ঢাকা, বাংলাদেশ   বুধবার ১১ মার্চ ২০২৬, ২৭ ফাল্গুন ১৪৩২

পাটকল বৃত্তান্ত

মিলু শামস

প্রকাশিত: ১৯:৩৮, ১০ মার্চ ২০২৬

পাটকল বৃত্তান্ত

ছোটবেলায় আমরা ‘পাট’ রচনায় পড়েছি ‘নারায়ণগঞ্জকে বাংলার ড্যান্ডি বলা হয়।’ বড় হয়ে জেনেছি ড্যান্ডি বিখ্যাত হওয়ার পেছনে মূল ভূমিকায় আমাদের পাট। স্কটল্যান্ডের ড্যান্ডি শহরের পাটবস্ত্র কলে কাঁচামাল জোগান দিয়ে আমাদের কৃষক নিঃস্ব আর ওই দেশে বিকশিত হয় নব্য ধনিক। কারখানার সাইরেনে সাইরেনে শিল্প বিপ্লবের আগমনী স্পষ্ট হয়। ধারাবাহিকতায় সাম্য মৈত্রীর বাণী নিয়ে হাজির ফরাসি বিপ্লব। জন্ম হয় চার্লস ডিকেন্স, জেন অস্টিন, শার্লট ব্রন্টিদের। ও মাপের ঘটনা আমাদের এখানে ঘটেনি। বাই প্রডাক্ট সাহিত্যের জন্মও হয়নি। যেটুকু আলোড়ন এখানে লেগেছিল এবং তাতে যা সৃষ্টি হয়েছিল তার প্রায় সবটুকু স্ববিরোধিতায় ভরা। ‘পাট আমাদের প্রধান অর্থকরী ফসল, পাটকে সোনালি আঁশ বলা হয়...।’ তা হোক, বিল-পুকুরে পঁচানো পাট ততদিনে কারখানায় উঠেছে। কারখানার চাকায় লেগেছে শ্রমিকের হাত। প্রধান অর্থকরী ফসল বৈদেশিক মুদ্রা, যা আনল তা ভিনদেশী শাসকের পকেটেই গেল। বঞ্চনার ক্ষোভে এক হয়ে শ্রমিক-কৃষক গত শতকের তিরিশ দশকে এমনকি রাজনৈতিক শক্তি হিসেবেও ফুঁসেছিল। তিরিশের পথ বেয়ে ষাট। ছয় দফার প্রাণও ছিল এক অর্থে ঐ পাটে। পাট চাষি আর শ্রমিকের বঞ্চনা ছয় দফায় প্রাণসঞ্চার করেছিল আর সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে পৃথিবীর মানচিত্রে বাংলাদেশের অবস্থানকে নিশ্চিত করেছিল দ্রুততর। সেই পাট আর পাটকল ভয়ংকর ষড়যন্ত্রের শিকার হয় স্বাধীন দেশে। ১৯৮২ সালে শিল্পনীতি ঐতিহ্যের পাট, শ্রমিকের পাটকল, কৃষকের ক্ষেত ধ্বংসের প্রশস্ত পথ তৈরি করে। স্তব্ধ হয় কারখানার সাইরেন। আদমজী, কওমি, পিপলস ইত্যাদি পাটকলের মতো প্রথম সারির কলসহ রাষ্ট্রায়ত্ত প্রায় সব কল একে একে বন্ধ হয়। 
এরপর থেকে থেকে পাট নিয়ে নানান ইতিবাচক খবর শোনা যায়। যেমন বন্ধ থাকা কওমি ও পিপলস জুট মিলের কার্যক্রম উদ্বোধন করে বন্ধ থাকা আরও সাত পাটকল শীঘ্র চালু করার ঘোষণা। শ্রমিকদের বকেয়া পরিশোধের জন্য এক হাজার পঁচিশ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া। একই সঙ্গে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে নেয়া কারখানাগুলোর তিন হাজার কোটি টাকা ঋণ মওকুফ করা। কলগুলো চালু হলে সরকারি ব্যবস্থাপনায় উৎপাদনে যাওয়া। দৌলতপুর জুট মিলস, কর্ণফুলী জুট মিলস ও ফোরাত জুট মিলস লিমিটেডের ধারাবাহিকভাবে উৎপাদনে যাওয়া ইত্যাদি। শোনা গিয়েছিল পাটের উৎপাদন ও রফতানির হারও বেড়েছে অনেক। যাবতীয় সীমাবদ্ধতার পরও পাট ও পাটপণ্য রফতানি ৫৩ শতাংশ বেড়েছিল। দেশী বাজারেও পাট গুরুত্ব পেয়েছিল ৭৬ শতাংশ বেশি। মোট রফতানি হয়েছে ৬৪ কোটি ৩৪ লাখ ডলারের পাট ও পাটপণ্য। আগে যা ছিল ৪০ কোটি ৭৯ লাখ ডলার। