বাংলাদেশে রেল অতি জনপ্রিয় একটি গণপরিবহন। ব্রিটিশ আমলে ১৮৬২ সালের ১৫ নভেম্বর এ অঞ্চলে প্রথম রেলপথ চালু হয়। তখন থেকে বিভিন্ন সময়ে দেশের নানা অঞ্চল রেলের আওতাভুক্ত হয়। এরই ধারাবাহিতায় দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় পর্যটন নগরী কক্সবাজার ২০২৩ সালের ১১ নভেম্বর রেলপথে সংযুক্ত হয়। দোহাজারী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত ১০১ কিলোমিটার রেলপথ চালুর পর পর্যটন প্রিয় মানুষ স্বপ্ন দেখেছিল। তবে দ্রুত, আধুনিক ও আরামদায়ক যাতায়াতের বাস্তবতা তুলে ধরছে ভিন্ন চিত্র। রেলপথ চালুর পর ট্রেনে কাটা পড়ে অন্তত ৩৫ জন মানুষ নিহত ও প্রাণহানি ঘটে একটি হাতির, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। রেলওয়ের তথ্য বলছে, দোহাজারী-কক্সবাজার রুটে মোট ৭২টি লেভেলক্রসিংয়ের মধ্যে মাত্র ১৬টিতে গেট ও গেটম্যান রয়েছে। সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ইসলামাবাদ-রামু সেকশনে ১৭টির মধ্যে গেটম্যান আছে মাত্র একটিতে। বহু স্থানে বাঁক ও গাছপালার কারণে দূর থেকে পথচারীরা ট্রেন দেখতে পায় না। ফলে দুর্ঘটনা অনিবার্য হয়ে উঠেছে। অথচ সংশ্লিষ্টরা দায়িত্ব এড়িয়ে বলছেন ‘প্রকল্প পুরোপুরি বুঝে পাওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ প্রশ্ন হলো, প্রকল্প বুঝে পাওয়ার আগ পর্যন্ত মানুষের জীবন কি গিনিপিগের ভূমিকা রাখবে? কর্তৃপক্ষের এ জাতীয় দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তব্য আমাদের ভাবিয়ে তোলে।
কক্সবাজার আইকনিক স্টেশনে রেলওয়ে পুলিশের কোনো থানা বা ফাঁড়ি নেই, মাত্র একজন উপপরিদর্শক দিয়ে দায়িত্ব সামলানো হচ্ছে। এমন অব্যবস্থাপনা কেবল অবহেলার নয়, বরং নিরাপত্তা বিষয়ে গভীর উদাসীনতার প্রমাণ। বড় প্রকল্প উদ্বোধন করা সহজ; কিন্তু তা সচল ও নিরাপদ রাখা বেশ কঠিন- এ সত্যই বার বারবার দৃশ্যমান হচ্ছে। আমরা মনে করি, এটি রেল কর্তৃপক্ষের চরম অব্যবস্থাপনা, দায়িত্বহীনতা ও নির্লজ্জতার নির্মম প্রকাশ। উন্নয়নের বাহারি প্রচারের আড়ালে যদি নিরাপত্তা নিশ্চিতে ন্যূনতম ব্যবস্থা না থাকে, তবে সেই উন্নয়ন মানুষের জীবনের জন্য সম্ভাবনা না হয়ে পরিণত হয় আতঙ্কে। অন্যতম জনপ্রিয় রেলপথ ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে লোকোমোটিভ সংকটও যাত্রীমনে নতুন আতঙ্ক তৈরি করেছে। যাত্রীদের দুর্ভোগের চরম উদাহরণ দেখা গেছে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে, যেখানে ইঞ্জিন না থাকায় আন্তঃনগর ট্রেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকে। ঈদযাত্রার মতো স্পর্শকাতর সময়ে এ অবস্থা আরো ভয়াবহ বিপর্যয়ের ইঙ্গিত দেয়।
নির্ধারিত সময়ে ট্রেন ছাড়তে না পারা, পথে পথে ইঞ্জিন বিকল হওয়া, সেতুতে উঠতে গিয়ে থেমে যাওয়া- এসব ঘটনা এখন ঘটছে হরহামেশা। সর্বশেষ কেনা ৩০০০ সিরিজের বহু লোকোমোটিভ অচল হয়ে পড়ে আছে। এমন বাস্তবতায় বাংলাদেশ রেলওয়ে পাঁচ জোড়া ঈদ স্পেশাল ট্রেন চালানোর ঘোষণা দিয়েছে এবং শতভাগ অনলাইনে অগ্রিম টিকিট বিক্রির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। নিঃসন্দেহে এ উদ্যোগ প্রশংসনীয়। প্রশ্ন থেকে যায়, যেখানে বিদ্যমান ট্রেনই ঠিকমতো চলতে পারে না, সেখানে অতিরিক্ত ট্রেন চালিয়ে নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে? আমরা মনে করি, যাত্রীসেবার নামে কাগুজে স্বপ্ন দেখিয়ে বাস্তব সমস্যা আড়াল করা আত্মপ্রবঞ্চনা ছাড়া কিছু নয়। আমরা মনে করি, খুব দ্রুত সব অরক্ষিত ক্রসিংয়ে গেট ও গেটম্যান নিয়োগ, লোকোমোটিভ মেরামত ও আধুনিকীকরণ, স্টেশনে নিরাপত্তা জোরদার এবং প্রকল্প হস্তান্তরের জটিলতা অবিলম্বে নিরসন করতে হবে। অন্যথায় প্রতিটি দুর্ঘটনা শুধু ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়, রাষ্ট্রের ব্যর্থতার দলিল হয়ে থাকবে।
প্যানেল/মো.








