বাংলাদেশের জনসংখ্যার অর্ধেক নারীকে জনসম্পদে পরিণত করতে এশিয়ার উন্নত দেশগুলোর নীতি অনুসরণ করা জরুরি। দেশের পিছিয়ে পড়া নারীর জন্য সঠিক নীতি ও পরিকল্পনা গ্রহণ ছাড়া লোক দেখানো নারী দিবস পালন করে বাংলাদেশকে উন্নত ও সমৃদ্ধ দেশে রূপান্তর করা সম্ভব নয়। জাতিসংঘ ১৯৭৭ সালে ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবসের স্বীকৃতি প্রদান করলেও স্বাধীনতার পর থেকে অদ্যাবধি সকল ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণের সঠিক নীতি ও পরিকল্পনা গ্রহণ না করায় বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়েছে। জাতিগত, ভাষাগত, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক- সব ক্ষেত্রেই নারী ও পুরুষের বৈষম্য দূর করে নারীর অর্জন এবং অধিকারের নীতিই দেশের টেকসই প্রবৃদ্ধি, উন্নতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হতে পারে।
সিঙ্গাপুরের উন্নয়নে নারীর ভূমিকা
সিঙ্গাপুরের দ্রুত অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে নারীরা অপরিহার্য ভূমিকা পালন করেছেন, যা দেশটিকে একটি উন্নত রাষ্ট্রে রূপান্তর করেছে। Ministry of Social and Family Development (MSF) শিক্ষা, কর্মক্ষেত্র এবং রাজনীতিতে সমান সুযোগের মাধ্যমে নারীরা এখন নেতৃত্বস্থানীয় পর্যায়ে রয়েছেন এবং দেশটির টেকসই প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি নারী সমাজ। সিঙ্গাপুরের দ্রুত অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে নারীরা, বিশেষ করে ১৯৬০-এর দশকের পর, সমতা, শিক্ষা এবং কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণের মাধ্যমে অপরিহার্য ভূমিকা পালন করেছেন। তারা এখন রাজনীতি, করপোরেট নেতৃত্ব এবং জনসেবায় উচ্চপর্যায়ে অধিষ্ঠিত, যা দেশটির অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধিতে সরাসরি অবদান রাখছে।
অর্থনৈতিক অবদান ও কর্মসংস্থান : নারীরা সিঙ্গাপুরের কর্মশক্তির একটি বড় অংশ, যা দেশের শিল্প ও পরিষেবার দ্রুত প্রসারে সহায়তা করেছে।
শিক্ষা ও দক্ষতা : সরকার ছেলেদের পাশাপাশি মেয়েদের জন্য সমান শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করেছে। যার ফলে বর্তমানে নারীরা উচ্চশিক্ষিত এবং পেশাগত ক্ষেত্রে দক্ষ।
নেতৃত্ব ও রাজনীতি : ২০২০ সালের পার্লামেন্টে প্রায় ৩০ শতাংশ নারী আইনপ্রণেতা ছিলেন। হালিমা ইয়াকুবের মতো নারীরা সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পদে (প্রেসিডেন্ট) আসীন হয়েছেন, যা নারী ক্ষমতায়নের উদাহরণ।
সামাজিক পরিবর্তন : ‘হোয়াইট পেপার অন সিঙ্গাপুর উইমেন’স ডেভেলপমেন্ট’ (White Paper on Singapore WomenÕs Development)-এর মাধ্যমে কর্মক্ষেত্রে এবং পরিবারে নারীদের সমান অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করা হয়েছে।
কর্মক্ষেত্রে বৈচিত্র্য : বর্তমানে নারীরা করপোরেট জগত, একাডেমিয়া এবং জনসেবায় উচ্চতর পদে অবদান রেখে সিঙ্গাপুরকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। মূলত, শিক্ষা, পরিবার পরিকল্পনা, এবং সমান সুযোগের মাধ্যমে সিঙ্গাপুর নারীদের একটি ‘নিষ্ক্রিয়’ গোষ্ঠী থেকে ‘সক্রিয়’ অংশীদার ও নেতা হিসেবে রূপান্তর করেছে।
জাপানের উন্নয়নে নারীর ভূমিকা
জাপানের উন্নয়নে নারীরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে উচ্চশিক্ষিত জনশক্তি হিসেবে প্রযুক্তি ও সেবামূলক খাতে অবদান রাখছেন। সরকার ‘ওমেনোমিক্স’ নীতির মাধ্যমে কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধিতে উৎসাহিত করছে।
শিক্ষিত জনশক্তি : জাপানি নারীরা বিশ্বের অন্যতম সর্বোচ্চ শিক্ষিত গোষ্ঠী, যা উন্নত প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনী শিল্পে ভূমিকা রাখছে।
কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণ : যদিও অনেকেই পার্টটাইম বা সহযোগী ভূমিকা পালন করেন, তবু তারা আধুনিক জাপানি অর্থনীতি ও কর্মক্ষেত্রে অপরিহার্য।
ওমেনোমিক্স : সরকার ২০২০ সালের মধ্যে নেতৃত্ব পর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে নীতি গ্রহণ করেছে, যা অর্থনৈতিক সমতার দিকে ধাবিত হচ্ছে।
সামাজিক ও পারিবারিক ভূমিকা : গৃহস্থালী কাজের পাশাপাশি সন্তান ও বয়োজ্যেষ্ঠদের যত্ন নেওয়ার মাধ্যমে তারা সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখছেন।
