অপ্রশস্ত সড়কের কারণে যেখানে রোড ডিভাইডার মাত্র ১ ইঞ্চি চওড়া সেখানে পথচারী পারাপারের জন্য ডিভাইডারের খোলা অংশের ডিজাইন
ইউটিউবের ‘দুরবিন’-এ এক এক জ্ঞানী বাংলাদেশি ও বাংলাদেশ সম্পর্কে দারুণ সব সত্য কথা বলেছেন। তিনি শুরুতে বলেছেন ব্যঙ্গ বিদ্রুপে ঢাকা এক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি এ দেশ। বাংলাদেশে ভাইরাল হওয়া মানে জ্ঞান বা মেধা নয়, বরং অদ্ভুত অশিক্ষিত বেহুদা জনপ্রিয়তা। এ ব্যাপারে আমরা আরও কিছু কথা সংযোগ করতে চাই। এখানকার মানুষেরা মোটেও দায়িত্বশীল নয়। তারা ভীষণভাবে দুর্নীতিপরায়ণ। নিজের লাভ দেখাটাই তারা বড় করে দেখে। তাতে অন্যের অসুবিধা বা কষ্টকে মোটেও গণ্য করে না। না হলে সিটি করপোরেশন ঢাকা শহরের ফুটপাত কীভাবে ১-৪ ইঞ্চি পর্যন্ত উঁচু করে নির্মাণ করতে পারে। যেখানে ফুটপাতের উচ্চতা হবে ৫-৬ ইঞ্চি? ঢাকার সামান্য কিছু সড়কের কিছু অংশের ফুটপাতের উচ্চতা ৫-৬ ইঞ্চি (তবে মনে হয় এখানে ফুটপাতের উচ্চতা ১ ইঞ্চি-ই ছিল। সড়ক রক্ষণাবেক্ষণের জন্য নতুন স্তর দেওয়ার কারণে ফুটপাত এখন ৫-৬ ইঞ্চি উচ্চতার বলে মনে হচ্ছে)। দুর্নীতি করার জন্যই কি ফুটপাতগুলো বেশি উচ্চতায় নির্মাণ করা হয়েছে?
কারণ, বেশি উচ্চতার ফুটপাত নির্মাণ করার অর্থ বেশি প্রাক্কলন ব্যয়। আর বেশি ব্যয় অর্থ সংশ্লিষ্টদের পকেটেও বেশি অবৈধ অর্থ ঢোকা। এটি কেবল জনগণের বেশি অর্থ অপচয় নয়, বেশি উচ্চতার ফুটপাত ব্যবহারেও জনগণের অসুবিধা হচ্ছে। তাদের অনেক কষ্টে বেশি উঁচু ফুটপাতে উঠতে এবং তা থেকে নামতে হয়। তাই কোথাও কোথাও ফুটপাতে ওঠার জন্য রাস্তায় সিঁড়ি বানিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ এক অদ্ভুত এবং হাস্যকর সমাধান ! এমন সমাধান কেবল বাংলাদেশেই সম্ভব!! অনেকে বলতে পারেন- ৫-৬ ইঞ্চি উচ্চতার ফুটপাত হলে বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টিতে ফুটপাত ডুবে গিয়ে সাধারণের চলাচলে বিঘ্ন ঘটবে। সড়কে ট্রাফিক জ্যাম হলে মোটরসাইকেল ফুটপাতে উঠে আসবে। ফুটপাত ডুবে যাওয়া সাময়িক সমস্যা। তার জন্য চিরস্থায়ীভাবে ফুটপাত অনিয়মে তৈরি করা যায় না। আর মোটরসাইকেল ফুটপাতে উঠে এলে চালকের বিরুদ্ধে নিতে হবে কঠোর ব্যবস্থা। প্রয়োজনে মোটরসাইকেল জব্দ করতে হবে। মোটরসাইকেল রোধে ফুটপাতে নির্দিষ্ট দূরত্বে খুঁটি লাগানো যেতে পারে, যা কোথাও কোথাও দেখা যায। উল্লেখ্য, সড়কের দিকে ফুটপাত সামান্য একটু ঢালু হবে, যাতে বৃষ্টির পানি রাস্তায় নেমে আসে।
