ঢাকা, বাংলাদেশ   বুধবার ১১ মার্চ ২০২৬, ২৭ ফাল্গুন ১৪৩২

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ

আর্থসামাজিক সংকটে পড়বে বাংলাদেশ

ড. এস এম জাহাঙ্গীর আলম

প্রকাশিত: ১৯:০২, ১১ মার্চ ২০২৬

আর্থসামাজিক সংকটে পড়বে বাংলাদেশ

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সংকটে পড়তে পারে বা পড়বে। বাংলাদেশে প্রধানত উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং রেমিট্যান্স প্রবাহে বড় ধরনের ধস নামাতে পারে। প্রধান শ্রমবাজারগুলো অস্থিতিশীল হওয়ায় প্রবাসী আয় কমে যাওয়া এবং সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়লে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। যা দেশের অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় বড় নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বিস্তারিত সম্ভাব্য ক্ষতিগুলো নিচে দেওয়া হলো।
বাংলাদেশ তার প্রয়োজনীয় জ্বালানি তেলের বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করে। যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে বা হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে গেলে জ্বালানি তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যেতে পারে, যা উৎপাদন খরচ ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি করবে। রেমিট্যান্স ও শ্রমবাজার বড় ধরনের ধাক্কা খাবে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতারসহ বিভিন্ন উপসাগরীয় দেশে কাজ করা ৪৫ লাখের বেশি বাংলাদেশীর নিরাপত্তা নিয়ে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। সংঘাতের কারণে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে গেলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর আরও চাপ পড়বে।
আমদানি ও রপ্তানি বাণিজ্যও পড়বে সমস্যায়। কারণ, পণ্যবাহী জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটলে পোশাক শিল্পের কাঁচামাল আমদানি এবং তৈরি পোশাক রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হবে। জাহাজের ভাড়া ও সময় বাড়ার কারণে রপ্তানি বাণিজ্যে খরচ বাড়বে। বিশ্ববাজারে তেল ও কাঁচামালের দাম বাড়লে দেশের বাজারে সব ধরনের পণ্যের দাম লাগামহীনভাবে বেড়ে যেতে পারে। প্রবাসী ও কর্মী প্রেরণ বন্ধ হয়ে যেতে পারে। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে নতুন করে কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া স্থবির হয়ে পড়তে পারে, যা জনশক্তি রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বড় কথা হলো যে, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি ঘাটতি এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করবে।
বাংলাদেশের শ্রমবাজারের প্রায় ৬৭ শতাংশ সৌদি আরব কেন্দ্রিক। কাতার, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং জর্ডানের মতো দেশগুলো রেমিট্যান্সের মূল ভিত্তি। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় ৬০ লাখ বাংলাদেশি অবস্থান করছেন, যারা এখন চরম অনিশ্চয়তা ও জীবনের ঝুঁকিতে দিন কাটাচ্ছেন। এরই মধ্যে বাহরাইন ও আমিরাতে প্রবাসীদের প্রাণহানি এবং আহতের খবর আমাদের উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। আকাশসীমা বন্ধ হওয়া এবং ফ্লাইট বাতিলের ফলে হাজার হাজার শ্রমিকের কর্মস্থলে ফেরা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। অনেকের ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে আসছে, যা দীর্ঘমেয়াদি আইনি ও অর্থনৈতিক জটিলতা তৈরি করবে। এ সংকট নিরসনে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ানোর বিকল্প নেই। সংঘাতের দ্বিতীয় বড় আঘাত এসেছে জ্বালানি খাতে। হরমুজ প্রণালি বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের ধমনি হিসেবে পরিচিত। এটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বৈশি^ক এলএনজি ও তেলের বাজার অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছে। কাতার এলএনজি উৎপাদন বন্ধ রেখেছে এবং সৌদি আরামকো তাদের শোধনাগার নিয়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। বাংলাদেশের জ্বালানি তেলের সিংহভাগ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। যদি এই অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হয়, তবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম ১৩০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবহন খরচ এবং সর্বোপরি দ্রব্যমূল্যের ওপর, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে অসহনীয় করে তুলবে। রপ্তানি খাতের চিত্রটিও সমান ভয়াবহ। তৈরি পোশাকশিল্পের একটি বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্যের ট্রানজিট ব্যবহার করে ইউরোপ-আমেরিকায় যায়। সমুদ্রপথের ঝুঁকি বাড়ায় জাহাজগুলোকে এখন আফ্রিকার ‘কেপ অব গুড হোপ’ ঘুরে যেতে হবে, যা পরিবহন খরচ ও সময় উভয়ই বাড়িয়ে দেবে। বৈশি^ক প্রতিযোগিতামূলক বাজারে এই অতিরিক্ত ব্যয় বাংলাদেশের রপ্তানি সক্ষমতাকে পঙ্গু করে দিতে পারে। বিশেষ করে বিমা খরচ বা ‘ওয়ার রিস্ক প্রিমিয়াম’ বেড়ে যাওয়ায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে পড়বেন। এ সংকট থেকে উত্তরণে বাংলাদেশকে এখনই একটি ‘সংকটকালীন জাতীয় পরিকল্পনা’ গ্রহণ করতে হবে। প্রথমত, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে নিবিড় কূটনৈতিক যোগাযোগ রক্ষা করে প্রবাসীদের নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, জ্বালানি আমদানির জন্য কাতার বা সৌদি আরবের বিকল্প উৎস অনুসন্ধান এবং অভ্যন্তরীণ মজুদ ব্যবস্থাপনায় কঠোর হতে হবে। তৃতীয়ত, রপ্তানি সচল রাখতে বিকল্প শিপিং রুট এবং ফ্রেইট চার্জ নিয়ন্ত্রণে বিশেষ প্রণোদনার কথা ভাবা যেতে পারে। যুদ্ধের দামামা যখন বাজছে, তখন হাত গুটিয়ে বসে থাকার সুযোগ নেই। মধ্যপ্রাচ্যের এই অগ্নিপরীক্ষায় বাংলাদেশের অর্থনীতি কতটা টিকে থাকবে, তা নির্ভর করছে সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত এবং দূরদর্শী কূটনৈতিক কৌশলের ওপর। বিশ্বমঞ্চে যুদ্ধের অবসান ঘটানো হয়তো আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই, কিন্তু এর অভিঘাত থেকে নিজের দেশ রক্ষা করার প্রস্তুতি নেওয়া একান্ত জরুরি কর্তব্য।
বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার মধ্যে বাংলাদেশও নতুন করে জ্বালানি সংকটের মুখে পড়েছে। কাতারের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় এলএনজি সরবরাহ স্থগিত হওয়ায় সরকারকে স্পট মার্কেট থেকে উচ্চমূল্যে গ্যাস কিনতে হচ্ছে। ইতোমধ্যে অন্তত চারটি সার কারখানায় গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে বিদ্যুৎ উৎপাদনসহ জরুরি খাতে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। জানা গেছে, কাতার এনার্জি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির অধীনে গ্যাস সরবরাহ স্থগিত করে ‘ফোর্স মেজর’ ঘোষণা করেছে। এর ফলে দেশে গ্যাস রেশনিং শুরু করেছে সরকার। সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে রাষ্ট্রায়ত্ত পেট্রোবাংলা মার্চ মাসের জন্য স্পট মার্কেট থেকে দুটি এলএনজি কার্গো কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কোম্পানি গুনভরের কাছ থেকে প্রতি এমএমবিটিইউ ২৮.২৮ ডলার দরে একটি কার্গো কেনা হয়েছে, যা ১৫-১৬ মার্চ দেশে পৌঁছানোর কথা। আরেকটি কার্গো সিঙ্গাপুরভিত্তিক ভিটল এশিয়ার কাছ থেকে ২৩.০৮ ডলার দরে কেনা হয়েছে, যা ১৮-১৯ মার্চের মধ্যে আসবে।
বছরের শুরুতে যেখানে বাংলাদেশ স্পট মার্কেট থেকে প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজি প্রায় ১০ ডলার দরে কিনতে পেরেছিল, সেখানে মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে দাম বেড়ে প্রায় ২৯ ডলারে পৌঁছেছে। এতে জ্বালানি আমদানি ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল-ইরান উত্তেজনার কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর।
পেট্রোবাংলার একাধিক কর্মকর্তা সূত্রে জানা যায়, কাতারের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সরকারের সামনে স্পট মার্কেট থেকে উচ্চমূল্যে গ্যাস কেনা ছাড়া আর বিকল্প নেই। গ্যাস সংকটের কারণে বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদনকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে চারটি সার কারখানার গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে তা অন্য খাতে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে আমাদের মতো গরিব দেশগুলো বড় ধরনের সমস্যায় পড়তে পারে। এমতাবস্থায় আমাদের কূটনৈতিক তৎপরতা আরও বাড়াতে হবে।
লেখক : সাবেক কর কমিশনার ও প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান-ন্যাশনাল এফএফ ফাউন্ডেশন

প্যানেল/মো.

×