ঢাকা, বাংলাদেশ   রোববার ১৫ মার্চ ২০২৬, ১ চৈত্র ১৪৩২

মহিমান্বিত রজনী লাইলাতুল কদর

মনিরুল ইসলাম রফিক

প্রকাশিত: ২১:১০, ১৫ মার্চ ২০২৬

মহিমান্বিত রজনী লাইলাতুল কদর

দিনের অবসানে মহিমান্বিত রজনী লাইলাতুল কদর। আজ  গোটা সমাজ পুলকিত ও ব্যাকুল হয়ে আছে এ রজনীতে অবগাহন করার জন্য। মাহে রমজানকে মর্যাদার উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছে এ রজনী। খোদ আমাদের প্রিয় নবীজী (স.) লাইলাতুল কদর পাওয়ার জন্য ব্যাকুল থাকতেন। আর জীবনে এই রাত যখনই পেয়েছেন অবিশ্রান্ত ইবাদাতে মসগুল থেকেছেন আর আপনজনদেরকেও এ রজনীর নানা আমলে শামিল থাকার জন্য অস্থির করে তুলতেন। হাদিসে বিষয়টিকে এভাবে বোঝানো হয়েছে যে, নবীজী পরিবার পরিজন নিয়ে কোমর বেঁধে নেমে পড়তেন। অন্য কোনো দিবস বা রজনীর ক্ষেত্রে নবী পরিবারকে এমন ব্যতিব্যস্ত দেখা যায়নি। তাফসিরে রুহুলমানী থেকে জানা যায় মাহে রমজানের শুরু থেকেই নূর নবী (সা.) বন্ধুবর ফেরেশতা জিবরাইলের (আ.) কাছে জানতে চাইতেন কখন লাইলাতুল কদর আসছে আর তিনি ইতিকাফের মাধ্যমে তার ফজিলত পুরোপুরি গ্রহণ করবেন। পবিত্র এ রজনী হাজার মাসের চেয়েও উত্তম বলে সূরা কদরে উল্লেখ করা হয়েছে। এ রাতের ফজিলত ও মহাত্ম্য সম্বন্ধে হযরত সালমান হতে একটি তাৎপর্যপূর্ণ হাদিস বর্ণিত আছে। তিনি বলেন, মহানবী (সা.) শাবান মাসের সমাপণী দিবসে আমাদের নসিহত করেন এবং বলতেন, তোমাদের মাথার ওপর এমন এক মর্যাদাশালী মোবারক মাস ছায়াপাত করেছে যার মাঝে রয়েছে ‘লাইলাতুল কদর’ নামে একটি রাত-যা হাজার মাস হতেও উত্তম।
হযরত ইবনে আবি হাতিম সূত্র পরস্পরায় হযরত মুজাহিদ (র.) থেকে উদ্ধৃত করেন যে, একবার নবী-ই-দোজাহান (সা.) সাহাবাদের কাছে বনি ইসরাঈলের এক দরবেশের কথা বলেন। উক্ত দরবেশ একাধারে এক হাজার মাস পর্যন্ত আল্লাহর পথে জিহাদের জন্য অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে প্রস্তুত ছিলেন। এ ঘটনা শুনে উপস্থিত মুসলমানরা বিস্ময় প্রকাশ করেন। এমনিভাবে হযরত জারিরও হযরত মুজাহিদ (র.) এর উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, বনি ইসরাঈল যুগে জনৈক দরবেশ হাজার মাস ধরে সারাটা রাত ইবাদত বন্দেগি করতেন আর পুরোদিন লড়তেন শত্রুদের মোকাবিলায়। হযরত ইবনে আবি হাতিমের অপর এক বর্ণনা মতেÑ বনি ইসরাঈলের মধ্যে ৪ জন ইবাদত গুজার ব্যক্তি ছিলেন। তারা প্রত্যেকে ৮০ বছর যাবত আল্লাহর ইবাদতে সর্বক্ষণ মশগুল থাকতেন। উক্ত ৪ জন আবিদ হলেন হযরত আইয়্যুব, জাকারিয়া, হিজকিল ও ইউশা বিন নুন। এ ঘটনা শোনার পর উপস্থিত সাহাবাগণ বিস্মিত হয়ে পড়েন। ঠিক তখনই হযরত জিবরাঈল (আ.) এসে আরজ করেন : হে নবীকুল সম্রাট মুহম্মাদ (সা.)! আপনার উম্মতরা বনি ইসরাঈলের আবিদদের ব্যাপারে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। কিন্তু মহান প্রভু আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা সেটা অপেক্ষা উত্তম বস্তু আপনাকে দান করেছেন। তখন সূরা কদর নাজিল হয়। হযরত সুফিয়ান আসসোরীর বর্ণনা মতে : বরকতওয়ালা এ রজনীর প্রতিটি নেক কাজ- রোজা, নফল ইবাদত হাজার মাস অর্থাৎ ৮৩ বছর ৪ মাসের ইবাদত বন্দেগির সমতুল্য। 