স্বাস্থ্য খাতে অবদান : নারীরা জাপানের গড় আয়ু বৃদ্ধি এবং সুস্বাস্থ্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।
চীনের উন্নয়নে নারীর ভূমিকা
চীনের দ্রুত অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে নারী সমাজ ‘অর্ধেক আকাশ’ বা অপরিহার্য চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে, যারা বর্তমানে দেশটির মোট জিডিপিতে প্রায় ৪১ শতাংশ অবদান রাখছে। বিপুল নারী শ্রমশক্তি উৎপাদন, প্রযুক্তি এবং সেবা খাতে সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করছে। এছাড়া, নীতি নির্ধারণ এবং গ্রামীণ প্রশাসনেও নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পেয়েছে। চায়নার উন্নয়নে নারী সমাজের প্রধান ভূমিকাসমূহ নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
অর্থনৈতিক অবদান ও শ্রমশক্তি : চীনের নারী শ্রমশক্তির হার বিশ্বের অন্যতম সর্বোচ্চ। তারা কলকারখানা থেকে শুরু করে প্রযুক্তি ও সেবা খাত পর্যন্ত সব জায়গায় কাজ করছে, যা দেশটির জিডিপি বৃদ্ধিতে বড় অবদান রাখছে।
‘তিনি অর্থনীতি’ (She Economy) সমৃদ্ধি : চীনের নারীরা শুধু উৎপাদনের ক্ষেত্রে নয়, বরং ভোগবাদী বাজার বা 'She economy’-তে বড় ভূমিকা রাখছে। নারী ক্রেতাদের ব্যাপক চাহিদার কারণে ভোক্তা বাজারে নারীর অবদান অনেক বেশি।
শিক্ষা ও পেশাগত উন্নয়ন : আধুনিক চীনে নারীরা উচ্চশিক্ষা এবং উন্নত কর্মসংস্থানের সুযোগ পাচ্ছে, যা তাদের পরিবার ও দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে।
সামাজিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব : আইন ও রাষ্ট্রের চোখে নারী-পুরুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। গ্রাম কমিটি থেকে শুরু করে সরকারি উচ্চপর্যায়ে নারী প্রতিনিধি নির্বাচনের ক্ষেত্রে কোটা বা নির্দিষ্ট শতাংশের ব্যবস্থা রয়েছে।
নীতিগত সহায়তা : চীন সরকার নারীদের সমান কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও অধিকার রক্ষায় ১০০-র বেশি আইন ও বিধিমালা তৈরি করেছে, যা নারীদের উন্নয়নে সহায়ক হিসেবে কাজ করছে।
ভিয়েতনামের উন্নয়নে নারী
সমাজের ভূমিকা
ভিয়েতনামের সামগ্রিক উন্নয়নে নারী সমাজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও অগ্রগামী ভূমিকা পালন করছে। দেশের মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৬৩ শতাংশ নারী, যা কৃষিখাত থেকে শুরু করে প্রযুক্তি, পোশাক শিল্প ও উদ্যোক্তা হিসেবে অর্থনীতিতে বিশাল অবদান রাখছে। উচ্চ নারী কর্মসংস্থান হার, রাজনৈতিক নীতিনির্ধারণে অংশগ্রহণ এবং ক্ষুদ্র শিল্পে সক্রিয়তার মাধ্যমে তারা টেকসই উন্নয়নে সরাসরি অবদান রাখছে।
অর্থনৈতিক অবদান ও কর্মসংস্থান : ভিয়েতনামের নারীরা কৃষি, উৎপাদন, বস্ত্র, জুতো তৈরি এবং ক্ষুদ্র শিল্পে বড় ভূমিকা পালন করছে। বর্তমান ডিজিটাল অর্থনীতি ও ই-কমার্স খাতেও নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ছে।
উদ্যোক্তা ও নেতৃত্ব : ভিয়েতনামের প্রায় ৩০ শতাংশ ব্যবসায়িক বা করপোরেট নেতৃত্বের পদে নারীরা অধিষ্ঠিত। তারা নতুন উদ্যোক্তা (start-ups) তৈরির মাধ্যমে অর্থনীতিকে আধুনিকায়নে সহায়তা করছে।
রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অংশগ্রহণ : ভিয়েতনামের রাজনীতিতে নারীরা উল্লেখযোগ্য স্থান দখল করেছে। ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি এবং সরকারি পদগুলোতে নারীরা উচ্চ পদে কাজ করছেন (যেমন- প্রাক্তন ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি চেয়ারপার্সন)।
উন্নয়নের কারিগর : গ্রামীণ ও শহর- উভয় অঞ্চলেই নারীরা পরিবার ও সমাজের উন্নয়নের চাবিকাঠি হিসেবে পরিচিত। কুটির শিল্প, কৃষি ও বাণিজ্যের মাধ্যমে তারা সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো মজবুত করছেন।
জাতীয় নিরাপত্তা ও কূটনীতি : নারীরা শুধু ঘর বা কাজের ক্ষেত্রেই নয়, দেশের প্রতিরক্ষা, নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা মিশনেও (UN peacekeeping) বড় ভূমিকা রাখছেন। ভিয়েতনামী নারীরা শিক্ষা ও ক্ষমতায়নের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে।
লেখক : গবেষক
প্যানেল/মো.








