মহান একুশের বইমেলা আমাদের ভাষা, সংস্কৃতি ও চেতনার এক অনন্য উৎসব। সাধারণত ভাষার মাস ফেব্রুয়ারির প্রথম দিন থেকে বইমেলা শুরু হয়। এবার রোজার মাসে বইমেলা চললেও এর আবেদন কমেনি। বরং এটি প্রমাণ করে, বইয়ের প্রতি মানুষের ভালোবাসা সময় বা পরিস্থিতির সীমায় আবদ্ধ নয়। প্রতি বছর অসংখ্য নতুন বই প্রকাশিত হয়, লেখকরা তাঁদের চিন্তা ও সৃষ্টিশীলতার ফসল পাঠকের হাতে তুলে দেন। তবু এক অস্বস্তিকর সত্য হলো, দিন দিন আমাদের পাঠাভ্যাস কমে যাচ্ছে।
আমরা বইকে উপকারী ও গুরুত্বপূর্ণ মনে করি, কিন্তু বাস্তবে সেই মূল্যায়নের প্রতিফলন ঘটে না আমাদের জীবনে। একাডেমিক পড়াশোনা শেষ হলেই অনেকের জীবনে বইয়ের স্থান দখল করে নেয় মোবাইল ফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ব্যস্ততার অজুহাত। জ্ঞানের উৎস হিসেবে বইয়ের পরিবর্তে আমরা নির্ভরশীল হয়ে পড়ছি সংক্ষিপ্ত পোস্ট, তড়িঘড়ি তথ্য আর অগভীর বিনোদনের ওপর। ফলে চিন্তার গভীরতা, বিশ্লেষণী ক্ষমতা ও মননের পরিধি সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে।
পাঠাভ্যাস হারিয়ে ফেলা নিঃসন্দেহে আত্মঘাতী প্রবণতা। কারণ একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ে ওঠে পাঠ, চিন্তা ও গবেষণার ওপর। বই মানুষের ভাবনাকে প্রসারিত করে, সহনশীলতা শেখায়, ভিন্নমতকে বুঝতে সাহায্য করে এবং সৃজনশীলতাকে উন্মুক্ত করে। যারা বই পড়ে, তারা শুধু তথ্য অর্জন করে না, তারা মানুষ ও পৃথিবীকে গভীরভাবে বুঝতে শেখে। আর যারা পড়ে না, তারা ধীরে ধীরে সংকীর্ণ চিন্তার গণ্ডিতে আবদ্ধ হয়ে পড়ে।
তাই সমাজ হিসেবে আমাদের ভাবতে হবে, কীভাবে পাঠের পরিবেশ ফিরিয়ে আনা যায়। পরিবারে ছোটবেলা থেকে বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠ্যবইয়ের বাইরে সাহিত্যচর্চা উৎসাহিত করা, গণগ্রন্থাগার সক্রিয় করা এবং গণমাধ্যমে বই নিয়ে আলোচনা বাড়ানো জরুরি। প্রযুক্তিকে প্রতিদ্বন্দ্বী না ভেবে সহযোগী হিসেবে ব্যবহার করে ই-বুক, অডিওবুক ও অনলাইন পাঠচক্র চালু করা যেতে পারে।
বইমেলা শুধু বই কেনাবেচার জায়গা নয়; এটি মননশীল সমাজ নির্মাণের আহ্বান। যদি আমরা সত্যিই জ্ঞানভিত্তিক সমাজ চাই, তবে বইয়ের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ককে সাময়িক নয়, আজীবনের বন্ধনে রূপ দিতে হবে। পাঠাভ্যাস ফিরিয়ে আনাই হতে পারে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ।
সুনামগঞ্জ থেকে
প্যানেল/মো.








