ফ্যাশন ডিজাইন কিংবা সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্টের মত প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং জেনজি ওরিয়েন্টেড বিষয়গুলো এ অর্থনীতিতে অন্তর্ভুক্ত।

রংপুর অঞ্চলের অর্থনৈতিক কাঠামোয় এই খাতটি বিশেষভাবে অবদান রাখতে পারে। কারণ, এ অঞ্চলে শিল্প কারখানা স্থাপনের জন্য প্রযোজনীয় বিপুল ভৌত অবকাঠামো ও বিনিয়োগের কারণে উদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী এবং কিছুক্ষেত্রে সরকারের অনীহ ধারাবাহিকভাবে পরিলক্ষিত হয়ে আসছে। অরেজ ইকোনমির ক্ষেত্রে বিপুল অবকাঠামো ও বিনিয়োগের প্রয়োজন তুলনামূলকভাবে কম। একটি ভালোমানের ল্যাপটপ, নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট সংযোগ, দক্ষতা প্রশিক্ষণ, আর্থিক প্রণোদনা কিংবা সহজ শর্তে ঋণ-এই কয়েকটি উপাদানই একজন তরুণকে বৈশ্বিক শ্রমবাজারে প্রবেশের সুযোগ সৃষ্টি করে দিতে পারে। পাশাপাশি, রংপুরের রয়েছে সমৃদ্ধ লোকসংস্কৃতি ও ঐতিহ্য- ভাওয়াইয়া গান, আঞ্চলিক নাট্যধারা, পল্লীজীবনের অনন্য উপস্থাপন-যা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে রপ্তানিযোগ্য কনটেন্টে রূপান্তরের একটি বিপুল সম্ভাবনায় খাত। কাম্য প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করা গেলে এসব সাংস্কৃতিক সম্পদ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের নতুন উৎসে পরিণত হতে পারে।

তবে বিরাজমান বাস্তবত বলে, রংপুরের বিপুল সংখ্যক তরুণ এখনও দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ থেকে বঞ্চিত। শিক্ষাব্যবস্থা শুধু মুখস্থ নির্ভর সনদ অর্জনের পন্থা হওয়ায় ডিজিটাল মিডিয়া, ই-কমার্স ব্যবস্থাপনা বা কনটেন্ট তৈরির মতো বাজার-উপযোগী দক্ষতা অর্জনের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি গ্রামীণ পর্যায়ে স্থিতিশীল ইন্টারনেট সংযোগের অভাব, স্টার্টআপ ইনকিউবেশন সেন্টারের অনুপস্থিতি এবং সহজ শর্তে ঋণ লাভে জটিলতার কারণে উদ্যোক্তা বিকাশের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তারেক রহমানের নেতৃত্বে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ দর্শনের ভিত্তিতে ভূমিধস বিজয়ের মধ্য দিয়ে সদ্য সরকার গঠন করেছে। দেশের ১১তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর বিএনপির চেয়ারম্যান জনাব তারেক রহমান ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়েছেন। দলটি তার নির্বাচনী ইশতেহারে প্রধান নির্বাচনী অঙ্গীকারের মধ্যে তরুণদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কারিগরি ও ভাষা দক্ষতা উন্নয়ন, স্টার্ট-আপ ও উদ্যোক্তা সহায়তা এবং বৈশ্বিক ই-কমার্স প্লাটফর্মে যুক্ত করার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছে।

এছাড়াও নির্বাচনী ইশতেহারের দ্বিতীয় অধ্যায়ে দারিদ্র্য-পীড়িত ও পশ্চাৎপদ অঞ্চলে মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং জনমিতিক লভ্যাংশ অর্জনে কর্মক্ষম যুব জনগোষ্ঠীর জন্য মানসম্মত শিক্ষা, বাজারভিত্তিক দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে কর্মমুখী কর্মসূচি গ্রহণ, তৃতীয় অধ্যায়ে সৃজনশীল অর্থনীতির উন্নয়ন এবং চতুর্থ অধ্যায়ে উত্তরাঞ্চলের উন্নয়নের অঙ্গীকার করেছে। যেখানে আঞ্চলিক বৈষম্য নিরসন এবং বিকেন্দ্রীকৃত উন্নয়নকে যে কৌশলগত অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে, এসব প্রতিশ্রুতির কার্যকর বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে রংপুর বিভাগে অরেজ ইকোনমির মধ্যমেয়াদি একটি পাইলট প্রকল্প সময়োপযোগী ও দূরদর্শী নীতিগত উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

এক্ষেত্রে সরকারের ত্বরিত ও ইতিবাচক পদক্ষেপ অত্যন্ত জরুরি। প্রথমত, রংপুরে একটি আঞ্চলিক অরেঞ্জ ইকোনমি হাব প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে যেখানে ডিজিটাল ক্রিয়েটিভ ল্যাব, মিডিয়া স্টুডিও এবং উদ্যোক্তা ইনকিউবেশন সেন্টার থাকবে। দ্বিতীয়ত, পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের মাধ্যমে দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি চালু করে প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক তরুণকে প্রশিক্ষণের আওতায় আনা সম্ভব। তৃতীয়ত, স্টার্টআপ উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ সিড ফান্ড গঠন করা জরুরি, যাতে তারা প্রাথমিক পর্যায়ের অর্থসংকট কাটিয়ে উঠতে পারে। সর্বোপরি, আন্তর্জাতিক ডিজিটাল মার্কেটপ্লেসে স্থানীয় পণ্য ও সেবার প্রবেশ নিশ্চিত করতে একটি রপ্তানি সহায়তা ডেস্ক গঠন করা যেতে পারে।

রংপুরের বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠীকে সৃজনশীল অর্থনৈতিক খাতে সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে জাতীয় ও বৈশ্বিক বাজারের সঙ্গে কার্যকরভাবে সংযুক্ত করা সম্ভব। এর ফলে নারী উদ্যোক্তা তৈরি ত্বরান্বিত হবে, আউটসোর্সিং ভিত্তিক বৈদেশিক আয় বৃদ্ধি পাবে এবং দীর্ঘদিনের শহর-গ্রাম আয়ের বৈষম্য হ্রাসে একটি দৃশ্যমান ও টেকসই ভিত্তি তৈরি হবে। উন্নয়নের এই নতুন ও সৃজনশীল ধারা উত্তরাঞ্চলের স্থবির অর্থনীতিকে শুধু গতিশীল করবে না, বরং সামগ্রিক জাতীয় প্রবৃদ্ধির গতিপথেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

লেখক: মেহেদী হাসান সুমন, বিবিএ, এমবিএ (মার্কেটিং), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; আহ্বায়ক, রংপুর বিভাগ বৈষম্য নিরসন আন্দোলন।

×