ঢাকা, বাংলাদেশ   বুধবার ১১ মার্চ ২০২৬, ২৭ ফাল্গুন ১৪৩২

ঈদ যাত্রা: আনন্দের পথে মৃত্যুফাঁদ রুখতে নতুন সড়ক নিরাপত্তা আইন জরুরি

তামান্না মিজান

প্রকাশিত: ১৩:০৮, ১১ মার্চ ২০২৬

ঈদ যাত্রা: আনন্দের পথে মৃত্যুফাঁদ রুখতে নতুন সড়ক নিরাপত্তা আইন জরুরি

ঈদ মানেই ঘরে ফেরা। দীর্ঘদিন পর পরিবারের সঙ্গে দেখা, শৈশবের স্মৃতিতে ফিরে যাওয়া, প্রিয়জনদের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেওয়া—এই আবেগেই লাখো মানুষ প্রতি বছর ঈদের আগে শহর থেকে গ্রামে ছুটে যায়। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এই আনন্দের যাত্রা অনেক সময়ই পরিণত হয় শোকের মিছিলে। ঈদের ছুটিতে দেশের মহাসড়ক ও আঞ্চলিক সড়কগুলোতে দুর্ঘটনার যে ভয়াবহতা দেখা যায়, তা আমাদের সড়ক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার এক নির্মম বাস্তবতা তুলে ধরে।

বিভিন্ন গবেষণা ও সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, ঈদ ভ্রমণের সময় সড়ক দুর্ঘটনার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। সাম্প্রতিক এক ঈদুল আজহা ভ্রমণ মৌসুমে দেশে শত শত সড়ক দুর্ঘটনায় বহু মানুষের মৃত্যু এবং শতাধিক মানুষের আহত হওয়ার ঘটনা ঘটে। এসব দুর্ঘটনার বড় একটি অংশে মোটরসাইকেল জড়িত ছিল। অতিরিক্ত গতি, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং এবং নিরাপত্তা সরঞ্জাম ব্যবহার না করার প্রবণতা এই দুর্ঘটনাগুলোকে আরও প্রাণঘাতী করে তুলছে।

এই সংখ্যাগুলো কেবল পরিসংখ্যান নয়—এগুলো অগণিত পরিবারের কান্না, তরুণ জীবনের আকস্মিক সমাপ্তি এবং অসহায় হয়ে পড়া পরিবারের গল্প।

মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা: বাড়ছে ঝুঁকি

বাংলাদেশে মোটরসাইকেলের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। শহরের যানজট এড়াতে এবং দ্রুত যাতায়াতের জন্য অনেকেই মোটরসাইকেল ব্যবহার করছেন। কিন্তু নিরাপত্তা সচেতনতার অভাব এবং নিয়ম অমান্য করার প্রবণতা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।

বাস্তবে দেখা যায়, অনেক চালক নিয়মিত হেলমেট ব্যবহার করেন না। আবার অনেকেই এক মোটরসাইকেলে তিন বা চারজন পর্যন্ত বহন করেন। ঈদের সময় দীর্ঘ দূরত্বে মোটরসাইকেলে ভ্রমণ করার সময় ক্লান্তি, ঘুম এবং অতিরিক্ত গতি দুর্ঘটনার বড় কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় তরুণ ও কর্মক্ষম মানুষ—যারা একটি পরিবারের প্রধান উপার্জনকারী।

আইন আছে, কিন্তু বাস্তবতা বদলায়নি

বাংলাদেশে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে ২০১৮ সালে Road Transport Act 2018 প্রণয়ন করা হয়। এই আইনে বেপরোয়া বা অবহেলাজনিত গাড়ি চালিয়ে কারও মৃত্যু ঘটালে কারাদণ্ড ও জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালানো, ফিটনেসবিহীন যানবাহন পরিচালনা, হেলমেট ছাড়া মোটরসাইকেল চালানো—এসবের জন্যও শাস্তির বিধান রয়েছে।