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় সিনথেটিকের উৎপাদন খরচ বেড়েছে। প্রাকৃতিক আঁশ পাটের ব্যবহার ও দামও তাই বেড়েছে। এসব অনেক কথা শোনা গিয়েছিল। কিন্তু তাতে দেশের পাটকল ও পাট চাষ লাভজনক খাতে প্রবাহিত হচ্ছে- এমন খবর পাওয়া যায়নি। না পাওয়ারই কথা। কারণ পুঁজিবাদ উৎপাদনশীলতায় আগ্রহ হারিয়েছে বহু আগে। যে রূপ এবং গতিতে এখন সে বিশ্ব শাসন করছে সেখানে কলকারখানা গুরুত্বহীন। এখন অনুৎপাদনশীল খাতের জয়জয়কার।
একটা দেশের কলকারখানা চালু থাকা মানে তার অর্থনৈতিক প্রবাহে স্বাভাবিক গতি থাকা, যা সামাজিক সম্পর্কের ভারসাম্য ধরে রাখার পূর্বশর্ত। পোশাক কারখানা নিয়ে দেশে যা হচ্ছে পাটকল নিয়েও তা হয়েছিল। বার বার ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছে। আদমজী পাটকল আবার চালুর পরিকল্পনার কথা বলতে গিয়ে সে সময়ের পাট ও বস্ত্রমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘বিশ্বব্যাংকের শর্তের কাছে নতিস্বীকার করে  আদমজী বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু বিশ্বব্যাংকের শর্ত এখন আর কার্যকর নয় এবং দেশে ও আন্তর্জাতিক বাজারে আবারও পাটের চাহিদা বাড়ছে। সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে চায় সরকার।’ বলার অপেক্ষা রাখে না সে সম্ভাবনাকে তাদের সরকার কাজে লাগাতে পারেনি। পুঁজিবাদের বর্তমান ব্যবস্থায় তা সম্ভব নয় সে কথা আগেই বলেছি। বাংলাদেশের মতো দেশের পক্ষে তো নয়ই। 
উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত শ্রমিকের বেকার হয়ে অনিশ্চিত পথ পাড়ি দেয়ার প্রভাব শুধু তার একার জীবনে নয়, সমাজে সার্বিক জীবনযাত্রাতেই পড়ে। কারখানায় কাজ করা শ্রমিকের আত্মবিশ্বাস যে সংস্কৃতি তৈরি করে বেকার ভবঘুরে জীবন তা পারে না, তথাকথিত ক্ষুদ্র ঋণে যাদের জীবন চলে তাদের পক্ষেও তা সম্ভব নয়। কারণ ক্ষুদ্র ঋণগ্রহীতার বিচরণের গণ্ডি তার গ্রাম, বড়জোর ইউনিয়ন পর্যন্ত আর কারখানা শ্রমিককে সমাজের সঙ্গে অনেক বেশি আন্তঃসম্পর্কে (ওহঃবৎধপঃরড়হ) যেতে হয়। শ্রমিকের সঙ্গে সম্পর্কের প্রয়োজনে অন্যান্য শিল্পায়ন জরুরি হয়ে পড়ে। যেমন প্রসাধন শিল্প। দেশীয় প্রসাধনের