সম্প্রতি শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের সঙ্গে শিক্ষক ঐক্যজোটের নেতাদের দাবি-দাওয়া নিয়ে আলোচনার ঘটনাটি শুধু একটি বৈঠকের বিবরণ নয়; এটি আমাদের শিক্ষা–রাজনীতির গভীর সংকটের একটি দৃশ্য। রাষ্ট্র ও শিক্ষক সমাজের সম্পর্ক একমুখী নয়; এটি পারস্পরিক। শিক্ষকেরা রাষ্ট্রের কাছ থেকে অধিকার চান, যা ন্যায্য দাবি। একইসঙ্গে রাষ্ট্রও শিক্ষকদের কাছে প্রত্যাশা করে শিক্ষার মানোন্নয়ন, শৃঙ্খলা, গবেষণা, নৈতিক নেতৃত্ব এবং শিক্ষার্থী কেন্দ্রিক উদ্যোগ।
বাংলাদেশে শিক্ষক সংগঠনগুলোর আন্দোলন কোনো আকস্মিক বা সাময়িক ঘটনা নয়; এটি দীর্ঘদিনের পেশাগত বাস্তবতা ও কাঠামোগত বৈষম্যের ফল। বিশেষ করে শিক্ষক-কর্মচারী ঐক্যজোট, বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি, বাংলাদেশ কলেজ শিক্ষক সমিতি এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতি বছরের পর বছর ধরে বেতন-ভাতা, পে-স্কেল, পদোন্নতি, চাকরি জাতীয়করণ, প্রাতিষ্ঠানিক নিরাপত্তা ও বৈষম্য দূরীকরণের দাবিতে সোচ্চার হয়ে আসছে। এই দাবিগুলোকে কেবল আন্দোলনের ভাষা হিসেবে দেখলে ভুল হবে; এগুলোর পেছনে রয়েছে শিক্ষা ব্যবস্থার টেকসই উন্নয়নের প্রশ্ন।
শিক্ষকতা এমন একটি পেশা, যেখানে উচ্চশিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রমের প্রয়োজন হয়। বাস্তবতা হলো, অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষকদের বেতন কাঠামো অন্যান্য সমমানের পেশার তুলনায় পিছিয়ে থাকে। বিশেষত বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষকরা দীর্ঘদিন ধরে বৈষম্যমূলক কাঠামোর শিকার। ন্যায্য পে-স্কেল নিশ্চিত করা মানে কেবল অর্থ বৃদ্ধি নয়; এটি শিক্ষকের সামাজিক মর্যাদা পুনর্প্রতিষ্ঠার একটি উপায়। আর্থিক অনিশ্চয়তা থাকলে একজন শিক্ষক গবেষণা, সৃজনশীলতা ও মানোন্নয়নে মনোযোগ দিতে পারেন না। ফলে শিক্ষার মানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে এমপিওভুক্ত ও অনানুষ্ঠানিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে বৈষম্য রয়েছে। জাতীয়করণের দাবি এসেছে মূলত এই বৈষম্য কমানোর জন্য। একই ধরনের কাজ করেও যদি কেউ কম সুবিধা পান, তবে সেটি পেশাগত অসন্তোষ সৃষ্টি করে। জাতীয়করণ বা সমমানের সুবিধা নিশ্চিত করা হলে শিক্ষকদের মধ্যে নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা তৈরি হবে, যা শিক্ষার্থীদের ওপরও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
সরকারের দায়িত্ব শুধু প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নয়; শিক্ষা ব্যবস্থাকে দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী করা। শিক্ষকদের ন্যায্য দাবি আমলে নেওয়া এবং ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের রোডম্যাপ তৈরি করা। শিক্ষাখাতে ব্যয় বৃদ্ধি কোনো খরচ নয়; এটি মানবসম্পদ উন্নয়নের বিনিয়োগ। উন্নত দেশগুলো তাদের শিক্ষকদের মর্যাদা ও আর্থিক নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেয় বলেই শিক্ষা ব্যবস্থা হয় শক্তিশালী।
একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দাবি বাস্তবায়নের সঙ্গে মানোন্নয়ন ও দায়বদ্ধতার কাঠামো যুক্ত করা। অর্থাৎ, সরকার যেমন শিক্ষকদের ন্যায্য সুবিধা নিশ্চিত করবে, তেমনি শিক্ষকদেরও পেশাগত উন্নয়ন, গবেষণা, প্রশিক্ষণ ও মূল্যায়নের ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি নিশ্চিত করতে হবে। এই পারস্পরিক প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতেই টেকসই শিক্ষা সংস্কার সম্ভব। কিন্তু সমস্যার জায়গা তৈরি হয় তখন, যখন দাবির ভাষা থাকে জোরালো, অথচ প্রতিদানে দায়িত্ব পালনের প্রতিশ্রুতি থাকে অস্পষ্ট।
শিক্ষামন্ত্রীর প্রশ্ন, ‘আমরা সব দাবি মেনে নেব, কিন্তু বিনিময়ে আপনারা জাতিকে কী দেবেন?’ আসলে রাষ্ট্রের একটি মৌলিক নীতির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়; রাষ্ট্র শুধু সুবিধা দেয় না, প্রত্যাশাও করে। যদি শিক্ষকেরা কেবল আর্থিক ও প্রশাসনিক দাবি উত্থাপন করেন, কিন্তু শিক্ষার গুণগত উন্নয়ন, পরীক্ষার স্বচ্ছতা, পাঠদানের মানোন্নয়ন, গবেষণা ও পাঠ্যক্রম সংস্কার বিষয়ে সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা দিতে না পারেন, তাহলে জনমনে প্রশ্ন উঠবেই।
বাংলাদেশের ইতিহাসে শিক্ষক ছিলেন কেবল চাকরিজীবী নন; তিনি ছিলেন সমাজ-নির্মাতা, পথ-প্রদর্শক। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ, গণ-অভ্যুত্থান, জুলাই গণ-আন্দোলন সব জায়গায় শিক্ষকদের ভূমিকা ছিল দৃশ্যমান। ২১ ফেব্রুয়ারির প্রেক্ষাপট, যা পরে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে বিশ্বস্বীকৃতি পেয়েছে, সেই সংগ্রামের পেছনেও শিক্ষকদের নৈতিক নেতৃত্ব ছিল। কিন্তু আজ শিক্ষক নেতৃত্ব যদি একটি নীতিগত প্রশ্নের উত্তর দিতে ব্যর্থ হন, তাহলে জাতি হিসেবে আমরা হতাশ হবো। শিক্ষামন্ত্রীর জিজ্ঞাসা ছিল, ‘আপনারা কী দেবেন? আপনারা প্রত্যেকে একটি করে প্রতিশ্রুতি দিন।’ এর উত্তরে শিক্ষক নেতারা সুস্পষ্ট কোনো কথা বলেননি। এটি শুধু একটি বৈঠকের ব্যর্থতা নয়; এটি শিক্ষা ব্যবস্থার ভেতরের শূন্যতার প্রকাশ।
অনেক শিক্ষক নেতা সংগঠনকে পেশাগত উন্নয়নের প্ল্যাটফর্মের বদলে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করেন। যার ফলে নীতি নির্ধারণে গঠনমূলক প্রস্তাব কম আসে, শিক্ষা সংস্কারের রোডম্যাপ অনুপস্থিত থাকে, শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক আলোচনার বদলে ব্যক্তিকেন্দ্রিক বক্তৃতা বেশি প্রাধান্য পায়। বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ পর্যায়ে গবেষণা, পাঠদানের আধুনিক পদ্ধতি, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা- এসব বিষয়ে সম্মিলিত পরিকল্পনা খুব কম দেখা যায়। অথচ বিশ্বে শিক্ষা দ্রুত বদলে যাচ্ছে। যে পেশা জাতি গড়ে, সেখানে আত্মসমালোচনা ও জবাবদিহি থাকা উচিত সবচেয়ে বেশি। কিন্তু অনেক সময় সংগঠিত শক্তি আত্মরক্ষামূলক ঢাল হয়ে দাঁড়ায়।
শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য ছিল, ‘মাইন্ড ইট, ইউ আর এ টিচার। আমি যে প্রশ্ন করব, সেই প্রশ্নের উত্তরে যদি অন্য উত্তর লেখেন, আমি কি নম্বর দেব?’ এটি মূলত একটি নৈতিক স্মরণবার্তা। তিনি উদাহরণ দিয়ে বোঝাতে চেয়েছেন, প্রশ্নের সঠিক উত্তর না দিয়ে পুরনো কাহিনী বললে নম্বর পাওয়া যায় না। এই বক্তব্যে প্রশাসনিক কঠোরতা যেমন আছে, তেমনি একটি বার্তাও আছে : শিক্ষকদের কাছ থেকে সমাজ মানদণ্ড স্থাপনের পরিকল্পনা প্রত্যাশা করে।