রোড ডিভাইডারের যে অংশ দিয়ে পথচারী পারাপারের ব্যবস্থা রাখা হয়, তার সর্বোচ্চ উচ্চতা হবে ৪ ইঞ্চি, যাতে দ্রুত এবং সহজে পথচারী সেখানে গিয়ে দাঁড়াতে পারে। ঢাকা জনবহুল শহর। তাই পারাপারের জায়গার দৈর্ঘ্য হবে ন্যূনতম ৪ ইঞ্চি এবং ডিভাইডারের প্রশস্ততা হবে ন্যূনতম ২ ইঞ্চি। যেখানে ডিভাইডার মাত্র ১ ইঞ্চি চওড়া, সেখানে ডিভাইডারে দাঁড়িয়ে থাকা পথচারীকে দ্রুত গতির কোনো যানবাহন যাতে ধাক্কা না দেয়, সে জন্য সেই অংশের উভয় দিকে ডিভাইডার সংলগ্ন রাস্তায় ৪ ইঞ্চি উচ্চতার ৬ ইঞ্চি পিকের সামান্য অর্ধবৃত্তাকার কংক্রিটের সলিড নিরাপত্তা বেষ্টনী থাকতে হবে।
তাছাড়াও দেখা যায়, ফুটপাত সংলগ্ন দালানে গাড়ি প্রবেশের জন্য র্যাম্প বসানো হয়েছে ফুটপাতের ওপরে। এ কাজ সম্পূর্ণ বেআইনি। র্যাম্প হবে দালানের মালিকের জায়গায়। কারণ, র্যাম্পটি দালান-মালিকের। ফুটপাতের জায়গা জনগণের। তবে র্যাম্প-সংলগ্ন ফুটপাতের ওই অংশে গাড়ি প্রবেশের জন্য ফুটপাত দুই দিক থেকে ঢালু হবে। মাঝে গাড়ির প্রস্থের সমান ন্যূনতম ৬ ফুট (যার যেমন প্রয়োজন) অংশ মাটির সমতলে হবে। যাতে সেখান দিয়ে গাড়ি সহজে দালানে প্রবেশ করতে পারে। আবার পথচারীও সহজে ফুটপাত ব্যবহার করতে পারে। বর্তমানে ফুটপাতের ওপরে র্যাম্প নির্মাণ করায় পথচারীকে এক পা ওপরে আর এক পা নিচে রেখে কাত হয়ে এবং ঝুঁকে অতি কষ্টে ফুটপাতের ওই অংশ দিয়ে চলাচল করতে হয়। এ-রকম ফুটপাত আর র্যাম্প দেখেই বোঝা যায় বাংলাদেশ কতটা নিকৃষ্ট অসভ্য দেশে পরিণত হয়েছে। ফুটপাত সংলগ্ন দালানের জমির মালিকের কাছ থেকে সিটি করপোরেশনের লোকেরা বেআইনি আর্থিক সুবিধা নিয়ে ফুটপাতের ওপরে র্যাম্প করে দিয়েছে। আবার দালানের মালিকরাও ফুটপাতের ওপরে র্যাপ করে নিয়েছে। কারণ র্যাম্প দালানের মালিকের জায়গায় তৈরি করতে হলে দালানটি একটু পিছিয়ে নির্মাণ করতে হয়। তাতে দালান হয় একটু ছোট। এ-সব কাজ কেবল দুর্নীতিকেই চিহ্নিত করে না; চিহ্নিত করে এ দেশের মানুষের অজ্ঞতাকে। পথচারী মনে করে ফুটপাতের কিছু অংশে এভাবে কাত হয়ে হাঁটা তাদের নিয়তি। তারা জানেও না যে, এভাবে কাত হয়ে কষ্ট করে ফুটপাতে হাঁটা তাদের নিয়তি নয়। তাই তারা ত্রুটিপূর্ণ র্যাম্প নির্মাণকালে কোনো অভিযোগ করে না। এ চিত্র কেবল ঢাকায় নয়, বাংলাদেশের সর্বত্র দেখা যায়।
সবশেষে বলতে চাই, ঢাকাকে বাসযোগ্য করতে হলে এই সব অপকর্ম চিরতরে বন্ধ করতে হবে। পর্যায়ক্রমে আমাদের পুরানো ফুটপাত এবং র্যাম্প ভেঙে দিয়ে নতুনভাবে সেগুলি নির্মাণ করতে হবে। নুতনভাবে র্যাম্প তৈরি করার সময় দালানের ফ্লোর স্লাবের কিছু অংশ ভেঙে দিয়ে র্যাম্পের সঙ্গে সমন্বয় করে ওই অংশটুকু পুনর্নির্মাণ করতে হবে। এ ব্যাপারে সরকারের সুদৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
লেখক : এডিশনাল চিফ ইঞ্জিনিয়ার, সওজ, (অব.)
প্যানেল/মো.