কুরআন নাজিলের মহিমায় ভাস্মর এ রাত রমজানের শেষ দশকে অবস্থিত বলে এটা নাজাতের দশক হিসেবে বিঘোষিত হয়েছে। হযরত কা’ব (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, ৭ম আকাশে জান্নাতের অদূরে ‘সিদরাতুল মুনতাহা’ নামক গাছের মাঝামাঝি হজরত জিবরাঈলের নিবাস। আবার উক্ত গাছের শাখা-প্রশাখায় বাস করেন অসংখ্য অগণিত ফেরেস্তা। মু’মিনদের প্রতি স্নেহ পরায়ন এ সব ফেরেস্তা জিবরাঈলের (আ.) নেতৃত্বে এ রাতে আল্লাহর নির্দেশ মুতাবেক সুর্যাস্তের পরপরই পৃথিবীতে অবতরণ করেন, ঘুরে বেড়ান পৃথিবীর আনাচে-কানাচে। কিন্তু মুশরিক ‘জাদুকর’ নেশাখোর, জিনাকার, আত্মীয়ের প্রতি অনুদার প্রভৃতি খারাপ লোক এবং ময়লা আবর্জনাযুক্ত অপবিত্র স্থান থেকে দূরে থাকেন। পক্ষান্তরে মুমিনদের কল্যাণ ও মঙ্গল কামনা করে সারা রাত দোয়া করতে থাকেন। আর আল্লাহর পক্ষ থেকে সালাম পৌঁছাতে থাকেন ইবাদতে মশগুল সকল মুমিনের কাছে।
বর্ণিত আছে হযরত আয়েশা (রা.) আরজ করলেন হে আল্লাহর রাসূল (সা.) কদর রজনীতে কীভাবে দোয়া করব? প্রতিউত্তরে হযরত রাসুলুলাহ (সা.) এভাবে দোয়ার প্রশিক্ষণ দিলেন : (আরবি আলাহুম্মা ইন্নাকা আফুউউন-তুহিব্বুল আফওয়া ফা’ফুআন্নি- হে মহান আল্লাহ! নিশ্চয়ই আপনি ক্ষমাশীল আপনি ক্ষমা করাকে পছন্দ করেন, সুতরাং আমাকে ক্ষমা করে দিন।’ আমাদের এখানে একটা জিনিস লক্ষণীয় যে, আল্লাহর নবী (স.) হযরত আয়েশা (রা:) কে কত সুন্দর মুনাজাত শিক্ষা দিয়েছেন। সম্পত্তি নয়, টাকা-পয়সা নয়, শুধু ক্ষমা চাই। কারণ আখিরাতের ব্যাপার এতো জটিল ও কঠিন যে, সেখানে ক্ষমা ব্যতীত কোনো গতি নেই। যদি আল্লাহর আদালতে ক্ষমা না মিলে এবং আজাবে গ্রেপ্তার হতে হয় তবে দুনিয়ার সকল উপকরণ, ধন-দৌলত এবং ভোগ-বিলাসিতা কোনো কাজে আসবে না। 
লাইলাতুল কদরের তারিখ নিয়ে মতানৈক্য থাকলেও রমজানের শেষ দশকের যে কোন বেজোড় রাতেই যে ‘কদর রজনী’- সে ব্যাপারে নিঃসন্দেহ। তবে অধিকাংশ বিশ্লেষক আলেমেদ্বীন ও নিরীক্ষকদের মতে ২৭ রমজান রাতেই শবে কদর। নবীজী (সা.) এ শবে কদরকে পাওয়ার জন্য কখনো দশদিন কখনো ২০ দিন পর্যন্ত ইতিকাফ করেছেন। কিন্তু উম্মতের জন্য সহজ করে দিয়ে বলেছেন যে, মাহে রমজানের কোন তারিখ তা আল্লাহ আমাকে জানিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু আমি দুজন মানুষের সামনাসামনি বিবাদের সম্মুখীন হতে গিয়ে তারিখটি আর স্মরণে আনতে পারিনি। তোমরা মাহে রমজানের শেষ দশকে বেজোড় রাতগুলোতে এ মর্যাদাপূর্ণ রজনীটি হাসিলের কোশেশ কর।’ 
এ রাতের মহাত্ম্য অপরিসীম। এ রাতে আবিদ বান্দারা অবর্ণনীয় আত্মিক শান্তি অনুভব করে থাকেন এবং ইবাদত বন্দেগিতে পরিতৃপ্তি লাভ করেন। পুণ্যাত্মার শান্তি ও খুশিই এ রাতের বিশেষ্যত্ব। এ রাতে ইবাদতে একাগ্রতা লাভ হয়। কলব গাফিল হয় না। এ মহান রজনীতে আল্লাহ তায়ালা অসংখ্য পাপী গুণাহগারকে মাফ করেন। তাই এ বরকত ভরা রজনীটি খুলুসিয়াতের সঙ্গে পূত:পবিত্র দেহ-মনে ইবাদত বন্দেগির মাধ্যমে কাটানো উচিত। নফল নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত, তাসবিহ তাহলীল দান-খয়রাত, ওয়াজ-নসিহত, দরূদ শরীফ পাঠ ইত্যাদি নফল ইবাদতের দ্বারা পুরো রাতটি সদ্ব্যবহার ও সার্থক করে তোলা যায়। এ রজনীর পবিত্রতা রক্ষার্থে অযথা গল্পগুজব, আড্ডাবাজি ও আনুষ্ঠানিকতা থেকে দূরে থাকা উচিত। নফল ইবাদাত একান্তেই ভালো, নীরবে নিভৃতে। মা বোনদের অতিরিক্ত খানাপিনার আয়োজন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়া কিংবা যুবক শ্রেণির রাস্তাঘাটে হৈ হুল্লোড়ে মেতে ওঠা এ রজনীর গাম্ভির্যের পরিপন্থি এবং কোন কোন  ক্ষেত্রে বাড়াবাড়িমূলক কর্মকাণ্ড নিজের জন্য এবং সমাজের জন্য আল্লাহর অসন্তুষ্টিই  নিয়ে  আসে। আল্লাহ পাক আমাদেরকে এ মহামূল্যবান রজনীতে পূর্ণ গাম্ভীর্য সহকারে ইবাদত বন্দেগিতে সময় অতিবাহিত করার তৌফিক দিন।

লেখক  : অধ্যাপক, টিভি উপস্থাপক ও জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত খতিব
[email protected]

প্যানেল/মো.

×