বাজার ধরে রাখতে মূলত দেশের পোশাক শিল্পের নারী শ্রমিকদের অবদান সবচেয়ে বেশি। পোশাক শ্রমিকদের প্রয়োজনে আরও কয়েকটি শিল্প প্রতিষ্ঠান উৎপাদন কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। যদিও বহুজাতিক কোম্পানির দেশীয় দালালদের জন্য দেশীয় প্রডাক্ট মার খাচ্ছে। এই মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যে দেশীয় পণ্য যেমন বিপর্যস্ত তেমনি বিপর্যস্ত শ্রমিক, কৃষকও। গরিব কৃষক আরও গরিব হতে হতে রাজপথে ছিন্নমূল। শ্রমিকও কারখানা থেকে উৎখাত হয়ে কৃষকের পরিণতি বরন করছে। 
একজন দক্ষ শ্রমিক দেশের অমূল্য সম্পদ। হাজার হাজার দক্ষ শ্রমিকের হাত নিষ্ক্রিয় করে দিয়ে মধ্যস্বত্বভোগীদের বিচরণ অবাধ করা হয়েছিল। বিশ্বব্যাংকের কাঠামোগত সংস্কারের অংশ হিসেবে এক সময় সরকারি মালিকানায় ছয়শ’ পঞ্চাশটি শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ব্যক্তিমালিকানায় দেয়া হয়েছিল। উনিশ শ’ বিরাশি সালের নভেম্বর থেকে উনিশ শ’ পঁচাশির জুলাই পর্যন্ত রাষ্ট্রায়ত্ত পঁয়ত্রিশটি পাটকল ঢালাওভাবে ব্যক্তিমালিকানায় দেয়া হয়েছিল। প্রতিবাদে সে সময় সারাদেশে শ্রমিক-কর্মচারীরা ব্যাপক আন্দোলনে নামে। কিন্তু বিশ্বব্যাংকের কড়া নির্দেশ মেনে শ্রমিক আন্দোলন উপেক্ষা করে বিরাশি সালের তিরিশ নভেম্বর একদিনই সরকার দশটি এবং পরের মাসে আরও তেরোটি পাটকল বেসরকারি খাতে ছেড়ে দিয়েছিল। এ ধারাবাহিকতা মেনে বাকি বারোটা পাটকল বেসরকারি খাতে ছাড়া হয়। এমন সব মালিকের কাছে কলগুলো দেয়া হয়েছিল যাদের অনেকের শিল্পপ্রতিষ্ঠান চালানোর কোন অভিজ্ঞতা ছিল না। একসঙ্গে এত বড় বেসরকারিকরণ পৃথিবীতে এর আগে হয়নি।
 তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর অর্থনীতির মেরুদণ্ড এভাবে ভেঙে দেয়া হয়েছিল। কারখানা বন্ধ করে দেশি-বিদেশি বাণিজ্যে মধ্যস্বত্বভোগীদের লুটেপুটে খাওয়ার অবাধ সুযোগ করে দেয়া হয়েছিল। পরে যতই বজ্র আঁটুনি দেয়ার চেষ্টা হোক শেষ পর্যন্ত তা ফসকা গেরো হতে বাধ্য হয়েছে। কারণ লুটপাটই ক্রমশ হয়ে ওঠে অর্থনীতির আসল চেহারা। একেই আদার্শায়িত করে বর্তমান অর্থনৈতিক বিশ্ব ব্যবস্থা। ক্যামোফ্লেজ দিয়ে তা যতই ঢেকে রাখার চেষ্টা হোক। সুতরাং পাট ও পাটপণ্য নিয়ে নতুন করে আবার যেসব খবর গণমাধ্যমে আশার বাণীরূপে আবির্ভূত হচ্ছে তার পরিণতি আগের মতোই ক্ষণস্থায়ী বুদবুদ তুলে মিলিয়ে যাবে কি না সময়ই তা বলে দেবে। দেশপ্রেমী মানুষের প্রত্যাশা সোনালী আঁশের সোনালী দিন আবার ফিরে আসবে সগৌরবে। 

প্যানেল/মো.

×