ইতিহাস পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে বড় উত্থান হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর। এই সময় আমেরিকা শুধুই লাভবান হয়েছিল। প্রথম দিকে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ করেনি। যার ফলে যুক্তরাষ্ট্রে যে ব্যাপক অস্ত্র, রসদ ছিল- তা দু’পক্ষের কাছেই বিক্রি করার সুযোগ হয়েছিল। যুদ্ধ শেষে যে সময়ে ইউরোপ, জাপান, সোভিয়েত ইউনিয়নসহ অন্য প্রায় সকল দেশের অর্থনীতি ধ্বংস, সেই সময় যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ব্যাপক শক্তিশালী। যুদ্ধ শেষে ১৯৪৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ছিল বিশ্বের প্রায় ৫০% শিল্প উৎপাদন ক্ষমতা, ৭০% স্বর্ণমজুত, পারমাণবিক বোমা এবং ছিল বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী। এরপর থেকে যুক্তরাষ্ট্র পরিণত হয় বিশ্ব মোড়লে। সমগ্র বিশ্বের নেতৃত্ব তার হাতে। এই নেতৃত্বকে টিকিয়ে রাখার জন্য সামনে যেই এসেছে, তাকেই ধ্বংস করে দিয়েছে। এই ধ্বংসের কাতারে বিশ্বের মুসলিম রাষ্ট্রগুলোই বেশি। এ জন্য অনেকে ধারণা করে, যুক্তরাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য বিশ্বের মুসলিম রাষ্ট্রগুলো।
ভিন্ন কথা বলে বাস্তবতা। যুক্তরাষ্ট্র সর্বদা স্বার্থ উদ্ধারে ব্যস্ত। প্রকৃতপক্ষে যুক্তরাষ্ট্র কি চায়? দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান লক্ষ্যবস্তু একমাত্র পরাশক্তি দেশ হিসেবে বৈশ্বিক আধিপত্য বিস্তার করা। যার জন্য বিশ্বের ৮০টিরও বেশি দেশে ৭৫০+ মার্কিন সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করেছে তারা। যুদ্ধের পরে রাশিয়াকে ঘিরে ধরার জন্য ন্যাটো গঠন ও সম্প্রসারণ করেছে। আবার চীনকে ঠেকাতে ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল। যে দেশই মাথা ওপরে তোলে সেখানেই তাদের হস্তক্ষেপ দেখা যায়। দ্বিতীয়ত, লক্ষ্যবস্তু হলো বিশ্বে ডলারের আধিপত্য বিস্তার করা। এটি অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যদিও বেশি আলোচিত নয়। ডলার সিস্টেম করেছে যুক্তরাষ্ট্র। বিশ্বের তেল বিক্রি হয় ডলারে। যার জন্য আন্তর্জাতিক লেনদেনের জন্য সব দেশকে ডলার মজুত রাখতে হয়। এখানে প্রধান বিষয় আমেরিকা ইচ্ছামতো ডলার ছাপাতে পারে। কিন্তু অন্য দেশ সহজে পারে না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সাম্র্রাজ্যবাদী দেশগুলো দেউলিয়া হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সম্পূর্ণ বাঁধা পড়ে। আমেরিকা এই দেশগুলোর পুনর্গঠনের জন্য কোটি কোটি ডলার ধার দেয়। এই ডলার দিয়ে তারা যুক্তরাষ্ট্রের থেকে যন্ত্রপাতি কিনে আবার কল-কারখানা চালু করেছিল। ফলে দেশগুলোর বৈদেশিক বাণিজ্য রক্ষার জন্য পুনরায় অভাব দেখা দেয়। যার ফলাফল ১৯৪৪ সালে ব্রেটন উডসে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও বিশ্ব ব্যাংক গঠন। পরবর্তীতে এখান থেকেই ডলার ধার দেওয়া শুরু হলো।এর উভয়ের নেতৃত্বে আমেরিকাই। পরবর্তীতে এই ডলার সিস্টেম থেকে যে দেশই বেরিয়ে আসতে চেয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র সেখানেই হস্তক্ষেপ করেছে। এর বাস্তব উদাহরণ ইরাকে দেখা যায় ২০০৩ সালে। সাদ্দাম হোসেন ইউরোতে তেল বিক্রি করতে চেয়েছে। ফলাফল তার ফাঁসি। ২০১১ সালে লিবিয়ায় মুয়াম্মার গাদ্দাফি গোল্ড দিনারের দিকে যেতে চেয়েছিলেন। ফলাফল তিনি নিহত হন। ইরানে ইউরো ও ইউয়ানে তেল বিক্রি করার জন্য কঠোর নিষেধাজ্ঞা দেয় যুক্তরাষ্ট্র।
তৃতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্রের আরেক লক্ষ্য হলো বিশ্বের তেল ও জ্বালানি নিয়ন্ত্রণ করা। কিছুদিন আগেই ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে উঠিয়ে নিয়ে গিয়েছে। কেননা ভেনিজুয়েলা তেল মজুতে প্রথম। যেভাবেই হোক বিশ্বের তেল নিয়ন্ত্রণ করাই লক্ষ্য। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের তেল নিয়ন্ত্রণ মানে ইউরোপকে নিয়ন্ত্রণ করা, চীনকে নিয়ন্ত্রণ করা, রাশিয়াকে চাপে রাখা। হেনরি কিসিঞ্জার বলেছিলেন, তেল নিয়ন্ত্রণ করো, জাতিগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। চতুর্থত, যুক্তরাষ্ট্রের আরেক দিক হলো অন্য রাষ্ট্রের মধ্যে দ্বন্দ্ব বাধিয়ে দিয়ে অস্ত্র ব্যবসা করা। কেননা, ওরা মনে করে যুদ্ধ মানেই মুনাফা। আবার, ইসরায়েলকে নিরাপত্তা প্রদান করাও যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য। কেননা এটিই মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক ঘাঁটির বিকল্প পরীক্ষিত অস্ত্র ও গোয়েন্দা প্রযুক্তির উৎস।
সর্বোপরি, যুক্তরাষ্ট্র বৈশ্বিক আধিপত্য বিস্তারের জন্য সামরিক শক্তি ব্যবহার করে। ফলে শিকার হয় দুর্বল রাষ্ট্রগুলো। ডলার নিয়ন্ত্রণ করার জন্য অন্য দেশের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এর শিকার হয় বিশ্বের স্বাধীনচেতা নেতারা। আবার তেল নিয়ন্ত্রণের জন্য মিত্র স্বৈরশাসকের সঙ্গে মিলিত হয়ে দখলদারত্ব করে। সবই নিজ স্বার্থের জন্য। ভুক্তভোগী হয় তেলসমৃদ্ধ দেশের জনগণ। নিজেদের অর্থনীতি শক্তিশালী করতে অস্ত্র ব্যবসা করার জন্য অন্য বিভিন্ন দেশের মধ্যে দ্বন্দ্ব উসকে দেয়। এর ভুক্তভোগী হয় যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের সাধারণ মানুষ। ইসরায়েলকে রক্ষার জন্য সামরিক সাহায্য করে আসছে। মৃত্যুপুরীতে পরিণত হচ্ছে ফিলিস্তিন। আবার আমেরিকা যাদের প্রতিযোগী মনে করে তাদের দমনের জন্য নিষেধাজ্ঞা ও প্রক্সি যুদ্ধ লাগিয়ে দেয়। ফলে সাধারণ নাগরিকদের ক্ষতির শিকার হতে হয়। যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য মূলত ক্ষমতা, সম্পদ এবং বিশ্ব নিয়ন্ত্রণ। এসবের জন্য হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে ধর্ম, নারীর ক্ষমতায়ন, গণতন্ত্র ও মানবাধিকার। তাদের স্বার্থের জন্য যখন যে হাতিয়ারের প্রয়োজন হয়, তখন সেটিই ব্যবহার করে। স্বার্থের জন্য কোনো কিছুকে তারা পরোয়া করে না।
মুসলিম নিধন যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য নয়। কেননা, অনেক মুসলিম রাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। যেমন-সৌদি আরব, কাতার, মরক্কো ইত্যাদি- এসব মুসলিম রাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ। আবার নিজ স্বার্থ হাসিলের জন্য অনেক অমুসলিম রাষ্ট্রে হস্তক্ষেপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ভিয়েতনাম, কোরিয়া, লাতিন আমেরিকা, ভেনিজুয়েলা ইত্যাদি। আবার দেখা যায় মুসলিম রাষ্ট্রের মাধ্যমে অন্য মুসলিম রাষ্ট্রকে আঘাত করা। যেমন-পাকিস্তানের মাধ্যমে আফগানিস্তানে হামলা। সৌদিকে ব্যবহার করে ইয়েমেনে হামলা। এসব দিক বিবেচনা করলে দেখা যায়, মুসলিম নিধন যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য নয়। যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য আধিপত্য বিস্তার, ক্ষমতা দখল এবং যে রাষ্ট্র প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠবে তাকে নিঃশেষ করা। সেটা মুসলিম বা অমুসলিম যে রাষ্ট্রই হোক। তবে এক্ষেত্রে মুসলিমদের ওপর হামলা বা আঘাত চরম লেভেলের। এর মূল কারণ, ইসলাম তথা মুসলমানদের তারা নিজেদের প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করে এবং নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করে।
