ঢাকা, বাংলাদেশ   বুধবার ১১ মার্চ ২০২৬, ২৭ ফাল্গুন ১৪৩২

দৃশ্যপট বদলাবে কবে

মো. শাহিন আলম

প্রকাশিত: ২০:৫৫, ১০ মার্চ ২০২৬

দৃশ্যপট বদলাবে কবে

সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য প্রায়ই ভেসে ওঠে- রমজানে শয়তান শিকলে বাঁধার পূর্বে ব্যবসায়ীদের কাঁধে দায়িত্ব দিয়ে যায়। রসিকতার মোড়কে বলা হলেও কথাটির ভিতরে যে একটি সামাজিক অস্বস্তি লুকিয়ে আছে, তা অনুধাবন করা যায়। কারণ, পবিত্র রমজান এলেই আমাদের বাজার বেশ অস্থির হয়ে ওঠে, আর দেশের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের কপালে উদ্বেগের ভাঁজ পড়ে। রমজান আত্মসংযম, সহমর্মিতা ও সাম্যের শিক্ষা দেয়। ক্ষুধার অনুভূতির মধ্য দিয়ে অন্যের কষ্ট উপলব্ধির আহ্বান জানায়। কিন্তু অর্থনৈতিক পরিমণ্ডলে যেন উল্টো প্রবণতা কাজ করে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি ও মাথাপিছু আয় বেড়েছে। কিন্তু খাদ্য মূল্যস্ফীতি দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চমাত্রায় অবস্থান করছে (২০২৬ সালের জানুয়ারিতে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট ভিত্তিতে সাধারণ মূল্যস্ফীতি ৮.৫৮% এবং খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৮.২৯%)। নির্দিষ্ট বেতনের ওপর নির্ভরশীল মানুষের আয়ের বৃদ্ধির চেয়ে জীবনযাত্রার ব্যয় দ্রুত বেড়েছে- বাসাভাড়া, শিক্ষা, চিকিৎসা, বিদ্যুৎ-গ্যাস সবখানেই। ফলে মাসিক আয়ের বড় অংশ নিত্যপ্রয়োজনেই শেষ হয়ে যায়। রমজানে যখন নিত্যপণ্যের দাম আরও বাড়ে, তখন আধ্যাত্মিক মাসটি অনেক পরিবারের জন্য অর্থনৈতিক চাপের মাসে পরিণত হয়।
বাংলাদেশ একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ। নামাজের ওয়াক্ত হলে এত বেশি আজানের সুর বিশ্বের অন্য কোনো মুসলিম দেশেও শোনা যায় না। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানেও আমরা যথেষ্ট সচেতন বলেই দাবি করি। অথচ সেই ধর্মীয় চেতনা বাজার আচরণে প্রতিফলিত হয় না। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে, বিশেষত সৌদি আরবে রমজান উপলক্ষে মূল্যছাড়ের সংস্কৃতি সুপ্রতিষ্ঠিত। বড় খুচরা চেইন যেমন- পান্ডা রিটেইল কোম্পানির মতো মধ্যপ্রাচ্য শাখাগুলো রমজানজুড়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে আগের তুলনায় ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ ছাড় দেয়। ৬৫ রিয়ালের একটি ট্যাং জুসের মূল্য ৪০ রিয়ালেও বিক্রি করার মানসিকতা দেখা যায়। সেখানে কম লাভে বেশি বিক্রি- এই কৌশলকে দীর্ঘমেয়াদি বাজার বিনিয়োগ হিসেবে দেখা হয়। এমনকি যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মতো অমুসলিম দেশেও রমজান ও ঈদ উপলক্ষে বিশেষ অফার দেওয়া হয়। কারণ খুচরা বাজার সেখানে গ্রাহক আস্থার ওপর দাঁড়িয়ে। অবশ্য এসব দেশের বাজার পুরোপুরি নিখুঁত নয়। তবে তাদের কাঠামোগত শক্তি রয়েছে। সংগঠিত সরবরাহব্যবস্থা, দীর্ঘমেয়াদি আমদানি চুক্তি, বৃহৎ সুপারমার্কেট চেইন ও কার্যকর তদারকি মূল্য স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করে। তথ্যপ্রবাহ দ্রুত, বাজার পর্যবেক্ষণ কঠোর। ফলে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির সুযোগ সীমিত।