যদি শিক্ষক নেতারা সত্যিই শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন চান, তবে তাদের বক্তব্য ও প্রতিশ্রুতি আরও স্পষ্ট হওয়া দরকার ছিল। কিভাবে পরীক্ষায় শতভাগ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করবেন, কিভাবে নকলমুক্ত পরিবেশ গড়ে তুলবেন, প্রতিটি শিক্ষক বছরে ন্যূনতম একটি প্রশিক্ষণে অংশ নেবেন, কিভাবে গবেষণা ও প্রকাশনায় সক্রিয়তা বাড়াবেন, শিক্ষার্থীদের মেন্টরিং ব্যবস্থা চালু করবেন, পাঠ্যসূচি আধুনিকীকরণে প্রস্তাব দেবেন, প্রভৃতি বিষয়সমূহের পরিকল্পনা স্পষ্ট থাকা জরুরি। এমন কিছু সুস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দিলে আলোচনাটি অন্য উচ্চতায় যেতে পারত।
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা এখন একটি সন্ধিক্ষণে। একদিকে প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা; অন্যদিকে কাঠামোগত জটিলতা, রাজনৈতিক প্রভাব, মানগত বৈষম্য। এই প্রেক্ষাপটে শিক্ষক নেতৃত্ব যদি কেবল দাবি-দাওয়া নিয়েই ব্যস্ত থাকে। তবে শিক্ষা পিছিয়ে পড়বে। আমি-আপনি যেহেতু নিজেও শিক্ষা ও গবেষণার সঙ্গে যুক্ত এবং বাংলাকে জ্ঞান-বিজ্ঞানের ভাষা হিসেবে শক্তিশালী করতে আগ্রহী; এ ধরনের ঘটনা আমাদের সবাইকে আত্মসমালোচনার দিকে ঠেলে দেয়। শিক্ষক সমাজ যদি নিজেদের মধ্যেই একটি একাডেমিক সংস্কার আন্দোলন শুরু না করে। তবে কেবল প্রশাসনিক পরিবর্তনে কাক্সিক্ষত ফল আসবে না।
শিক্ষকতা পেশা হিসেবে অন্য কোনো চাকরির মতো নয়। শিক্ষককে বলা হয় ‘জাতি গড়ার কারিগর’; এটি কেবল আবেগঘন উপাধি নয়, বরং একটি গভীর সামাজিক বাস্তবতা। একজন শিক্ষক শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান দেন না; তিনি মূল্যবোধ, শৃঙ্খলা, যুক্তিবোধ, নৈতিকতা ও দায়িত্বশীলতার সংস্কৃতি তৈরি করেন। শিক্ষার্থীরা কেবল তার কথাই শোনে না, তার আচরণও অনুকরণ করে। আমরা জানি, দাবি তোলা সহজ; প্রতিশ্রুতি দেওয়া কঠিন। কিন্তু জাতি গড়ার কারিগর হিসেবে আমাদের কাছে সমাজ কঠিনটিই প্রত্যাশা করে। শিক্ষক যদি প্রশ্নের সঠিক উত্তর স্পষ্ট না করেন, তবে ছাত্ররাও একদিন একই পথ বেছে নেবে। তারা সুবিধা চাইবে, কিন্তু প্রতিদানে অবদান রাখতে দ্বিধাগ্রস্ত হবে। তখন কেবল একটি শ্রেণিকক্ষ নয়, পুরো জাতিই নম্বর হারাবে নৈতিকতা, শৃঙ্খলা ও কর্মদক্ষতার পরীক্ষায়।
অন্যদিকে, রাষ্ট্র যদি শিক্ষকদের ন্যায্য দাবি আমলে না নেয় এবং পেশাগত মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে, তবে শিক্ষা ব্যবস্থার ভিত আরও দুর্বল হয়ে পড়বে। তাই সরকারের উচিত সংলাপের মাধ্যমে একটি বাস্তবভিত্তিক, ধাপে ধাপে বাস্তবায়নযোগ্য পরিকল্পনা গ্রহণ করা। কারণ, শিক্ষককে শক্তিশালী করা মানে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে শক্তিশালী করা। আর শিক্ষা ব্যবস্থায় বিনিয়োগ মানে দেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নে বিনিয়োগ।
লেখক : অধ্যাপক ও রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত), জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়,
ত্রিশাল, ময়মনসিংহ
[email protected],
[email protected]
প্যানেল/মো.