বিশ্বে পঞ্চম বৃহত্তম তেল মজুত ইরাকে। সাদ্দাম হোসেন এই তেল ইউরোতে বিক্রির পরিকল্পনা করেছিলেন। এটি ডলার সিস্টেমের হুমকি। এটি যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের বিপরীত। তাই এটি তারা ভালো চোখে দেখেনি। যার ফলে ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র মিথ্যা অজুহাতে ইরাক আক্রমণ করে। এক গবেষণায় এসেছে, এই আক্রমণে ১০ লক্ষের বেশি নাগরিক নিহত এবং ৪০ লক্ষ মানুষ হয় বাস্তুচ্যুত। ফলাফলে যুক্তরাষ্ট্র তেল দখল করে নেয় স্বার্থ হাসিল করে।
আবার লিবিয়ায় আফ্রিকার সর্ববৃহৎ তেল মজুত। সেখানে গাদ্দাফি আফ্রিকার জন্য একটি স্বর্ণমুদ্রা গোল্ড দিনার চালু করতে চেয়েছিলেন। এটিও ডলারের বিকল্প। এখানেও একই। আমেরিকার স্বার্থ। ফলে ২০১১ সালে যুক্তরাষ্ট্র ঘঅঞঙ -এর মাধ্যমে হস্তক্ষেপ এবং গাদ্দাফি নিহত হন। ফলে তেল দখল করে এবং গোল্ড দিনার চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের সাফল্য। আফগানিস্তানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ২০০১ থেকে ২০২১ সাল দীর্ঘ ২০ বছরের যুদ্ধ। এর কারণও স্বার্থ হাসিল। আফগানিস্তান ছিল মধ্য এশিয়ার কেন্দ্রে। রাশিয়া, চীন, ইরান ও পাকিস্তানের সংযোগস্থলে। এখানে সামরিক ঘাঁটি করা মানে পুরো অঞ্চলের ওপর আধিপত্য বিস্তার করা। শেষ পর্যন্ত অবশ্য আফগানিস্তানে তালেবানরাই জয়ী হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ হাসিল হয়নি। কিন্তু আফগানিস্তানে ২ লক্ষের বেশি নাগরিক নিহত হয় ৩৭ লক্ষ মানুষ হয় বাস্তুচ্যুত।
মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলে বিশ্বের ৬০% তেল ও গ্যাস মজুত। আবার ভৌগোলিক অবস্থানে মধ্যপ্রাচ্য, মধ্য এশিয়া-এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের সংযোগস্থল। এছাড়াও অনেক রাষ্ট্র ছিল দুর্বল। এর অন্যতম প্রধান কারণ, মুসলিমদের মধ্যে ঐক্যের অভাব। নিজেদের মধ্যে অনেক বিভক্তি। এসব কিছুকে সামনে রেখে ইসলামোফোবিয়া হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। নিজ স্বার্থের জন্য মুসলমানদের সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়ে ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ হিসেবে উপস্থাপন করে জনমত গঠন করে আক্রমণ শুরু করে। এভাবেই আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়া, সোমালিয়া, ইয়েমেন এসব মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোতে যুদ্ধের কারণে লক্ষাধিক মুসলিম নিহত হয়েছেন। যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান লক্ষ্য আধিপত্য বিস্তার এবং ক্ষমতা দখল করা। এই স্বার্থ রক্ষার জন্য সামনে যে রাষ্ট্রকেই প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করেছে, সেই রাষ্ট্রকেই আক্রমণ করেছে। সেটা মুসলিম বা অমুসলিম যে রাষ্ট্রই হোক। তবে এক্ষেত্রে মুসলিম রাষ্ট্রের ওপরেই হামলা বেশি।
লেখক : শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া
প্যানেল/মো.