বাংলাদেশের বাস্তবতা ভিন্ন। কৃষিপণ্য থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত একাধিক মধ্যস্বত্বভোগীর স্তর বিদ্যমান। সরবরাহ শৃঙ্খলে স্বচ্ছতা কম, বাজার মনিটরিং দুর্বল, আর গুজবভিত্তিক চাহিদা অস্থিরতা তৈরি করে। ভোক্তার আগাম অতিরিক্ত কেনাকাটাও মূল্যবৃদ্ধিকে উসকে দেয়। প্রতিযোগিতা নীতি ও মাননিয়ন্ত্রণ কাঠামো কার্যকরভাবে প্রয়োগ না হওয়ায় মজুতদারি ও অতিরিক্ত মুনাফার সুযোগ থেকে যায়। আরেকটি বিষয় হলো ব্যবসায়িক সংস্কৃতি। যেখানে বড় করপোরেট খুচরা ব্যবসা আছে, সেখানে ব্র্যান্ড-ইমেজ, গ্রাহক-নিষ্ঠা ও দীর্ঘমেয়াদি বাজার দখলের কারণে রমজানে ছাড় দেওয়া একটি কৌশলী বিনিয়োগ হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু আমাদের দেশে ছোট-মাঝারি ব্যবসার আধিক্য, সীমিত পুঁজি ও ঋণের বোঝা তাৎক্ষণিক মুনাফাকে প্রাধান্য দেয়। এটি যেমন নৈতিকতার প্রশ্ন, তেমনি কাঠামোগত বাস্তবতারও।
আমাদের পক্ষেও পরিবর্তন অসম্ভব নয়। বিষয়টি নির্ভর করে আমরা সেই পরিবর্তনের জন্য কতটা প্রস্তুত ও আন্তরিক। আমাদের দেশে ইতিবাচক উদাহরণ যে একেবারেই নেই, এমন নয়। কিছু সুপারশপ রমজান উপলক্ষে মূল্যছাড় ঘোষণা করে। 
টিসিবি স্বল্পমূল্যে নিত্যপণ্য বিক্রির মাধ্যমে বাজারে স্বস্তি আনার চেষ্টা করে। কোথাও কোথাও করপোরেট উদ্যোগে বিশেষ অফারও দেখা যায়। কিন্তু এসব উদ্যোগ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিচ্ছিন্ন ও মৌসুমি থেকে যায়। অনেক ক্ষেত্রে আবার মূল্যছাড়ের নামে মেয়াদোত্তীর্ণ বা নিম্নমানের পণ্য বাজারজাতের অভিযোগ ওঠে। ভেজাল ও মাননিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন তো রয়েছেই। ফলে যে মূল্যছাড়ের সংস্কৃতি আস্থাভিত্তিক বাজার গড়ে তুলতে পারত, তা প্রায়ই অবিশ্বাস, অনিয়ম ও স্বল্পমেয়াদি কৌশলের আবরণে ঢাকা পড়ে যায়। অথচ প্রয়োজন ছিল সুস্পষ্ট নীতিনির্ভর, সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার। রমজান সংযমের মাস। সেই সংযম যদি কেবল ব্যক্তিগত ইবাদতে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তার সামাজিক তাৎপর্য অপূর্ণ থেকে যায়। অন্যান্য দেশে ব্যবসায়ীরা যদি কম লাভে বেশি বিক্রি করে দীর্ঘমেয়াদে লাভবান হতে পারেন, তবে আমাদের ব্যবসায়ীরা কেন পারবেন না? সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে অর্জিত মুনাফা হয়তো সাময়িকভাবে ব্যাংক-ব্যালেন্স বাড়ায়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক আস্থা ক্ষয় করে।
সবচেয়ে বড় কথা, ব্যবসায়ী, সরকার ও ভোক্তা- এই তিন পক্ষের আচরণগত পরিবর্তন জরুরি। ব্যবসায়ী যদি ন্যায্য মুনাফায় সন্তুষ্ট থাকার সংস্কৃতি গড়ে তোলেন, সরকার যদি কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করে এবং ভোক্তা যদি আতঙ্কিত কেনাকাটা থেকে সরে এসে সচেতন আচরণ করেন, তবে বাজার ধীরে ধীরে স্থিতিশীল হবে। সংযমের শিক্ষা বাজার আচরণে প্রতিফলিত হলে তবেই আধ্যাত্মিকতা ও অর্থনীতি একসূত্রে গাঁথা হবে। আমরা কি সেই নৈতিক অর্থনীতির পথে হাঁটার জন্য প্রস্তুত?

লেখক : শিক্ষার্থী,     ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

প্যানেল/মো.

×