তবে বাস্তবতা হলো, আইন থাকা সত্ত্বেও দুর্ঘটনা কমেনি প্রত্যাশিতভাবে। কারণ আইন প্রয়োগ দুর্বল, মনিটরিং সীমিত এবং অনেক ক্ষেত্রে শাস্তির বাস্তব প্রয়োগ অনিয়মিত। ফলে অনেক চালকই এখনও মনে করেন যে নিয়ম ভাঙলেও তার তেমন কোনো পরিণতি নেই।

তাই এখন প্রয়োজন নতুন সড়ক নিরাপত্তা আইন

এই বাস্তবতায় শুধু বিদ্যমান আইনের আংশিক প্রয়োগ যথেষ্ট নয়। সময়ের দাবি হলো একটি সমন্বিত, আধুনিক এবং শক্তিশালী নতুন সড়ক নিরাপত্তা আইন (New Road Safety Law) প্রণয়ন করা।

এই আইনে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি—

• সড়ক নিরাপত্তাকে জনস্বাস্থ্য ও জাতীয় উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া
• মোটরসাইকেল নিরাপত্তা বিষয়ে আলাদা নীতিমালা
• বাধ্যতামূলক মানসম্মত হেলমেট ব্যবহার
• অতিরিক্ত গতি নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তিনির্ভর মনিটরিং (স্পিড ক্যামেরা, ডিজিটাল জরিমানা)
• পেশাদার চালকদের প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্সিং ব্যবস্থার সংস্কার
• দুর্ঘটনার তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের জন্য একটি জাতীয় ডেটা সিস্টেম
• একটি স্বাধীন সড়ক নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ গঠন

বিশ্বের অনেক দেশ ইতিমধ্যে এ ধরনের সমন্বিত আইন ও প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে সড়ক দুর্ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে সক্ষম হয়েছে। বাংলাদেশেও এখন সেই পথেই এগোতে হবে।

ঈদ যাত্রায় প্রয়োজন বিশেষ নিরাপত্তা পরিকল্পনা

ঈদ ভ্রমণ মৌসুমে হঠাৎ করে সড়কে গাড়ির চাপ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। তাই এই সময়ের জন্য আলাদা নিরাপত্তা পরিকল্পনা জরুরি।

কিছু বাস্তবধর্মী পদক্ষেপ হতে পারে—

• ঈদের আগে মহাসড়কে বিশেষ ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা
• ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান
• মোটরসাইকেল চালকদের হেলমেট ব্যবহার নিশ্চিত করা
• দীর্ঘপথে চালকদের বিশ্রামের সুবিধা
• প্রযুক্তিনির্ভর ট্রাফিক মনিটরিং ব্যবস্থা

আমাদেরও দায়িত্ব আছে

শুধু সরকার বা প্রশাসনের ওপর দায় চাপিয়ে দিলে সমস্যার সমাধান হবে না। সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নাগরিক সচেতনতা অপরিহার্য।

আমাদের প্রত্যেকের অঙ্গীকার হওয়া উচিত—

• গতিসীমা মেনে চলব
• মানসম্মত হেলমেট ব্যবহার করব
• ক্লান্ত অবস্থায় গাড়ি চালাব না
• মোটরসাইকেলে অতিরিক্ত আরোহী নেব না
• মোবাইল ফোন ব্যবহার করে গাড়ি চালাব না

নিরাপদে ঘরে ফেরা—এই হোক ঈদের প্রতিজ্ঞা

ঈদের আনন্দ তখনই পূর্ণতা পায়, যখন আমরা নিরাপদে ঘরে ফিরতে পারি। প্রতিটি দুর্ঘটনা শুধু একজন মানুষের জীবনই কেড়ে নেয় না—একটি পরিবারকে অন্ধকারে ঠেলে দেয়।

তাই এখন সময় এসেছে একটি শক্তিশালী বার্তা দেওয়ার—নিরাপদ সড়ক চাই। আমরা একটি নতুন ও কার্যকর সড়ক নিরাপত্তা আইন চাই।

সজিব

×